রবিবার, ২০শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৫ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছেছে বাংলাদেশ দল *** মমতার আমলে পশ্চিমবঙ্গকে বাংলাদেশে পরিণত করার চেষ্টা হয়েছিল: ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী *** উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক পরীক্ষার কারণে ১,৩৯৯টি ভূমিকম্প হয়ে থাকতে পারে: গবেষণা *** হুতিদের মোকাবিলায় এবার সৌদির পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা তুরস্কের! যুদ্ধ করবে কি? *** কমলাপুর রেলস্টেশনে পরপর দুটি ককটেল বিস্ফোরণ *** তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর আগামী নভেম্বরে করা যায় কি না, আলোচনায় ঢাকা-দিল্লি *** জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান *** মন্ত্রী বড়, নাকি সংসদ সদস্য—কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রশ্ন প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের *** আওয়ামী লীগ-জামায়াত এক হয়েও বিএনপির কিছুই করতে পারেনি: এমপি চাঁদ *** তেজগাঁওয়ে মসজিদে গোপন বৈঠক: উগ্রবাদ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ১২ জন ৩ দিনের রিমান্ডে

সুখবর এক্সপ্লেইনার

আগের সরকারের ঋণের জালে ‘আটকা’ দেশ, এগোনোর পথ কী

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০৮:৪৬ অপরাহ্ন, ১৫ই এপ্রিল ২০২৬

#

ফাইল ছবি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের মেয়াদ দুইমাস পূর্ণ হওয়ার আগেই অর্থনীতিবিদদের হিসাব বলছে, বিগত সরকারগুলোর ঋণের ভারে জর্জরিত বাংলাদেশ। বিএনপির নবগঠিত সরকার ও দেশের অর্থনীতির সামনে আগামী কয়েক বছর কঠিন বাস্তবতা অপেক্ষা করছে—বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাপ।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের দিনই সরকারের কাঁধে চাপে ২৩ লাখ কোটি টাকারও বেশি ঋণের বোঝা। ২০২৫ সালেও ব্যাংকিং উৎস থেকে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩২ শতাংশের বেশি। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই বিএনপি সরকারকে অর্থনীতির এই বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের সাম্প্রতিক হিসাব বলছে, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল—এই পাঁচ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের জন্য বাংলাদেশকে ব্যয় করতে হবে ২ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। এই পরিমাণটা শুধু বড়ই নয়, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেও তা উদ্বেগজনক।

দেশের স্বাধীনতা লাভের পরবর্তী ৫৪ বছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে বাংলাদেশ যেখানে মোট ৪ হাজার কোটি ডলার ব্যয় করেছে, সেখানে শুধু আগামী পাঁচ বছরেই সেই পরিমাণের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ, ঋণ পরিশোধের গতি ও চাপ—দুটিই এখন অতীতের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত বছরের জুন পর্যন্ত দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৭০০ কোটি ডলার, যা দেশের জাতীয় আয়ের ১৯ শতাংশ। অন্যদিকে ঋণ ও সরকারি আয়ের অনুপাত বর্তমানে ১৬.৫ শতাংশ। এটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ঝুঁকিপূর্ণ সীমা ১৮ শতাংশের নিচে থাকলেও সামগ্রিক অর্থনৈতিক চিত্র খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

তাদের মতে, এই সূচকগুলো শুধু বর্তমান অবস্থার আংশিক প্রতিফলন দেয়; ভবিষ্যতের দায়ভার আরও বড়। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো দীর্ঘমেয়াদি চিত্র। ২০২৬ থেকে ২০৩৫—এই ১০ অর্থবছরে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়াবে ৫ হাজার ১০০ কোটি ডলার। ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে সর্বোচ্চ সাড়ে ৫০০ কোটি ডলার পর্যন্ত ঋণ পরিশোধ করতে হতে পারে। 

তারা বলছেন, যদিও প্রবাসী আয় বাংলাদেশের একটি বড় শক্তি—২০২১ থেকে ২০২৫ সময়ে প্রায় ২০০ কোটি ডলার প্রবাসী আয় হয়েছে—তবুও এই আয় দিয়ে ঋণ পরিশোধের চাপ পুরোপুরি সামাল দেওয়া সহজ হবে না। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দেশের এই ঋণভার থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে সময় লাগতে পারে ২০৬৩ সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ আরও প্রায় ৩৭ বছর।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ঋণচাপের পেছনে রয়েছে বৈশ্বিক ও দেশীয়—দুই ধরনের কারণ। বৈশ্বিকভাবে, কোভিড-১৯ মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট বিশ্ব অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের রপ্তানি, প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং প্রবাসী আয়ের ওপর। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়েছে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও কমেছে। এতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে।

