ফাইল ছবি
দেশের গণমাধ্যম অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত একটি বিষয় আবারও জাতীয় সংসদে উঠে এসেছে রোববার (৭ জুন)। নোয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুকের ভাষায়, এখন দেশের প্রায় সব উপজেলা, এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়েও সাংবাদিকতার কার্ড পাওয়া যায়। অথচ এসব পরিচয়পত্রধারীদের অনেকেরই সাংবাদিকতা বিষয়ে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, কেউ নিয়মিত সংবাদ সংগ্রহ বা প্রকাশনার সঙ্গে জড়িত নন, এমনকি অনেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতাও অর্জন করেননি। তার এই মন্তব্য নতুন কোনো বিতর্কের জন্ম দেয়নি; বরং বহু বছর ধরে সাংবাদিক সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে চলে আসা এক বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটিয়েছে।
রোববার জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জয়নুল আবদিন ফারুক বলেন, ইউটিউবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে যা খুশি তাই প্রচার করা হচ্ছে। কারা এসব সাংবাদিকতার কার্ড দিচ্ছে, তাদের যোগ্যতা কী এবং কারা সেই পরিচয় ব্যবহার করছে—এসব বিষয় তদন্ত করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে কার্যকর নীতিমালা বা সিদ্ধান্ত নেওয়া না হলে গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সংসদ সদস্যের বক্তব্যের জবাবে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, সরকার মিসইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশন মোকাবিলায় কাজ করছে। তার মতে, যারা পেশাগতভাবে নিবন্ধিত বা স্বীকৃত সাংবাদিক নন, তাদের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে থাকেন। তবে এই বক্তব্যের মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়—সাংবাদিক হওয়ার মানদণ্ড কী এবং কে সেই মানদণ্ড নির্ধারণ করবে?
দেশে সাংবাদিকতা এমন একটি পেশা, যেখানে প্রবেশের জন্য কোনো জাতীয় লাইসেন্স বা বাধ্যতামূলক নিবন্ধন ব্যবস্থা নেই। চিকিৎসক, আইনজীবী কিংবা প্রকৌশলীদের মতো কেন্দ্রীয় কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা সাংবাদিকদের জন্য কাজ করে না। ফলে একদিকে এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে শক্তিশালী করেছে, অন্যদিকে সাংবাদিক পরিচয়ের অপব্যবহারের সুযোগও সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ডিজিটাল যুগে একটি ফেসবুক পেজ, ইউটিউব চ্যানেল কিংবা অনলাইন পোর্টাল খুলে নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দেওয়া অত্যন্ত সহজ হয়ে গেছে।
গত এক দশকে দেশে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সময়ের তথ্য অনুযায়ী, নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা অনলাইন সংবাদমাধ্যমের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। এর বাইরে রয়েছে অসংখ্য অনিবন্ধিত ওয়েবসাইট, ইউটিউব চ্যানেল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম। এসবের মধ্যে অনেকেই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা করছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাইহীন তথ্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ, গুজব ও ব্ল্যাকমেইলকে সংবাদ পরিবেশনের নামে প্রচার করা হচ্ছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগও নতুন নয়। মূলধারার গণমাধ্যমে প্রকাশিত অসংখ্য প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিভিন্ন সময় স্থানীয় প্রশাসন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। কখনও সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে, কখনও আবার সামাজিক মাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারের হুমকি দিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন সময়ে এমন অভিযোগে বহু ব্যক্তিকে আটকও করেছে।
সাংবাদিকতা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এসব ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রকৃত সাংবাদিকরা। কারণ সাধারণ মানুষ অনেক সময় ব্যক্তি ও পেশাকে আলাদা করে দেখতে পারেন না। একজন ভুয়া সাংবাদিকের অপকর্ম পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে সংবাদমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়।
গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে সবচেয়ে বড় সংকট হলো সাংবাদিকতার পরিচয় নির্ধারণে সুস্পষ্ট পেশাগত মানদণ্ডের অভাব। অনেক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপত্র নেই, বেতন কাঠামো নেই, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই। আবার কিছু ক্ষেত্রে শুধু পরিচয়পত্র বিতরণ করেই একটি তথাকথিত সংবাদমাধ্যম পরিচালনা করা হয়। জেলা, উপজেলা কিংবা ইউনিয়ন পর্যায়ে এসব পরিচয়পত্র অনেক সময় সামাজিক ও প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ও গণমাধ্যম গবেষকরা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, সাংবাদিকতা মূলত একটি দক্ষতাভিত্তিক পেশা। তথ্য সংগ্রহ, তথ্য যাচাই, নৈতিকতা অনুসরণ, ভারসাম্যপূর্ণ উপস্থাপন এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া—এসব গুণ ছাড়া সাংবাদিকতা পূর্ণতা পায় না। কোনো পরিচয়পত্র একজন ব্যক্তিকে সাংবাদিক বানাতে পারে না; বরং তার কাজই তার পরিচয় নির্ধারণ করে।
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রসারের ফলে সাংবাদিকতা ও কনটেন্ট তৈরির মধ্যে পার্থক্য অনেক ক্ষেত্রেই অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে। বর্তমানে যে কেউ ভিডিও তৈরি করে বা লাইভ সম্প্রচার করে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারেন। এটি তথ্যপ্রবাহের গণতন্ত্রীকরণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখলেও এর ফলে অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বেড়েছে। ফলে সাংবাদিকতা, মতামত, প্রচারণা ও বিনোদন—এই চারটি ক্ষেত্রকে স্পষ্টভাবে আলাদা করার প্রয়োজনীয়তা আগের চেয়ে অনেক বেশি।
গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিক নেতাদের একটি বড় অংশ মনে করে, সমস্যার সমাধান কঠোর নিয়ন্ত্রণে নয়; বরং পেশাগত জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায়। তারা বলছেন, সাংবাদিকদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ, সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, পরিচয়পত্র বিতরণে নীতিমালা এবং অভিযোগ তদন্তের স্বাধীন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে সাংবাদিক পরিচয়ে অপরাধ করলে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে সেই প্রক্রিয়া যেন কখনও স্বাধীন সাংবাদিকতা নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার না হয়ে ওঠে, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও একই কথা বলে। বিশ্বের অধিকাংশ গণতান্ত্রিক দেশে সাংবাদিক হওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় লাইসেন্স প্রয়োজন হয় না। কারণ সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের মৌলিক উপাদান হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু একই সঙ্গে সেখানে শক্তিশালী সম্পাদকীয় নীতিমালা, পেশাগত সংগঠন, প্রেস কাউন্সিল এবং নৈতিক আচরণবিধির মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়। দেশেও অনেক বিশেষজ্ঞ সেই ধরনের কাঠামোগত সংস্কারের পক্ষে মত দিচ্ছেন।
বর্তমানে দেশের গণমাধ্যম একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে ডিজিটাল প্রযুক্তি তথ্যপ্রবাহকে সহজ করেছে, অন্যদিকে তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন সংকট তৈরি করেছে। এই বাস্তবতায় ইউনিয়ন পর্যায়ে সাংবাদিকতার কার্ড বিতরণ নিয়ে সংসদে উত্থাপিত প্রশ্ন কেবল পরিচয়পত্রের বিষয় নয়; এটি সাংবাদিকতার পেশাগত মান, গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং জনস্বার্থ রক্ষার সক্ষমতার প্রশ্ন।
সাংবাদিকতার মূল শক্তি কখনোই একটি কার্ড বা পরিচয়পত্র নয়; তার শক্তি সত্য অনুসন্ধান, তথ্য যাচাই এবং জনগণের আস্থা। সেই আস্থা যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে ক্ষতি শুধু একটি পেশার নয়, পুরো সমাজের। তাই অপ-সাংবাদিকতা, ভুয়া পরিচয়, চাঁদাবাজি ও অপতথ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রকৃত সাংবাদিকতার পরিবেশও শক্তিশালী করতে হবে। অন্যথায় ইউনিয়ন থেকে রাজধানী পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া এই সংকট ভবিষ্যতে গণমাধ্যমের জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
খবরটি শেয়ার করুন