ফাইল ছবি
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন বলে সুখবর ডটকমকে জানিয়েছেন তার ঘনিষ্ঠজনরা। গত বছরের নভেম্বরে তিনি বিয়ে করেন। পাত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী, তার বয়স ২৬ বছর। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে কোয়েস্ট গ্রুপে চাকরি করতেন। সেখান থেকেই তার সঙ্গে হানিফের পরিচয় ও সম্পর্ক বলে জানা যায়। তাদের সম্পর্ক অবশেষে পরিণতি পায়।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে ২০১০ সালে নিবন্ধন পাওয়া সানমেরিন শিপইয়ার্ড কোয়েস্ট গ্রুপ অব কোম্পানির একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। কোয়েস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মাহবুব উল আলম হানিফ। বিভিন্ন সূত্রে তার দ্বিতীয় বিয়ের খবর ছড়িয়ে পড়েছে ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও রাজনৈতিক অনুসারীদের মধ্যে। তবে এ বিষয়ে হানিফের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার ঘনিষ্ঠ কয়েক ব্যক্তি ও রাজনৈতিক অঙ্গনের অনুসারীদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা থাকলেও প্রকাশ্যে কেউ সুখবর ডটকমের কাছে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
হানিফের প্রথম স্ত্রী ফৌজিয়া আলম দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে কানাডার ‘বেগমপাড়া’ হিসেবে পরিচিত নর্থ ইয়র্কের ‘বে ভিউ ভিলেজ’ এলাকায় বসবাস করেন অনেক আগে থেকেই। আওয়ামী লীগ ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকাকালেও হানিফের পরিবার কানাডায় থাকত। হানিফ তখন কয়েক মাস পরপর টরন্টোতে যেতেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটাতেন। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগের সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পালিয়ে কানাডায় চলে যান হানিফ।
এরপর থেকে হানিফ সেখানেই থাকছেন। সূত্র জানায়, গত বছর দুয়েক ধরে স্ত্রী ফৌজিয়া আলমের সঙ্গে ‘মানসিক দুরত্ব’ সৃষ্টি হয়েছে তার। তারা আলাদা বাসায় থাকছিলেন। একপর্যায়ে নিঃসঙ্গতা কাটাতে ইসলাম ধর্মীয় রীতি মেনে দ্বিতীয় বিয়ে করেন হানিফ। নতুন স্ত্রীকে নিয়ে কানাডাতেই থাকছেন তিনি। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, হানিফের জন্ম ১৯৫৯ সালের ২ জানুয়ারি। এই হিসাবে তার বর্তমান বয়স ৬৭ আর তার দ্বিতীয় স্ত্রীর বয়স ২৬ বছর।
এই অসম বয়সের বিয়ে নিয়ে হানিফের আত্মীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা আছে। কেউ কেউ বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে দেখলেও বাঁকা চোখেও দেখছেন অন্যরা। রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত হানিফের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এই আলোচনা শুরু হলেও এর সঙ্গে তার রাজনৈতিক উত্থান, ব্যবসায়িক বিস্তার এবং অতীতে ওঠা নানা অভিযোগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজনীতিতে ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনা নতুন কিছু নয়। তবে জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে ব্যক্তিগত খবর সামনে এলে তা প্রায়ই তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, সম্পদ এবং অতীত বিতর্কের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। মাহবুব উল আলম হানিফের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটছে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবস্থাপনা বিভাগে পড়াশোনা শেষে হানিফ ব্যবসায় যুক্ত হন। রাজনৈতিক জীবন শুরুর দিকে তিনি কুষ্টিয়ার স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও জাতীয় রাজনীতিতে তার উত্থান ঘটে মূলত ২০০৮ সালের পর। পরবর্তীতে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আস্থাভাজন হওয়ার পাশাপাশি শেখ হাসিনার পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্কও হানিফের রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে ভূমিকা রেখেছিল। যদিও আওয়ামী লীগের নেতারা বরাবরই দাবি করেছেন, দলীয় কর্মকাণ্ড ও সাংগঠনিক দক্ষতার কারণেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন।
মূলত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আত্মীয় পরিচয়ই হানিফকে অল্প সময়ের মধ্যে দলের ভেতরে-বাইরে প্রভাবশালী হয়ে উঠতে সাহায্য করে। ২০০৪ সাল পর্যন্ত হানিফ কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের একজন সাধারণ সদস্য ছিলেন। ওই বছর অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুষ্টিয়া-২ আসন থেকে মনোনয়ন চান তিনি। সেখানে মহাজোটের শরিক জাসদের (ইনু) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে মহাজোটের প্রার্থী করা হয়।
জানা গেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের কারণ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হানিফের আত্মীয়তার সম্পর্ক বড় ভূমিকা রেখেছে। হানিফের বড় ভাইয়ের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার ফুফুতো বোনের বিয়ে হয়। ওই হিসেবে শেখ হাসিনার বেয়াই হন হানিফ।
দলীয় ও সরকারি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ার পর মাহবুব উল আলম হানিফ তার প্রভাব কাজে লাগিয়ে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিপুল সম্পত্তির মালিক হন। এর মধ্যে নিজের নামে নিবন্ধিত ও ব্যাংকে গচ্ছিত সম্পত্তির হিসাব হলফনামায় উল্লেখ করলেও এর বাইরে বেনামে ও আত্মীয়স্বজনের নামে বিপুল সম্পত্তি কিনেছেন বলে অভিযোগ আছে।
হানিফের রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে তার ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডও বিস্তৃত হয়। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি ও তার পরিবারের নামে একাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, জমি এবং অন্যান্য সম্পদের তথ্য সামনে আসে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছিল, ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে হানিফ ব্যবসায়িক সুবিধা নিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগ তিনি বিভিন্ন সময় অস্বীকার করেছেন।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পরে দুদক হানিফের বিরুদ্ধে দুটি পৃথক মামলা দায়েরের সুপারিশ করে। দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনে জড়িত ছিলেন। এসব অভিযোগ এখনো বিচারাধীন এবং আদালতে প্রমাণ হয়নি।
দুদকের আবেদনের পর ঢাকার একটি আদালত মাহবুব উল আলম হানিফ ও তার স্ত্রী ফৌজিয়া আলমের আয়কর নথি জব্দের নির্দেশ দেন। আদালতে দেওয়া আবেদনে দুদক দাবি করে, হানিফের নামে থাকা একাধিক ব্যাংক হিসাবে শত শত কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি তার সম্পদ সম্পর্কেও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে হানিফের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
শুধু দুর্নীতির অভিযোগ নয়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক সহিংসতা ঘিরেও হানিফের নাম বিভিন্ন মামলায় এসেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের হওয়া একটি মামলায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন চেয়ে প্রসিকিউশন আবেদন করেছে। প্রসিকিউশনের দাবি, কুষ্টিয়ায় সংঘটিত সহিংস ঘটনার সঙ্গে তিনি নির্দেশনামূলক ভূমিকায় ছিলেন। তবে তার আইনজীবীরা এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।
একসময় আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিত হানিফ এখন একদিকে দুর্নীতির অভিযোগ, অন্যদিকে রাজনৈতিক সহিংসতা-সংক্রান্ত মামলার কারণে আইনি চাপের মুখে রয়েছেন। এর মধ্যে ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নতুন আলোচনা তার নামকে আবারও জনপরিসরে নিয়ে এসেছে।
খবরটি শেয়ার করুন