ছবি: সংগৃহীত
ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী দায়িত্ব গ্রহণের আগেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন। বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের পর তিনি ভূপেন হাজারিকার বিখ্যাত গানের লাইন—“একই আকাশ, একই বাতাস, একই প্রাণের স্পন্দন”—উদ্ধৃত করে দুই দেশের জনগণের ঘনিষ্ঠতার কথা বলেন।
একই সঙ্গে ভারতের ১৪০ কোটি ও বাংলাদেশের প্রায় ২০ কোটি মানুষের সম্মিলিত সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন। তার এই বক্তব্যকে কেউ দেখছেন দুই দেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের স্বীকৃতি হিসেবে, আবার কেউ এটিকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে অস্পষ্ট বা বিতর্কিত ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।
ফলে নতুন হাইকমিশনারের প্রথম বক্তব্যই বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সরকার, বিরোধী দল, ইসলামপন্থী সংগঠন, কূটনীতিক ও বিশ্লেষকদের মধ্যে এ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি কেবল সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতার ভাষা, নাকি এর মধ্যে বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তা লুকিয়ে আছে?
দীনেশ ত্রিবেদী বেনাপোলে সাংবাদিকদের বলেন, “আমার তো মনে হচ্ছে না, আমি বাংলাদেশে এসেছি। একই আকাশ, একই বাতাস। ভারতের ১৪০ কোটি আর বাংলাদেশের ২০ কোটি—এই ১৬০ কোটি মানুষের জন্য যা ভালো হয়, সেটাই করা হবে।” তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোতে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
সাধারণ কূটনৈতিক ভাষার তুলনায় তার বক্তব্য ছিল অনেক বেশি আবেগপ্রবণ ও রাজনৈতিক। কারণ, তিনি পেশাদার কূটনীতিক নন; বরং ভারতের জাতীয় রাজনীতির পরিচিত মুখ। একসময় ভারতের রেলমন্ত্রী ছিলেন, দীর্ঘদিন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পরে বিজেপিতে যোগ দেন। ফলে তার বক্তব্যকে অনেকে একজন রাজনীতিকের ভাষা হিসেবে দেখছেন, যেখানে প্রতীক ও আবেগের ব্যবহার বেশি থাকে।
কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই বক্তব্য ভিন্নভাবে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। বিশেষ করে “আমার মনে হচ্ছে না যে আমি বাংলাদেশে এসেছি” এবং “১৪০ কোটির সঙ্গে ২০ কোটি যোগ করেছি”—এই দুটি বাক্যকে কেন্দ্র করেই বিতর্কের সূত্রপাত।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন সরাসরি দীনেশ ত্রিবেদীর নাম উল্লেখ না করলেও তার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া দেন। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্কভুক্ত দেশগুলোর মোট জনসংখ্যা ২২০ কোটির বেশি। যদি আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা বলতে হয়, তবে শুধু ভারত ও বাংলাদেশের জনগণকে একসঙ্গে দেখার পরিবর্তে বৃহত্তর আঞ্চলিক কাঠামোর কথা বলা উচিত। অন্য কোনো রাজনৈতিক কাঠামোর ইঙ্গিত থাকলে সেটিকে সন্দেহের চোখে দেখা হবে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান ফেসবুক পোস্টে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যের ব্যাখ্যা চাওয়ার জন্য। তার মতে, ভারত ও বাংলাদেশ দুটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। “এক হয়ে যাওয়া” ধরনের বক্তব্যের অর্থ স্পষ্ট না হলে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
আরও তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছে কয়েকটি ইসলামপন্থী সংগঠন থেকে। তারা অভিযোগ করেছে, এ বক্তব্যের মাধ্যমে “অখণ্ড ভারত” ধারণাকে পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। যদিও দীনেশ ত্রিবেদী নিজে কোথাও বাংলাদেশকে ভারতের অংশ করার কথা বলেননি, বা রাজনৈতিক একীভূতকরণের কোনো প্রস্তাবও দেননি, তবুও তার বক্তব্যের ভাষা ও উপস্থাপনা রাজনৈতিক ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। তাদের মতে, ভূপেন হাজারিকার গান উদ্ধৃত করে দীনেশ ত্রিবেদী মূলত বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সাংস্কৃতিক ঐক্য, সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক সম্পর্ক এবং ভারত-বাংলাদেশের সামাজিক ঘনিষ্ঠতার কথাই বোঝাতে চেয়েছেন। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, খাদ্যসংস্কৃতি এবং পারিবারিক যোগাযোগের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক যোগাযোগ এখনও অত্যন্ত গভীর।
ভূপেন হাজারিকার গানও মূলত সীমান্ত অতিক্রমকারী মানবিক সম্পর্ক, নদী, প্রকৃতি ও মানুষের অভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা বলে। তাই তার গানের উদ্ধৃতি ব্যবহারকে সাংস্কৃতিক কূটনীতির অংশ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। তবে সমস্যাটি অন্য জায়গায়। