ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) অভিযোগ করেছে, বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া লিমিটেডের অধীন দৈনিক কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ডেইলি সান এবং বাংলানিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম তাদের নেতা ও এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক এবং সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে ‘মিথ্যাচার’ ও ‘সংঘবদ্ধ প্রোপাগান্ডা’ চালাচ্ছে।
গতকাল শুক্রবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দলটি এ অভিযোগ তুলে ধরে এবং পাঠক–দর্শকের আস্থা ধরে রাখতে সংবাদমাধ্যমকে দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করে, এসব গণমাধ্যম জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত চরিত্রহননের অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিটি এনসিপির দপ্তর সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা গণমাধ্যমে পাঠান। ‘কতিপয় সংবাদমাধ্যমের চরম অপেশাদারত্ব ও সংঘবদ্ধ প্রোপাগান্ডার ঘটনায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) গভীর উদ্বেগ’ শিরোনামের ওই বিবৃতিতে দাবি করা হয়, দেশের মূলধারার কিছু সংবাদমাধ্যম সাংবাদিকতার স্বীকৃত নীতিমালা উপেক্ষা করে প্রমাণ ছাড়া সংবাদ প্রকাশ করছে এবং জুলাই অভ্যুত্থানের নেতাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সংবাদমাধ্যমের কাজ গণস্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু তাদের অভিযোগ, বসুন্ধরা গ্রুপের ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া লিমিটেডের অধীন কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ডেইলি সান ও বাংলানিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম জুলাই অভ্যুত্থানবিরোধী অবস্থান নিয়েছে এবং বিশেষ করে হাসনাত আবদুল্লাহকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিকভাবে বিভ্রান্তিকর প্রতিবেদন প্রকাশ করছে।
এনসিপির দাবি, জাতীয় সংসদে হাসনাত আবদুল্লাহ কিছু গণমাধ্যমের ভূমিকা এবং একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ উত্থাপন করার পর থেকেই তার বিরুদ্ধে এসব সংবাদমাধ্যমের প্রচারণা আরও তীব্র হয়েছে।
দলটি আরও অভিযোগ করেছে, বিভিন্ন টেলিভিশন টকশো ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আওয়ামী লীগের পক্ষে বয়ান তৈরির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে। একই সঙ্গে তারা সরকারের প্রতি দ্রুত একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়েছে এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত আওয়ামী লীগের পক্ষে অবস্থান নেওয়া ব্যক্তিদের টকশোতে আমন্ত্রণ না জানানোরও আহ্বান জানিয়েছে।
এনসিপির এসব অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর বিপরীতে একটি মৌলিক প্রশ্নও সামনে আসে—কোনো রাজনৈতিক নেতা বা দলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠলে সংবাদমাধ্যম কি তা প্রকাশ করতে পারবে না? কোনো দল যদি কোনো প্রতিবেদনকে অপছন্দ করে, তাহলে কি সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘মিথ্যাচার’ বা ‘প্রোপাগান্ডা’ হয়ে যায়? নাকি অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত তথ্য, নথি, তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার ওপরই নির্ভর করবে?
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা, সাবেক ছাত্রনেতা এবং এনসিপি–সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তির কর্মকাণ্ড নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে সরকারি নিয়োগে প্রভাব বিস্তার, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, ব্যবসায়িক সুবিধা নেওয়া, প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটানো, সরকারি সম্পদ ব্যবহারে প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার মতো বিভিন্ন অভিযোগ উঠে এসেছে।
হাসনাত আবদুল্লাহকে ঘিরেও বিভিন্ন সময়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে তার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের ব্যবসায়িক সুবিধা, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে বিভিন্ন নথি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং অনুসন্ধানী তথ্য উপস্থাপনের দাবি করা হয়েছে। তবে হাসনাত আবদুল্লাহ ও তার ঘনিষ্ঠরা বিভিন্ন সময় এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের বক্তব্য, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা চলছে।
শুধু হাসনাত আবদুল্লাহ নন, এনসিপির আরও কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধেও ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার, সরকারি সুযোগ–সুবিধা ব্যবহার, ব্যবসায়িক যোগাযোগে রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যবহার এবং দলীয় প্রভাব খাটানোর অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে এসেছে। যদিও প্রতিটি ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অথবা দাবি করেছেন, তাদের বক্তব্য যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তথ্য বিকৃত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।
এনসিপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দলটির বিরুদ্ধে ক্ষমতার ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ বিভিন্ন মহলে আলোচনা হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজের কিছু অংশ এবং বিভিন্ন গণমাধ্যম অভিযোগ করেছে, পরিবর্তনের রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে দলটির কিছু নেতা প্রশাসনিক প্রভাব, নিয়োগ, ব্যবসায়িক যোগাযোগ ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছেন। এসব অভিযোগের অনেকগুলো এখনো বিচারিক বা প্রশাসনিকভাবে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সেগুলো জনস্বার্থের প্রশ্ন হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।
