ছবি: সংগৃহীত
দীপঙ্কর শুভ
পাহাড় যখন নিজেই কথা বলে ওঠে, তখন তার স্বর হয় নদীর মতো, জুমের ধানের মতো ধৈর্যশীল, আর কাপ্তাই লেকের জলের মতো গভীর ও গোপন বেদনায় ভরা। মৃত্তিকা চাকমা সেই স্বরেরই একজন রূপকার—পার্বত্য জনপদের নিজস্ব ভাষা, লোকায়ত সংস্কৃতি, জীবনসংগ্রাম এবং আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে যিনি নাটকের শরীরে ধরে রেখেছেন এক অসাধারণ মমতায়। তার নাট্যসৃষ্টিতে পাহাড়ি মানুষের জীবনচিত্র যেমন জীবন্ত হয়ে ওঠে, তেমনি তার সাহিত্য সাধনার ভাঁজে ভাঁজে প্রতিফলিত হয় তাদের ইতিহাস, লোকবিশ্বাস, সংকট ও অস্তিত্ব রক্ষার নিরন্তর সংগ্রাম।
নিতাই কর্মকারের সংগ্রহ ও সম্পাদনায় বাংলা একাডেমি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত ‘নির্বাচিত নাটক : মৃত্তিকা চাকমা’ গ্রন্থটি তাই কেবল চাকমা ভাষার নাটকের বাংলা অনুবাদ নয়; এ যেন দুই ভাষার, দুই সংস্কৃতির মাঝে বহুকাল ধরে বহমান নীরবতার ওপর গড়ে ওঠা এক মেলবন্ধনের সেতু। ভাষাগত ও ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে চাকমা জনগোষ্ঠীর সাহিত্য যে দীর্ঘকাল বৃহত্তর বাংলা ভাষাভাষী পাঠকের কাছে অধরাই থেকে গিয়েছিল, এই গ্রন্থ সেই দীর্ঘদিনের অচলায়তন ভেঙে দেওয়ার এক সাহসী ও সফল প্রয়াস।
১৯৫৮ সালের ১২ জানুয়ারি রাঙামাটি পার্বত্য জেলার বন্দুকভাঙ্গা ইউনিয়নের কবত্যাদোরের মুগছড়ির আলো-বাতাসে জন্ম নেওয়া মৃত্তিকা চাকমার জীবন ও শিল্পচেতনা গভীরভাবে জড়িয়ে আছে ১৯৬০ সালের কাপ্তাই বাঁধের সেই বীভৎস উচ্ছেদ ও বাস্তুচ্যুতির স্মৃতি, যে স্মৃতি আজও পাহাড়ি মানুষের সম্মিলিত অবচেতনে এক অনিরাময়যোগ্য ক্ষত হয়ে আছে। কাপ্তাই বাঁধের জলে তার জন্মভূমি চিরতরে তলিয়ে যাওয়ার পর খাগড়াছড়ির লোগাংয়ে বেড়ে ওঠা তাঁর শৈশব-কৈশোর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা আর পরবর্তীকালে রাঙামাটির মোনঘর আবাসিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘ শিক্ষকতার জীবন—এই দুই অভিজ্ঞতাই যেন তার নাট্যসাহিত্যের শিকড় বুনে দিয়েছে গভীর পাহাড়ি মাটির গভীরে।
তিনি কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনজাতির জীবনকথাকে নাটকের রূপ দেননি, বরং জুম্ম জনগোষ্ঠীর শিল্প ও সংস্কৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক ও সৃজনশীল পরিসরে প্রতিষ্ঠিত করার লড়াইয়েও আজীবন নিরলস ভূমিকা রেখে চলেছেন। পাহাড়ি সাহিত্যকে সময়ের ভাঙনের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখার যে নিরন্তর সাধনা তিনি প্রতিনিয়ত করে চলেছেন, আলোচ্য গ্রন্থের প্রকাশ তারই এক পরিণত, স্থায়ী ফসল।
