ছবি: বিবিসি
জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনের ফল ইউরোপের রাজনীতিতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ৬ সেপ্টেম্বরের নির্বাচনে অভিবাসনবিরোধী ও উগ্র ডানপন্থী হিসেবে পরিচিত ‘আলটারনেটিফে ফ্যুর ডয়েচল্যান্ড’ বা এএফডি ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়ে রাজ্য পার্লামেন্টে সবচেয়ে বড় দল হয়েছে। ৮৩ আসনের পার্লামেন্টে দলটি পেয়েছে ৩৯টি আসন। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ছিল ৪২টি আসন। ফলে মাত্র তিন আসনের জন্য সরকার গঠনের একক ক্ষমতা পায়নি দলটি।
এ ফলকে শুধু একটি রাজ্যের নির্বাচনী ফল হিসেবে দেখছেন না জার্মানি ও ইউরোপের অনেক পর্যবেক্ষক। কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির কোনো উগ্র ডানপন্থী দল এই মাত্রায় একটি রাজ্য নির্বাচনে এগিয়ে যায়নি। ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ান এটিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানিতে উগ্র ডানপন্থীদের সবচেয়ে বড় রাজ্যভিত্তিক সাফল্য হিসেবে বর্ণনা করেছে। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমটি বলেছে, এএফডির ফল জার্মানির প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।
জয়ের পর এএফডির স্থানীয় প্রধান প্রার্থী উলরিশ সিগমুন্ড এটিকে সরকার পরিচালনার ম্যান্ডেট হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু অন্য প্রধান দলগুলো এখনো এএফডির সঙ্গে সরকার গঠনে সহযোগিতা করতে রাজি নয়। ফলে ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পাওয়ার পরও দলটির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই ভোটকে কীভাবে ক্ষমতায় রূপান্তর করা হবে।
এই নির্বাচনের ফলের তাৎপর্য বুঝতে হলে এএফডির উত্থানের পটভূমি দেখতে হবে। ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত দলটি প্রথম দিকে ইউরোপীয় মুদ্রা ইউরো ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিয়ে আপত্তিকে রাজনৈতিক প্রচারের কেন্দ্র করেছিল। পরে অভিবাসন, শরণার্থী, জাতীয় পরিচয় ও ইসলামবিরোধী বক্তব্য দলটির রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। ২০২৫ সালের জাতীয় নির্বাচনে এএফডি ২০ দশমিক ৮ শতাংশ দ্বিতীয় পছন্দের ভোট পেয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হয়। জার্মানির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী, দলটি ১৫২টি আসনও পায়।
স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফল সেই ধারাকেই আরও শক্তিশালী করেছে। দ্য গার্ডিয়ান-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ওই রাজ্যে এএফডির ভোট ২০২১ সালের ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে দলটির ভোটের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৭৬ দশমিক ৫ শতাংশ, যা রাজ্যটির জন্য রেকর্ড।
কেন এএফডি এত দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে—এই প্রশ্নের উত্তর শুধু অভিবাসনবিরোধী রাজনীতির মধ্যে খুঁজলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। জার্মানির পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ। ডয়েচে ভেলে জানিয়েছে, স্যাক্সনি-আনহাল্ট মূলত গ্রামীণ ও পূর্ব জার্মানির অংশ। সেখানে অর্থনৈতিক কাঠামো, জনসংখ্যা কমে যাওয়া, কর্মক্ষম মানুষের পশ্চিমাঞ্চলে চলে যাওয়া এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক বঞ্চনার অনুভূতি রাজনীতিতে প্রভাব ফেলছে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণেও পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির অর্থনৈতিক ব্যবধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। ১৯৯০ সালে দুই জার্মানি একীভূত হওয়ার পর পূর্বাঞ্চলে কর্মসংস্থান ও আয় পশ্চিমাঞ্চলের কাছাকাছি এলেও সম্পদের ব্যবধান এখনো বড়। ২০২৩ সালের হিসাবে পূর্বাঞ্চলে, বার্লিনসহ, পরিবারের গড় নিট সম্পদের পরিমাণ পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় অর্ধেক ছিল। একই সঙ্গে পূর্বাঞ্চল এখনো কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী হারাচ্ছে। এই দীর্ঘস্থায়ী বৈষম্য রাজনৈতিক অসন্তোষকে উসকে দিচ্ছে বলে রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জার্মান অর্থনীতির সাম্প্রতিক দুর্বলতা, জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসনসংকট এবং অভিবাসন নিয়ে বিতর্ক। চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎসের সরকার অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে চাপের মুখে রয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি ও পেট্রলের দামও সরকারের জন্য রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে।
এএফডি এই অসন্তোষকে একটি সরল রাজনৈতিক বার্তায় পরিণত করছে—জার্মানদের স্বার্থকে সবার আগে রাখতে হবে। দলটি অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, বহিষ্কার এবং ‘রেমিগ্রেশন’ বা প্রত্যাবর্তন নীতির কথা বলছে। দলটির নিজস্ব নথিতে ‘রেমিগ্রেশন’ বলতে দেশ ছাড়ার আইনগত বাধ্যবাধকতায় থাকা বিদেশিদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর নীতিকে বোঝানো হয়েছে।
স্যাক্সনি-আনহাল্টে নির্বাচনের আগে উলরিশ সিগমুন্ড আরও কঠোর অভিবাসননীতি, বহিষ্কার অভিযান, বিদ্যালয়ে রংধনু পতাকা নিষিদ্ধ করা এবং নতুন বায়ুশক্তি প্রকল্প বন্ধের মতো অবস্থান সামনে এনেছিলেন। দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, তার নির্বাচনী প্রচারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের কাছে পৌঁছানোর কৌশলও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এখানেই জার্মানির নাৎসি অতীতের প্রসঙ্গটি সামনে আসে। ১৯৩৩ সালে অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসি পার্টি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে। পরবর্তী সময়ে একদলীয় স্বৈরশাসন, রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন, ইহুদি ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন এবং শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও হলোকাস্টের মধ্য দিয়ে ইউরোপ ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়ে।
তবে এএফডি নিজেকে নাৎসি দলের উত্তরসূরি হিসেবে দাবি করে না এবং দলটির বর্তমান কর্মসূচির সব অংশকে নাৎসি মতাদর্শের সঙ্গে এক করে দেখা ইতিহাসগতভাবে সরলীকরণ হবে। কিন্তু দলটির কিছু নেতা-কর্মীর বক্তব্য, জাতিগত পরিচয়কে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের প্রবণতা, অভিবাসনবিরোধী অবস্থান এবং নাৎসি আমলের কিছু প্রতীক বা ভাষার ব্যবহার নিয়ে জার্মানিতে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে।
এই বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জার্মানির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থার অবস্থান। ২০২৫ সালের মে মাসে সংস্থাটি এএফডিকে ‘নিশ্চিত উগ্র ডানপন্থী’ সংগঠন হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছিল। তবে এএফডির করা মামলার পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে কোলোনের প্রশাসনিক আদালত চূড়ান্ত বিচার না হওয়া পর্যন্ত ওই শ্রেণিবিন্যাস কার্যকরভাবে স্থগিত রাখার নির্দেশ দেয়। আদালতের সিদ্ধান্তে বলা হয়, পুরো দলকে ওই শ্রেণিতে রাখার জন্য তখনকার পর্যায়ে প্রমাণ যথেষ্ট ছিল না। ফলে বর্তমান অবস্থাকে সরলভাবে ‘জার্মান সরকার এএফডিকে নব্য-নাৎসি দল ঘোষণা করেছে’—এভাবে বলা সঠিক হবে না।
তারপরও উদ্বেগের কারণ আছে। দ্য নিউ ইয়র্কার-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এএফডির ‘রেমিগ্রেশন’ নীতি, হলোকাস্টের ইতিহাসকে খাটো করে দেখার সঙ্গে যুক্ত বক্তব্য এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতি জার্মানির যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