এছাড়া সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধীরগতি এবং জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়িয়েছে, বিশেষ করে জ্বালানি আমদানিতে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের গতি কমে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহও সংকুচিত হচ্ছে, যা ঋণ পরিশোধকে আরও জটিল করে তুলছে।

অভিজ্ঞদের মতে, দেশীয় কারণগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প। রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র, কর্ণফুলী টানেল, পদ্মা রেল সংযোগ এবং শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের মতো প্রকল্পগুলো মূলত বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে অর্থায়িত। এসব প্রকল্পের অনেকগুলোর বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়েছে, ফলে ব্যয় বেড়েছে এবং ঋণের পরিমাণও বেড়েছে।

জানা গেছে, রূপপুর প্রকল্পের ক্ষেত্রে ২০২৮ সাল থেকে বছরে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ শুরু হবে। জাপানের অর্থায়নে নির্মিত শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এখনো পুরোপুরি চালু না হওয়ায় প্রত্যাশিত আয়ও আসছে না। ফলে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়লেও আয় বাড়ছে না—এই বৈপরীত্য পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।

আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো কর ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। দেশে কর-জাতীয় আয়ের অনুপাত মাত্র ৭ শতাংশ, যা বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় কম। এর মধ্যে প্রত্যক্ষ করের অংশ আরও কম। ফলে সরকারকে উন্নয়ন ব্যয় ও অন্যান্য ব্যয় মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অর্থনীতির এই কাঠামোগত দুর্বলতা দীর্ঘমেয়াদে ঋণনির্ভরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

দেশের কর কাঠামো মূলত অপ্রত্যক্ষ করনির্ভর, যেমন আমদানি শুল্ক। কিন্তু বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে আমদানি ব্যয় বাড়লে তা অর্থনীতির ওপর দ্বিমুখী চাপ সৃষ্টি করে—একদিকে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ বাড়ে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বাজারেও মূল্যস্ফীতি বাড়ে। এতে রাজস্ব আহরণেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও ঋণদাতারা সুদের হার বাড়িয়েছে এবং ঋণ পরিশোধের সময়সীমা কমিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে গ্রেস পিরিয়ড বা ছাড় সময়ও সংকুচিত হয়েছে। ফলে ঋণের কিস্তি দ্রুত পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা চাপ আরও বাড়াচ্ছে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সমন্বিত নীতি গ্রহণ জরুরি। প্রথমত, কর ব্যবস্থার সংস্কার করে করজাল সম্প্রসারণ এবং প্রত্যক্ষ করের পরিমাণ বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস যেমন রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তৃতীয়ত, বড় প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন সময়মতো শেষ করে সেগুলো থেকে দ্রুত আয় নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক ঋণ গ্রহণে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। নতুন ঋণ নেওয়ার আগে তার সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুফল ও ঝুঁকি ভালোভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, দেশের অর্থনীতি এখন একটি সংবেদনশীল সময় অতিক্রম করছে। ঋণের বোঝা এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে না গেলেও এর প্রবণতা সতর্কবার্তা দিচ্ছে। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে এই ঋণই ভবিষ্যতে অর্থনীতির জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে একটি ব‍্যাপারে সতর্ক হতে হবে। বিদেশি ঋণ পরিশোধে বাংলাদেশ কখনো খেলাপ করেনি, যা শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে হয়েছে। বাংলাদেশকে দেখতে হবে যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধীরগতি, আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক ডামাডোল এবং বর্তমান বৈশ্বিক সংকটে তার ঋণ যাতে খেলাপ না হয়।

প্রকল্প নির্বাচনের ক্ষেত্রে কঠোর ও বস্তুনিষ্ঠ হতে হবে। বিশাল মর্যাদামূলক প্রকল্পের সংস্কৃতি রহিত করাই বাঞ্ছনীয়। সেই সঙ্গে প্রকল্পের অর্থায়নের উৎসটি যতটা সম্ভব দেশজ রাখাটা জরুরি। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমার ব্যাপারে যৌক্তিক কারণ ভিন্ন ছাড় দেওয়া যাবে না।

ঊর্ধ্বমুখী ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বনাম নতুন ঋণের ধাক্কার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অব‍্যবস্থাপনা এড়ানোর জন্য চারটি জায়গায় সক্ষমতা বৃদ্ধি জরুরি—রপ্তানি সম্প্রসারণ, দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি, উন্নত বিনিয়োগ পরিবেশ এবং কর আয় নিশ্চিতকরণ।

ঋণের জাল

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250