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বর্তমানে এমন এক সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে শব্দের রাজনৈতিক অর্থ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শেখ হাসিনা সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। তিস্তার পানি বণ্টন, সীমান্তে হত্যা, কথিত “পুশ-ইন”, ভিসা সীমাবদ্ধতা, বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা এবং রাজনৈতিক আস্থার ঘাটতি—এসব বিষয় জনমনে ভারত সম্পর্কে নানা ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এমন একটি সময়ে নতুন হাইকমিশনারের কাছ থেকে অনেকেই আরও পরিমিত ও স্পষ্ট কূটনৈতিক ভাষা প্রত্যাশা করেছিলেন। ফলে তার বক্তব্যের আক্ষরিক অর্থ নয়, বরং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটই বিতর্ককে উসকে দিয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভারত এই প্রথম বাংলাদেশে একজন পেশাদার ভারতীয় পররাষ্ট্রসেবা (আইএফএস) কর্মকর্তার পরিবর্তে একজন সক্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর গত ৫৫ বছরের ইতিহাসে এমন নজির নেই। ফলে নয়াদিল্লির এই সিদ্ধান্তকেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন পর্যবেক্ষকরা।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, ভারতের এ সিদ্ধান্তের মধ্যেই একটি বার্তা রয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলোর বড় অংশই রাজনৈতিক; তাই শুধু আমলাতান্ত্রিক কূটনীতি দিয়ে এগুলো মোকাবিলা করা কঠিন। একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ রাজনৈতিক পর্যায়ের যোগাযোগ বাড়াতে এবং জটিল সম্পর্ক ব্যবস্থাপনায় বেশি কার্যকর হতে পারেন—নয়াদিল্লির ধারণা সম্ভবত এমনই।
দীনেশ ত্রিবেদীর বাংলাদেশে সড়কপথে প্রবেশকেও অনেকে প্রতীকী বার্তা হিসেবে দেখছেন। বিমানে সরাসরি ঢাকায় না এসে স্থলসীমান্ত দিয়ে প্রবেশের মাধ্যমে তিনি দুই দেশের ভৌগোলিক সংযোগ ও জনগণের পারস্পরিক সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরতে চেয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে ভারত-সংক্রান্ত যেকোনো বক্তব্য দ্রুত রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নেয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস, অসম শক্তির সম্পর্কের ধারণা, সীমান্ত ও পানিবণ্টন ইস্যু এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারত প্রসঙ্গের ব্যবহার। ফলে ভারতের কোনো প্রতিনিধি সাংস্কৃতিক ঐক্যের কথা বললেও সেটি অনেক সময় রাজনৈতিক আধিপত্যের আশঙ্কার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়।
অন্যদিকে ভারতের নীতিনির্ধারকদের কাছেও বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী রাষ্ট্র। নিরাপত্তা, অর্থনীতি, সংযোগ, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গুরুত্ব ক্রমাগত বেড়েছে। ফলে নয়াদিল্লি বর্তমানে শুধু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের নয়, রাজনৈতিক ও জনপর্যায়ের যোগাযোগকেও গুরুত্ব দিতে চাইছে বলে ধারণা করা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যকে দুইভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। প্রথমত, এটি দুই দেশের জনগণের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক সম্পর্কের প্রতি এক ধরনের আবেগঘন স্বীকৃতি। দ্বিতীয়ত, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ব্যবহৃত ভাষার কারণে এটি সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
এখন পর্যন্ত ভারতীয় হাইকমিশন, বা নয়াদিল্লি থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তবে দীনেশ ত্রিবেদীর পুরো বক্তব্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি মূলত সহযোগিতা, জনসম্পর্ক, প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভিসা সমস্যার সমাধানের কথাই বলেছেন। রাজনৈতিক একীভূতকরণ বা রাষ্ট্রীয় সংযুক্তির কোনো প্রস্তাব তিনি দেননি।
তবুও এ বিতর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে—বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আজ শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়; এটি জাতীয় পরিচয়, সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং জনমতের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে। ফলে দুই দেশের প্রতিনিধিদের প্রতিটি শব্দই এখন বাড়তি গুরুত্ব বহন করে।
ভূপেন হাজারিকার ‘একই আকাশ, একই বাতাস’ হয়তো দুই বাংলার সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতা, ইতিহাস ও মানবিক বন্ধনের একটি কাব্যিক রূপক। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই রূপকও ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যার জন্ম দিতে পারে। দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্য ঘিরে সৃষ্ট বিতর্ক শেষ পর্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাই সামনে এনেছে—বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতার বিষয় নয়; এটি জাতীয় পরিচয়, সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক রাজনীতি, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং জনগণের আবেগের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।
তাই আগামী দিনে এ সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে হলে দুই দেশকেই পারস্পরিক সংবেদনশীলতা, স্পষ্ট যোগাযোগ এবং আস্থাভিত্তিক রাজনৈতিক সংলাপের ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। দীনেশ ত্রিবেদীর মন্তব্য নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, সেটি শেষ পর্যন্ত দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা, পারস্পরিক প্রত্যাশা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্র হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে।
খবরটি শেয়ার করুন