জার্মানির প্রচলিত দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে এএফডির সঙ্গে রাজনৈতিক সহযোগিতা না করার নীতি অনুসরণ করে আসছে। জার্মান রাজনীতিতে এই নীতিকে ‘ফায়ারওয়াল’ বা রাজনৈতিক অগ্নিবলয় বলা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল মূলধারার দলগুলোর সঙ্গে এএফডির রাজনৈতিক সহযোগিতা ঠেকিয়ে দলটিকে ক্ষমতার বাইরে রাখা। কিন্তু স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফল দেখিয়ে দিয়েছে, ভোটারদের বড় একটি অংশকে এই অগ্নিবলয়ের বাইরে রেখে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
দ্য গার্ডিয়ান-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মূলধারার দলগুলোর এএফডিকে বিচ্ছিন্ন রাখার কৌশল কখনো কখনো উল্টো দলটির জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে। কারণ, এএফডি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে থাকা একটি শক্তি হিসেবে ভোটারদের সামনে তুলে ধরতে পেরেছে।
এখানেই জার্মানির জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্নটি তৈরি হয়েছে। এএফডি কি শুধু প্রতিবাদী ভোটের দল হয়ে থাকবে, নাকি রাজ্য সরকার পরিচালনার পর্যায়ে পৌঁছাবে? স্যাক্সনি-আনহাল্টে দলটি এখনো এককভাবে সরকার গঠনের মতো আসন পায়নি। অন্য দলগুলোর সঙ্গে জোটের সম্ভাবনাও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত কঠিন। তাই নির্বাচনে প্রথম হওয়া এবং সরকার গঠন করা—দুটি বিষয়কে এক করে দেখা যাবে না।
তবে নির্বাচনের প্রভাব শুধু স্যাক্সনি-আনহাল্টে সীমাবদ্ধ নেই। এরই মধ্যে জার্মানির আরও কয়েকটি রাজ্যে নির্বাচন নিয়ে এএফডির শক্ত অবস্থান নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। রয়টার্স ১৬ সেপ্টেম্বর জানিয়েছে, মেকলেনবুর্গ-ভোরপোমার্নের পরবর্তী রাজ্য নির্বাচনের আগে এএফডি সেখানে শক্ত অবস্থানে রয়েছে এবং জাতীয় পর্যায়েও দলটি প্রায় ২৭ থেকে ২৯ শতাংশ সমর্থন নিয়ে চ্যান্সেলর ম্যার্ৎসের সিডিইউর চেয়ে এগিয়ে রয়েছে বলে সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে।
এএফডির উত্থানকে তাই শুধু জার্মানির সমস্যা হিসেবে দেখছেন না ইউরোপীয় পর্যবেক্ষকেরা। আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাথাইজ রুডুজিনের নেতৃত্বে ৩১টি দেশে ১৫০-এর বেশি রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর গবেষণার তথ্য উদ্ধৃত করে গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ইউরোপের জাতীয় নির্বাচনে উগ্র ডানপন্থী দলগুলোর ভোটের হার এখন প্রায় ২৩ শতাংশের বেশি। ১৯৯৫ সালে এই হার ছিল প্রায় ৫ শতাংশ। অর্থাৎ তিন দশকে তাদের ভোটের অংশ প্রায় পাঁচ গুণ হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এই বৃদ্ধি দ্রুত হয়েছে।
ইতালি, ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া, নেদারল্যান্ডস, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অভিবাসন, জাতীয় পরিচয়, সীমান্ত নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষমতা নিয়ে ডানপন্থী দলগুলোর প্রভাব বেড়েছে। তবে সব দেশের পরিস্থিতি এক নয়। কোথাও তারা সরকারে আছে, কোথাও বিরোধী দলে, আবার কোথাও ভোটের হার বাড়লেও ক্ষমতার বাইরে রয়েছে।
জার্মানির বিশেষত্ব হলো তার ইতিহাস। নাৎসি আমলের অপরাধের কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশটির রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামো গণতন্ত্রবিরোধী শক্তিকে ঠেকানোর জন্য বিশেষভাবে নির্মিত হয়েছে। ফলে কোনো উগ্র ডানপন্থী দলের বড় নির্বাচনী সাফল্য শুধু বর্তমান রাজনীতির হিসাব নয়; তা জার্মানির অতীতের স্মৃতিকেও সামনে নিয়ে আসে।
