ছবি: সংগৃহীত
শরীয়তপুরের গ্রামের ভেতর দিয়ে হাঁটলে চোখে পড়ে দৃষ্টিনন্দন পাকা বাড়ি, আধুনিক নকশার দালান আর প্রবাসী পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতার নানা চিহ্ন। এসব বাড়ি অনেক তরুণের কাছে সফলতার প্রতীক। বিশেষ করে ইতালিপ্রবাসীদের অর্জনের গল্প স্থানীয় সমাজে এক ধরনের আকর্ষণ তৈরি করেছে। কিন্তু সেই সফলতার গল্পের আড়ালে লুকিয়ে আছে অসংখ্য ব্যর্থতা, প্রতারণা, নির্যাতন, মৃত্যু ও মানবিক বিপর্যয়ের করুণ ইতিহাস।
লিবিয়া হয়ে অবৈধভাবে ইতালিতে প্রবেশের যে পথকে অনেক তরুণ এখনো মুক্তির রাস্তা হিসেবে দেখেন, বাস্তবে সেটি পরিণত হয়েছে মানবপাচারকারীদের নির্মম ব্যবসা এবং হাজারো স্বপ্নভঙ্গের করিডোরে।
শরীয়তপুরের খবির হোসেন খান এবং মোহাম্মদ আরিফ ব্যাপারীর অভিজ্ঞতা সেই অন্ধকার বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। উন্নত জীবনের আশায় তারা দেশ ছেড়েছিলেন। কিন্তু ইউরোপের স্বপ্নের পরিবর্তে তাদের ভাগ্যে জুটেছে বন্দিদশা, নির্যাতন, মুক্তিপণের চাপ, সমুদ্রে মৃত্যুভয় এবং দেশে ফিরে অসহনীয় ঋণের বোঝা।
ইউরোপে অভিবাসনের আকাঙ্ক্ষা নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষ করে শরীয়তপুর, মাদারীপুর, মুন্সিগঞ্জ ও কুমিল্লার মতো জেলাগুলোতে ইতালিতে অভিবাসনের প্রবণতা বেশি। এসব এলাকায় প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স স্থানীয় অর্থনীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন এনেছে। ফলে তরুণদের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, যেকোনো উপায়ে ইউরোপে পৌঁছাতে পারলেই জীবন বদলে যাবে। এই আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করে সক্রিয় হয়ে ওঠে দালাল ও মানবপাচারকারী চক্র।
মানবপাচারের এই নেটওয়ার্ক অত্যন্ত সুসংগঠিত। বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্য, সেখান থেকে মিশর হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছে দেওয়া হয় অভিবাসীদের। যাত্রার শুরুতে তাদের দেখানো হয় দ্রুত ইতালি পৌঁছানোর স্বপ্ন। বলা হয়, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইউরোপে পৌঁছে ভালো আয় করা যাবে। কিন্তু লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে ওঠে।
খবির হোসেনের বর্ণনা অনুযায়ী, লিবিয়ার বিভিন্ন ‘গেম হাউজ’ বা অস্থায়ী বন্দিশিবিরে অভিবাসীদের গাদাগাদি করে রাখা হয়। সেখানে খাবারের সংকট, চিকিৎসাহীনতা, শারীরিক নির্যাতন এবং মানসিক নিপীড়ন নিত্যদিনের ঘটনা। অনেক সময় পরিবার থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের জন্য অভিবাসীদের মারধর করে ভিডিও ধারণ করা হয় এবং তা স্বজনদের কাছে পাঠানো হয়। মুক্তিপণ না পেলে নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়ানো হয়।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বহু বছর ধরেই লিবিয়ায় অভিবাসীদের ওপর চালানো নির্যাতনের তথ্য প্রকাশ করে আসছে। জাতিসংঘ, মানবাধিকার সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, লিবিয়ার অনেক ডিটেনশন সেন্টারে জোরপূর্বক শ্রম, নির্যাতন, যৌন সহিংসতা এবং চাঁদাবাজির ঘটনা নিয়মিত ঘটে। মানবপাচারকারীদের পাশাপাশি কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীও এই অবৈধ ব্যবসা থেকে লাভবান হয়।
আরিফ ব্যাপারীর অভিজ্ঞতা আরও ভয়াবহ। ইতালির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করার মাত্র দেড় ঘণ্টার মধ্যে নৌকাডুবির শিকার হন তিনি। অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই ছোট নৌকাগুলো ভূমধ্যসাগরে প্রায়ই দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। অনেক সময় নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই শত শত মানুষকে সমুদ্রে নামিয়ে দেওয়া হয়। ফলে দুর্ঘটনা ঘটলে অধিকাংশ যাত্রীর বেঁচে ফেরার সুযোগ থাকে না।