এই সংকলনে নাট্যকারের দীর্ঘ সৃষ্টিশীল জীবন থেকে বেছে নেওয়া হয়েছে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ নাটক—‘দেবঙসি আধর কালা ছাবা’, ‘এক জুর মান্নেক’, ‘জোঘ্য’, ‘বান’ এবং ‘কর্মফল’। নাটকগুলোর ভাষান্তর করেছেন মৃত্তিকা চাকমা নিজে, সঙ্গে বৈজয়ন্তী খীসা, ইগিমি চাকমা এবং মিত্র দেওয়ান—এক সম্মিলিত সাধনার ফসল হয়ে উঠেছে এই বই। প্রচ্ছদে বিশিষ্ট শিল্পী ধ্রুব এষের তুলি বইটিকে দিয়েছে এক দৃষ্টিনন্দন বহিরাবরণ, যা ভেতরের গল্পগুলোর মতোই নিজস্ব ভাষায় কথা বলে। প্রতিটি নাটক যেন পাহাড়ি জনজীবনের একেকটি ভিন্ন স্তরে নেমে যাওয়ার সিঁড়ি, যা পাঠককে পৌঁছে দেয় এক গভীরতর মনস্তাত্ত্বিক সত্যের কাছে।
‘দেবঙসি আধর কালা ছাবা’ (অদৃশ্য হাতের কালো ছায়া) নাটকে উঠে আসে পাহাড়ি গ্রামের সাধারণ তরুণ-তরুণী জিত্তো ও মিলেবীর প্রেম, বিরহ এবং গ্রামের এক ধূর্ত, প্রভাবশালী কার্বারীর অশুভ চক্রান্তের ছায়াচ্ছন্ন এক আখ্যান। একটি প্রান্তিক জুমচাষী পরিবারের ছোট্ট স্বপ্ন কীভাবে নিঃশব্দে, ধীরে ধীরে গ্রাম্য ক্ষমতাধরদের অপতৎপরতায় চুরমার হয়ে যায়—তার এক নিখাদ, বাস্তবধর্মী ট্র্যাজেডি এই নাটক।
মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের সূক্ষ্মতম রূপায়ণ ঘটেছে ‘এক জুর মান্নেক’ (এক জোড়া চোখের জ্যোতি) নাটকে। কাপ্তাই বাঁধের ঢেউয়ে সর্বস্বান্ত হওয়া এক বাবার রেখে যাওয়া আশ্রয়হীন কন্যা তুন্যাবী এবং অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা পরান বাবুর ছায়াময় গৃহজীবনকে ঘিরে আবর্তিত এই নাটক। তুন্যাবীর নীরব, অপ্রকাশিত ভালোবাসা, সন্দেহ আর মানসিক দ্বন্দ্ব যেভাবে ধীরে ধীরে এক মর্মান্তিক পরিণতির দিকে হেঁটে যায়, তাতে ফুটে ওঠে নাট্যকারের গভীর সমাজ ও মনস্তত্ত্ব-পর্যবেক্ষণের দক্ষতা।
লোকজ বিশ্বাস আর অতিবাস্তবতার সূক্ষ্ম মিশেলে রচিত ‘জোঘ্য’ নাটকে উঠে আসে চাকমা সমাজে দেবদেবতা ও অপদেবতা ঘিরে প্রচলিত বিশ্বাসের জগৎ। অপদেবতার রোষানলে পড়া কিশোর রাখাল বালক দেমহুলের চরিত্রের ভেতর দিয়ে চাকমা লোককাহিনি আর বাস্তব জীবনের সংকট মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। লোকজ বিশ্বাসকে নিছক কুসংস্কার বলে খারিজ না করে মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত করে তোলার যে শৈল্পিক মুন্সিয়ানা, তা এই নাটকের সবচেয়ে বড় শক্তি।
মৃত্তিকা চাকমার সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ও প্রতিনিধিত্বশীল নাটক ‘বান’ (বাঁধ)। এই নাটকের মধ্য দিয়ে নাট্যকার কাপ্তাই বাঁধের কারণে সর্বস্বান্ত হওয়া পাহাড়ি মানুষের পুনর্বাসনের নামে চলা সুবিধাবাদীদের সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র পার্বতীর পরিবারের ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে তুলে ধরেন। পার্বতীর পরিবারের টিকে থাকার এই লড়াই কেবল একটি পরিবারের গল্প নয়—এ যেন সমগ্র জুম্ম জনগোষ্ঠীর দীর্ঘস্থায়ী আত্মরক্ষার সংগ্রামেরই এক করুণ, মূর্ত রূপক।