এ কারণেই স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফল ইউরোপের অন্য দেশগুলোর কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ইউরোপের বিভিন্ন মূলধারার রাজনীতিক এ ফলকে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখছেন। অন্যদিকে ইউরোপের জাতীয়তাবাদী ও ডানপন্থী রাজনীতিকদের কেউ কেউ এ ফলকে নিজেদের রাজনীতির সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও এ নির্বাচনের ফল নিয়ে মন্তব্য করেছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি ইউরোপের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনকে পশ্চিমা রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নীতির ব্যর্থতার ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তবে এটি পুতিনের রাজনৈতিক মূল্যায়ন, নির্বাচনের ফলের নিরপেক্ষ ব্যাখ্যা নয়।
এএফডির রাশিয়াবিষয়ক অবস্থানও ইউরোপের নিরাপত্তা রাজনীতিতে আলোচিত। দলটির নেতৃত্ব রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পক্ষে এবং রাশিয়ার জ্বালানি আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ১৮ সেপ্টেম্বর রয়টার্স জানায়, এএফডি নেতাদের সঙ্গে রুশ প্রেসিডেন্টের অর্থনৈতিক উপদেষ্টার ২০২৭ সালে বৈঠকের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে এটি এখনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং এর বাস্তবায়ন বিভিন্ন শর্তের ওপর নির্ভরশীল।
এদিকে জার্মানির মূলধারার রাজনীতিতে এএফডির উত্থান মোকাবিলার প্রশ্নে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। চ্যান্সেলর ম্যার্ৎসের সরকার একদিকে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, অন্যদিকে এএফডির সঙ্গে রাজনৈতিক সহযোগিতা প্রত্যাখ্যান করে আসছে। কিন্তু স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফল দেখিয়েছে, অভিবাসন ইস্যুতে মূলধারার দলগুলোর কঠোর অবস্থান গ্রহণ করলেই এএফডির ভোট কমছে না। বরং অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা, জাতীয় পরিচয় ও সরকারের প্রতি অসন্তোষ—সবকিছু মিলিয়ে ভোটের আচরণ বদলাচ্ছে।
সুতরাং স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনকে শুধু ‘হিটলারের প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক বাস্তবতা আড়াল হয়ে যেতে পারে। আবার এএফডির উত্থানকে সাধারণ একটি নির্বাচনী পরিবর্তন হিসেবেও দেখার সুযোগ নেই। কারণ, দলটি এখন জার্মানির জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি এবং ২০২৫ সালের জাতীয় নির্বাচনে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে সংসদে প্রবেশ করেছে।
জার্মানির সামনে এখন মূল প্রশ্ন হলো—অভিবাসন, অর্থনৈতিক সংকট, পূর্ব-পশ্চিম বৈষম্য, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং জাতীয় পরিচয় নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ কীভাবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো মোকাবিলা করবে। শুধু এএফডিকে রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখা কতটা কার্যকর হবে, সেটিও আলোচনার বিষয়। একই সঙ্গে এএফডির সঙ্গে রাজনৈতিক সহযোগিতা না করার নীতি ভাঙলে জার্মানির যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক ঐতিহ্যে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
হিটলারের মৃত্যুর ৮১ বছর পর জার্মানিতে তাই ‘নাৎসি’ শব্দটি আবার রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে। কিন্তু ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে কি না, তার উত্তর শুধু একটি নির্বাচনের ফল দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। যা স্পষ্ট, তা হলো—জার্মানির পূর্বাঞ্চলে এএফডির ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট ইউরোপীয় রাজনীতির পুরোনো সমীকরণকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
আর ইউরোপের উদ্বেগের মূল কারণ সম্ভবত এটাই—এটি যদি বিচ্ছিন্ন কোনো আঞ্চলিক ঘটনা না হয়ে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিবর্তনের অংশ হয়, তাহলে আগামী কয়েক বছরে জার্মানি ও ইউরোপের রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদ, অভিবাসন ও গণতন্ত্রের প্রশ্ন আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।
খবরটি শেয়ার করুন