ছবি: সংগৃহীত
গত ৫ই নভেম্বর দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক আনাড়ি কলামিস্টের উপসম্পাদকীয়ের মাধ্যমে পত্রিকাটি দাবি করেছে, আওয়ামী লীগের বিগত সরকারের আমলে ভারত প্রশ্নে প্রথম আলোর ভূমিকা নিয়ে অনেকের মুখেই সমালোচনা শোনা যায়। তবে এই সমালোচনা করার বেলায় মাথায় রাখতে হবে, ওই সময় শুধু প্রথম আলো নয়, মূলধারার যেকোনো সংবাদমাধ্যমেই ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে সংবাদ বা বিশ্লেষণ প্রকাশ করা কঠিন ছিল। তখন একাধিক সংবাদমাধ্যম–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ভারত প্রশ্নে সমালোচনামূলক সংবাদ বা বিশ্লেষণ ছাপার পরে ঢাকাস্থ ভারতীয় দূতাবাস থেকে হুমকি দেওয়া হয়।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর নানাভাবে সমালোচিত হয় ওই সরকারের সঙ্গে ভারত সরকারের কূটনৈতিক সম্পর্কের ধরন। বিশেষ করে, একতরফা তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের সরকারের মেয়াদ দীর্ঘায়িত হওয়ার পেছনে ভারতের ভূমিকার সমালোচনা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালেও কম-বেশি ছিল। আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ববাদী সরকারের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত করার অভিযোগ আছে। তবে গত সরকারের আমলে ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশন দেশের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেছে, এমন অভিযোগ সাংবাদিক সমাজ কখনোই করেনি।
পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রথম আলোই প্রথমবারের মতো এ ধরনের অভিযোগ সামনে এনেছে। এর অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে, ঢাকাস্থ পাকিস্তান হাইকমিশনের সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে চায় প্রথম আলো। আগের মতো পাকিস্তান হাইকমিশনের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক চায় এই গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানটি। সম্পর্ক জোরদার করার বিষয়ে প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ নানা সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ২০০১-২০০৬ সালে পাকিস্তান হাইকমিশনের সঙ্গে প্রথম আলোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এক এগারোর জরুরি অবস্থার তত্বাবধায়ক সরকারের আমল থেকে ওই সম্পর্কে ভাটার টান পড়ে।
সূত্র বলছে, বাংলাদেশ প্রশ্নে যখন যে দেশি-বিদেশি শক্তি প্রভাবশালী, প্রথম আলো তাদের সঙ্গে থাকতে চায় শুরু থেকেই। আওয়ামী লীগের সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পাকিস্তানের সঙ্গে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কূটনৈতিক সম্পর্ক উষ্ণতর হয়েছে। দেশে পাকিস্তান হাইকমিশনের প্রভাব আওয়ামী লীগের সরকারের আমলের তুলনায় অনেক বেড়েছে। প্রথম আলো নিজেকে কখনোই কোনো রাজনৈতিক দলের মুখপত্র ভাবে না। পত্রিকাটির কর্তৃপক্ষ দেশে কারা ক্ষমতায় থাকবে কী থাকবে না, এ বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের ভূমিকায় থাকতে বেশি আগ্রহী।
সূত্র জানায়, পাকিস্তানি হাইকমিশনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের অংশ হিসেবে প্রথম আলো ভারত সরকারকে একতরফা দোষারোপ করে গত ২৬শে ডিসেম্বর একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে 'কূটনৈতিক সম্পর্কে উত্তেজনা: দিল্লিকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে' শিরোনামে। কূটনৈতিক বিষয়ে সাধারণত একতরফা সম্পাদকীয় প্রথম আলো ছাপায় না। পাকিস্তানের হাইকমিশনের ঘনিষ্ঠ হতেই প্রথম আলো ওই সম্পাদকীয় ছেপেছে।
এতে ভারতবিদ্বেষী রাজনৈতিক দলগুলোর ভাষ্যই তুলে ধরা হয়েছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনে অন্তর্বর্তী সরকারেরও কম-বেশি দায় আছে, এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য তুলে ধরা হয়নি সম্পাদকীয়তে।
এই সম্পাদকীয়তে প্রথম আলো এমন দাবিও করেছে, বাংলাদেশের জনগণের কাছে এটা মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে ভারতের ভূখণ্ড বাংলাদেশবিরোধী কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভারতের কূটনৈতিক নীতিনির্ধারকেরা যে বিষয়গুলো জানেন না, এমনও নয়। এ ধরনের ভাষ্য সাধারণত রাজনৈতিক দলগুলোর।
জানা গেছে, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বে চারদলের জোট সরকারের আমলে ভারতীয় হাইকমিশনের সঙ্গে সম্পর্কে দূরত্ব বজায় রাখে প্রথম আলো। তখন দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের কোনো খবর পত্রিকাটি ছাপাতো না। ২০০৮ সালের শেষ দিকে ভারতীয় হাইকমিশনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে গুরুত্ব দেয় পত্রিকাটির কর্তৃপক্ষ। অবশ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে প্রকাশনা শুরুর দিন থেকে আজ পর্যন্ত প্রথম আলোর সম্পর্ক একইরকম আছে, অর্থাৎ সুসম্পর্ক বজায় রয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন