ছবি: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগামী দুই মাসে চার দেশ সফর নিয়ে কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে জাপান ও সৌদি আরবে তার দ্বিপক্ষীয় সফরের প্রস্তুতি চলছে। তুরস্কে তিনি জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ৩১তম সম্মেলনে অংশ নিতে যেতে পারেন। আর ভারতীয় গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নভেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে নয়াদিল্লি সফরের সম্ভাবনাও নিয়ে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে আলোচনা চলছে।
গতকাল রোববার কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রথম আলো জানিয়েছে, অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে জাপান এবং নভেম্বরে তুরস্ক ও সৌদি আরব সফরের প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পর্যায়ে যোগাযোগ চলছে। তবে কোনো সফরের তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এর মধ্যে ভারত সফরের বিষয়টি কিছুটা আলাদা। ১৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, নভেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে তারেক রহমানের ভারত সফরের জন্য সম্ভাব্য তারিখ নিয়ে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে আলোচনা চলছে। এর আগে আগস্টে প্রস্তাবিত সফরটি শেষ পর্যন্ত হয়নি। আনন্দবাজার পত্রিকাও ১৮ সেপ্টেম্বর জানিয়েছে, নভেম্বর বা ডিসেম্বরের শুরুতে তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফরের সম্ভাবনা নিয়ে সরকারি পর্যায়ে আলোচনা চলছে।
ফলে অক্টোবর ও নভেম্বর মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য বিদেশ সফরের ব্যস্ত সূচিতে চারটি দেশ যুক্ত হচ্ছে—জাপান, তুরস্ক, সৌদি আরব ও ভারত। এর মধ্যে প্রথম তিনটি সফরের বিষয় সরকারের পক্ষ থেকেও আলোচনায় এসেছে। ভারত সফরের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত মূলত কূটনৈতিক আলোচনা ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে টোকিও সফরের কথা রয়েছে তারেক রহমানের। তিন থেকে চার দিনের এই সফর আয়োজন নিয়ে সম্প্রতি ঢাকা ও টোকিওর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে। ১ জুলাই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে বলা হয়, জাপানের একটি প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাকে জাপান সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। একই সময়ে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশকে জাপানের দেওয়া সহায়তা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছিল।
জাপান বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন ও বিনিয়োগ অংশীদার। ২০২৫ সালের মে মাসে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের টোকিও সফরে বিনিয়োগ, জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতে সাতটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। পাঁচ বছরে জাপানে এক লাখ বাংলাদেশি দক্ষ কর্মী পাঠানোর লক্ষ্যও তখন নির্ধারণ করা হয়। দুই দেশ নিজেদের কৌশলগত অংশীদারত্ব পুনর্নিশ্চিত করেছিল।
তাই তারেক রহমানের সম্ভাব্য জাপান সফরে বিনিয়োগ, জ্বালানি, অবকাঠামো, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি ও ব্যবসায়িক যোগাযোগ গুরুত্ব পেতে পারে। বাংলাদেশের জন্য জাপানের উন্নয়ন সহযোগিতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ করাও সরকারের অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি বড় লক্ষ্য হতে পারে।
এরপর নভেম্বরের প্রথমার্ধে তুরস্ক সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ৩১তম সম্মেলন বা কপ-৩১ আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। শীর্ষ নেতাদের বৈঠক হবে ১১ ও ১২ নভেম্বর। সম্মেলনে অংশ নিতে তারেক রহমান তুরস্ক সফর করবেন বলে সরকারের পক্ষ থেকে এর আগে জানানো হয়েছে। ২৭ আগস্ট সৌদি আরবের জেদ্দায় তুরস্কের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরও প্রধানমন্ত্রীর কপ-৩১-এ অংশগ্রহণের বিষয়টি জানিয়েছিলেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য কপ-৩১ গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু অর্থায়ন, ক্ষয়ক্ষতির অর্থ, অভিযোজন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অর্থ ও প্রযুক্তি সহায়তার বিষয়গুলো সেখানে গুরুত্ব পাবে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর এই সফর শুধু একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দেশের জলবায়ু স্বার্থ তুলে ধরার পাশাপাশি তুরস্কের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়েও আলোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
নভেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে সৌদি আরব সফরের সম্ভাবনাও রয়েছে। সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের আমন্ত্রণে এই সফর হতে পারে। গত মাসে ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের সময় সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ জাফর এইচ বিন আবিয়াহ আমন্ত্রণপত্র হস্তান্তর করেন। দুই পক্ষ সুবিধাজনক তারিখ ঠিক করতে পারলে নভেম্বরে সফরটি আয়োজন করা হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য সৌদি আরবের গুরুত্ব কয়েকটি কারণে আলাদা। দেশটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার। বর্তমানে ২৮ লাখের বেশি বাংলাদেশি সেখানে কর্মরত। একই সঙ্গে সৌদি আরব সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে জনশক্তি রপ্তানির বাইরে বিনিয়োগ বাড়ানোর আগ্রহ দেখাচ্ছে।
গত আগস্টে সৌদি উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ এল-খেরেজি ঢাকায় এক বৈঠকে মৎস্য, খাদ্য, জ্বালানি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিনিয়োগের আগ্রহের কথা জানান। ফলে তারেক রহমানের সম্ভাব্য রিয়াদ সফরে শ্রমবাজারের পাশাপাশি বিনিয়োগ, জ্বালানি, খাদ্যনিরাপত্তা ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি গুরুত্ব পেতে পারে। রোহিঙ্গা সংকটেও সৌদি আরবের সমর্থন ধরে রাখার বিষয়টি বাংলাদেশের আলোচনায় থাকতে পারে।
এই তিন সফরের বাইরে সবচেয়ে বেশি কূটনৈতিক গুরুত্ব পাচ্ছে সম্ভাব্য ভারত সফর। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারত সফরের আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন তারেক রহমান। তবে আগস্টে সেই সফর হয়নি। সেপ্টেম্বরে আবার ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বেড়েছে। ২২ সেপ্টেম্বর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী সম্পর্ক চায়। দুই দেশের বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথাও তিনি বলেন।
১৩ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরও জানিয়েছিলেন, দীর্ঘ সময়ের অস্বস্তিকর সম্পর্কের পর ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করতে চায় বাংলাদেশ। এর আগে ২০ আগস্ট হুমায়ুন কবির বলেছিলেন, তাড়াহুড়ো করে নয়; পারস্পরিক আস্থা, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা ও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলেই প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর হতে পারে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতার জায়গাগুলোও কম নয়। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, তার প্রত্যর্পণের দাবি, গঙ্গার পানি চুক্তির নবায়ন, তিস্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, জ্বালানি ও যোগাযোগ—সবই সম্ভাব্য আলোচনার বিষয়।
ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার বিকল্প নেই। তার মতে, মতপার্থক্য থাকলেও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য দুই পক্ষেরই কাজ করা প্রয়োজন। তিনি গঙ্গার পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টিকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে নভেম্বরের সম্ভাব্য সফরের খবর প্রকাশের সময় আরেকটি বিষয়ও সামনে এসেছে। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের সম্মেলনে বাংলাদেশকে বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তারেক রহমান সেখানে যাননি। এর পরই দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য নভেম্বরের সময় নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে আগামী দুই মাসে চারটি সম্ভাব্য বিদেশ সফরের কূটনৈতিক সূচি তৈরি হচ্ছে। মালয়েশিয়া ও চীন সফরের পর জাপান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের সম্ভাব্য সফর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, জলবায়ু ও শ্রমবাজারভিত্তিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে ভারত সফরটি সরাসরি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে চারটি সফরের কোনোটিরই পূর্ণাঙ্গ সূচি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিশেষ করে ভারত সফরের ক্ষেত্রে নভেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধ নিয়ে আলোচনা চললেও দুই দেশের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহের কূটনৈতিক যোগাযোগই ঠিক করবে, আলোচনায় থাকা চার সফরের কোনগুলো শেষ পর্যন্ত বাস্তব রূপ পায়।
খবরটি শেয়ার করুন