গণমাধ্যম গবেষকদের মতে, কোনো রাজনৈতিক দল নতুন হোক বা পুরোনো—জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট অভিযোগের অনুসন্ধান ও প্রকাশ সাংবাদিকতার অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। তবে সেই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অবশ্যই তথ্য যাচাই, নথির ভিত্তি, একাধিক সূত্র এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। একইভাবে অভিযোগের ভাষা ও শিরোনামে অতিরঞ্জন কিংবা বিচারিক সিদ্ধান্তের আগেই কাউকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করাও সাংবাদিকতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
দেশের সংবাদমাধ্যম দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক মেরুকরণের অভিযোগের মুখে রয়েছে। অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কিছু সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকীয় অবস্থান নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে, তেমনি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় অন্য পক্ষের বিরুদ্ধেও নির্বাচিতভাবে সংবাদ প্রকাশের অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। ফলে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেই সমর্থকেরা সেটিকে সাহসী সাংবাদিকতা এবং সমালোচকেরা সেটিকে ষড়যন্ত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। এতে জনপরিসরে তথ্যভিত্তিক বিতর্কের পরিবর্তে রাজনৈতিক অবস্থানই অনেক সময় প্রধান হয়ে উঠছে।
বাস্তবতা হলো, কোনো গণমাধ্যমের অতীত ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা থাকতেই পারে। কিন্তু সেই কারণে তাদের বর্তমানের প্রতিটি প্রতিবেদনকে প্রমাণ ছাড়াই মিথ্যা বলা যেমন যুক্তিসঙ্গত নয়, তেমনি কোনো সংবাদ প্রকাশিত হলেই সেটিকে চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়াও সমানভাবে ভুল। সাংবাদিকতার গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে তথ্য, নথি, নিরপেক্ষ অনুসন্ধান, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এবং পরবর্তী জবাবদিহির ওপর।
দেশের রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। জুলাই আন্দোলনের পর যেসব নেতা দুর্নীতিবিরোধী রাজনীতি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি দিয়ে সামনে এসেছেন, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেটি স্বাভাবিকভাবেই বেশি জনমনোযোগ পায়। কারণ জনগণের প্রত্যাশা থাকে, পরিবর্তনের কথা বলা নেতাদের নিজেদের আচরণও একই মানদণ্ডে বিচারযোগ্য হবে।
গণতান্ত্রিক সমাজে সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো—ক্ষমতার প্রতিটি কেন্দ্রকে প্রশ্ন করা। সেই ক্ষমতা সরকার, বিরোধী দল, নতুন রাজনৈতিক শক্তি বা জনপ্রিয় কোনো নেতার হাতেই থাকুক না কেন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোরও অধিকার রয়েছে কোনো প্রতিবেদনকে তথ্যভিত্তিকভাবে চ্যালেঞ্জ করা, প্রতিবাদ পাঠানো, আইনি প্রতিকার চাওয়া বা প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করা। কিন্তু সব সমালোচনামূলক প্রতিবেদনকে এককথায় ‘প্রোপাগান্ডা’ বা ‘মিথ্যাচার’ বলে উড়িয়ে দিলে তথ্যনির্ভর জনআলোচনা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমেরও আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। যদি কোনো প্রতিবেদন ভুল প্রমাণিত হয়, তবে তা সংশোধন করা, প্রয়োজন হলে ক্ষমা চাওয়া এবং তথ্য যাচাইয়ের মান আরও উন্নত করা গণমাধ্যমের দায়িত্ব। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা যেমন অপরিহার্য, তেমনি সেই স্বাধীনতার সঙ্গে জবাবদিহিও অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।
সব মিলিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আস্থার প্রশ্ন। এনসিপি বলছে, তাদের নেতাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত প্রচারণা চালানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোর অবস্থান হলো, তারা জনস্বার্থে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করছে এবং ক্ষমতার নতুন কেন্দ্রগুলোকেও জবাবদিহির আওতায় আনছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে কোনটি অধিকতর সত্য, তা শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে তথ্য, নথি, স্বাধীন তদন্ত, আদালতের প্রক্রিয়া এবং জনসম্মুখে জবাবদিহির মাধ্যমে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যমের কাজ শুধু সরকারের প্রশংসা করা নয়, বরং যে–কোনো ক্ষমতাকেন্দ্রকে প্রশ্ন করা। সেই ক্ষমতাকেন্দ্র যদি নতুন রাজনৈতিক দল বা জনপ্রিয় কোনো নেতাও হন, তাহলেও সাংবাদিকতার এই অধিকার অক্ষুণ্ন থাকে। একই সঙ্গে অভিযোগপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা দলেরও পূর্ণ অধিকার রয়েছে তথ্য–প্রমাণসহ নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার। গণতন্ত্রের সুস্থ বিকাশ নির্ভর করে এই দুই অধিকারের ভারসাম্যের ওপর।
তাই মূল প্রশ্নটি সংবাদমাধ্যম হাসনাত আবদুল্লাহ বা এনসিপির বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারবে কি না—তা নয়; বরং সেই প্রতিবেদন কতটা তথ্যনির্ভর, যাচাইযোগ্য, ন্যায্য এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট, আর সেই প্রতিবেদনকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া কতটা তথ্যসমর্থিত—সেটিই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
খবরটি শেয়ার করুন