প্রাচীন বুদ্ধ জাতকের ‘মহাবাণিজ্য’ কাহিনির ভিত্তিতে রচিত ‘কর্মফল’ নাটকে নাট্যকার পৌরাণিক আখ্যানকে সমকালীন বাস্তবতার আলোয় নতুন করে গড়ে তোলেন। বারাণসী রাজ্যের পাঁচ বণিকের সমুদ্রযাত্রা, তাদের অতিরিক্ত লোভের ভয়াবহ পরিণতি এবং তার জেরে প্রকৃতির ধ্বংসাত্মক প্রতিক্রিয়া—এই সবকিছুর মধ্য দিয়ে মানুষের নৈতিক স্খলন ও কর্মফলের শাশ্বত দর্শনকে তিনি জীবন্ত করে তোলেন। প্রাচীন গল্পের কাঠামোয় আধুনিক জীবনবোধের এই সংযোজন নাটকটিকে দিয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা।
এই অনূদিত গ্রন্থের সবচেয়ে বড় সার্থকতা এখানেই যে, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক অনুবাদকে প্রাঞ্জল রাখার পাশাপাশি চাকমা জনজীবনের মৌলিক সুর ও আঞ্চলিক ভাষার মেজাজ কোথাও ক্ষুণ্ন হয়নি। বাংলা হরফে চাকমা ভাষায় রচিত নাটকগুলোর ভাব ও ভাষার যে সূক্ষ্ম রসায়ন, তা অনুবাদক ও সম্পাদকের সম্মিলিত নিষ্ঠায় বাংলা ভাষাভাষী পাঠকের কাছে সহজবোধ্য হয়ে উঠেছে, অথচ হারায়নি তার আদি সুর। এছাড়া গ্রন্থের পরিশিষ্টে মূল চাকমা পাণ্ডুলিপি সংযোজন করায় এটি গবেষক ও নৃগোষ্ঠী অধ্যয়নের শিক্ষার্থীদের জন্য হয়ে উঠেছে এক প্রামাণ্য দলিল।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ‘এথনিক থিয়েটার স্টাডিজ’ ধারার গবেষণা থেকে জন্ম নেওয়া যে প্রাতিষ্ঠানিক তাগিদ, বাংলা একাডেমির সহযোগিতায় এই গ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে তা পেয়েছে এক বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসর। বাংলাদেশের নাট্যচর্চাকে যদি কেবল বাংলা ভাষাভাষী মূলধারার সীমানায় বন্দি না রেখে বহুজাতিক, বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক বাস্তবতার আলোয় বিবেচনা করা হয়, তবে নিতাই কর্মকার সম্পাদিত ‘নির্বাচিত নাটক : মৃত্তিকা চাকমা’ নিঃসন্দেহে এক গুরুত্বপূর্ণ, সময়োপযোগী সংযোজন।
‘নির্বাচিত নাটক : মৃত্তিকা চাকমা’ গ্রন্থটি বাংলা নাট্যসাহিত্যের মানচিত্রকে আরও প্রসারিত করবে। পাহাড়ি জনপদের হাসি-কান্না, উৎসব-বিপর্যয় ও অস্তিত্বের লড়াইকে কেন্দ্র করে মৃত্তিকা চাকমা তার নাটকে যে বহুমাত্রিক শিল্পবোধ গড়ে তুলেছেন, তা এপার-ওপার বাংলার নাট্যপ্রেমী ও পাঠকদের জন্য হয়ে উঠবে নতুন ভাবনার খোরাক। মঞ্চে এর উপস্থাপন খুলে দেবে এক নতুন দিগন্ত। প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বরকে মূলধারার আলোয় নিয়ে আসার এই নিরন্তর প্রয়াস বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও নাট্যচর্চার বহুমুখিতাকে আরও সুদৃঢ় ও সমৃদ্ধ করবে—এই বিশ্বাস রাখা যায় নিঃসংকোচে।
খবরটি শেয়ার করুন