ভূমধ্যসাগরকে বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী অভিবাসন রুট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্যমতে, ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ৩১ হাজারেরও বেশি অভিবাসী মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি রয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ অনেক নিখোঁজের তথ্য কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয় না।
তবে এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে কম আলোচিত দিক হলো দেশে ফিরে আসা অভিবাসীদের জীবনসংগ্রাম। বিদেশে যেতে অধিকাংশ পরিবার জমি বিক্রি করে, সঞ্চয় শেষ করে বা উচ্চ সুদে ঋণ নেয়। ফলে যাত্রা ব্যর্থ হলে পুরো পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে। খবিরের মতো অনেকেই দেশে ফিরে কয়েক লাখ থেকে কয়েক কোটি টাকার দেনার দায় কাঁধে নিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করার চেষ্টা করেন। কিন্তু স্থানীয় শ্রমবাজারে সীমিত আয়ের কারণে সেই ঋণ পরিশোধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।
শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, মানসিক স্বাস্থ্য সংকটও বড় একটি সমস্যা। দীর্ঘদিন বন্দিজীবন, নির্যাতন, অনিশ্চয়তা এবং মৃত্যুভয়ের অভিজ্ঞতা অনেকের মধ্যে ট্রমা, উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও অনিদ্রার মতো সমস্যা তৈরি করে। আরিফের মতো অনেককে দেশে ফিরে কাউন্সেলিং নিতে হয়েছে। কিন্তু দেশে প্রত্যাবর্তনকারী অভিবাসীদের জন্য পর্যাপ্ত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখনো গড়ে ওঠেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়। মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি বৈধ অভিবাসন বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নিরাপদ শ্রম অভিবাসনের সুযোগ সম্প্রসারণ না করলে তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ পথে যাওয়া বন্ধ করা কঠিন হবে।
সরকার ইতোমধ্যে মানবপাচার রোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য বৈধ চ্যানেল ব্যবহারের আহ্বান জানিয়ে আসছে। তবে বাস্তবতা হলো, গ্রামাঞ্চলে এখনো অনেক তরুণ দালালদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে প্রভাবিত হচ্ছেন। কারণ তারা সামনে দেখতে পান সফল প্রবাসীদের গল্প, কিন্তু দেখতে পান না সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়া কিংবা ঋণগ্রস্ত হয়ে ফিরে আসা মানুষের জীবন।
সন্ধ্যা নামলে শরীয়তপুরের চায়ের দোকানগুলোতে এখনো ইতালি যাওয়ার গল্প শোনা যায়। সেই গল্পে থাকে সাফল্যের কাহিনি, কিন্তু খুব কমই আলোচিত হয় খবির বা আরিফদের মতো মানুষের দীর্ঘশ্বাস। অথচ তাদের অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অবৈধ পথে ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্ন কেবল একটি ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা নয়; এটি অনেক সময় একটি পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক, সামাজিক ও মানসিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়।
ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউ পেরিয়ে যারা আর ফিরে আসেন না, তাদের গল্প হয়তো সংবাদ শিরোনামে আসে। কিন্তু যারা বেঁচে ফেরেন, তাদের নীরব সংগ্রামও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইতালির স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার পর তাদের সামনে দাঁড়ায় আরেক বাস্তবতা—ঋণ শোধ, সামাজিক মর্যাদা রক্ষা এবং নতুন করে জীবন গড়ে তোলার কঠিন লড়াই। সেই লড়াইয়ের গল্পই আজ দেশের অভিবাসন সংকটের সবচেয়ে মানবিক এবং সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়।
খবরটি শেয়ার করুন