ফাইল ছবি
জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব সম্প্রসারণ, জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বাণিজ্য ও প্রযুক্তি সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে আগামী ২৬ অক্টোবর টোকিও যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিন দিনের রাষ্ট্রীয় এই সফরে দুই দেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগিতাকে নতুন পর্যায়ে নেওয়ার পাশাপাশি পরিবহন, জ্বালানি, শিল্প, অবকাঠামো ও দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে। সফরের আগে জাপানের সঙ্গে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও সহযোগিতা প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
আজ শনিবার, ১৭ অক্টোবর, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন জানান, প্রধানমন্ত্রী ২৬ অক্টোবর তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে জাপান যাবেন। প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও কার্যালয়ে সফররত জাপানি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের পর তিনি এ কথা বলেন। সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্ক আরও উচ্চতর পর্যায়ে উন্নীত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। সফরের আগে জাপানি প্রতিনিধিদলটি বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বাণিজ্য ও ব্যবসায়িক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করছে।
এর আগে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছিলেন, জাপান সফরে বাংলাদেশের প্রধান অগ্রাধিকার হবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব সুদৃঢ় করা এবং বিনিয়োগ বাড়ানো। হুমায়ুন কবিরের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখন বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নির্দিষ্ট খাতে পারস্পরিক বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে চায়। জাপান বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগী। দেশটির বিনিয়োগ বাংলাদেশের একাধিক বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তথ্যমতে, ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত সময়ের জন্য জাপানের কাছে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার বা ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ ও সহযোগিতা প্রস্তাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। প্রস্তাবিত কর্মসূচিতে ১২টি অগ্রাধিকার খাত রয়েছে। এতে সহজ শর্তের ঋণ, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এটি বাংলাদেশের প্রস্তাবিত সহযোগিতা প্যাকেজ।
প্রস্তাবিত প্যাকেজে পরিবহন ও নগর যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে প্রায় ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন চাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর আওতায় মেট্রোরেল সম্প্রসারণ, রেলপথ উন্নয়ন এবং বড় সেতু নির্মাণের মতো প্রকল্প রয়েছে। ঢাকার যোগাযোগব্যবস্থার পাশাপাশি চট্টগ্রাম, মাতারবাড়ী ও কক্সবাজার অঞ্চলের মধ্যে সংযোগ বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মধ্যে মেঘনা নদীর ওপর সেতু নির্মাণে জাপানের সহযোগিতা চাওয়ার পরিকল্পনার কথাও একাধিক সূত্র জানিয়েছে সুখবর ডটকমকে।
মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে শিল্প, বন্দর ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য আরও প্রায় ৩ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন প্রস্তাবের কথা জানিয়েছে সূত্র। গভীর সমুদ্রবন্দর, সড়ক ও রেল যোগাযোগ, শিল্প অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের মাধ্যমে এ অঞ্চলকে আঞ্চলিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার লক্ষ্য রয়েছে। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয়ের দ্বিতীয় পর্যায়ের উদ্যোগের সঙ্গেও এসব পরিকল্পনার সম্পর্ক রয়েছে। বাস্তবায়ন হলে এ ধরনের অবকাঠামো বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে সহায়ক হতে পারে।
শুধু অবকাঠামো নয়, উৎপাদনশিল্পেও জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশ উৎপাদন, ইলেকট্রনিকস, যন্ত্রপাতি এবং অর্ধপরিবাহী প্রযুক্তির মতো খাতে সহযোগিতা চাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশের প্রচলিত তৈরি পোশাকনির্ভর রপ্তানি কাঠামোর বাইরে নতুন শিল্প খাত গড়ে তোলা এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। জাপানি প্রযুক্তি ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে দেশে উচ্চ মূল্য সংযোজনকারী শিল্প প্রতিষ্ঠা করা গেলে রপ্তানির পণ্যে বৈচিত্র্য আনার সুযোগ তৈরি হবে।
জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের বাংলাদেশ প্রতিনিধি এবং জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি কাজুইকি কাতাওকা এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ মত দিয়েছেন। ১২ অক্টোবর বাসসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরা এবং নতুন ও বিদ্যমান জাপানি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। তার মতে, প্রযুক্তি হস্তান্তর, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং উচ্চ মূল্য সংযোজনকারী শিল্প প্রতিষ্ঠায় জাপানি কোম্পানিগুলো ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন কাতাওকা। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে জ্বালানি সরবরাহ, পণ্য পরিবহন, শুল্কসংক্রান্ত প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনের সমস্যা। এসব বিষয়ে কার্যকর সংস্কার এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা জরুরি। সফরে শুধু নতুন বিনিয়োগের আহ্বান জানানো নয়, বাংলাদেশে ইতিমধ্যে কার্যক্রম পরিচালনাকারী জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যার সমাধানেও সুস্পষ্ট বার্তা দেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মত দিয়েছেন। সম্ভাব্য বিনিয়োগের নির্দিষ্ট অঙ্ক বা সফর শেষে কী ধরনের চুক্তি হবে, সে বিষয়ে আগাম সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ঠিক হবে না বলে জানিয়েছেন তিনি।
দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি। ২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে এ চুক্তি সই হয়। জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চুক্তিতে পণ্য বাণিজ্যে শুল্ক হ্রাস বা বিলোপের পাশাপাশি বিনিয়োগ, সেবাবাণিজ্য, ই-কমার্স, মেধাস্বত্ব, শুল্কপ্রক্রিয়া ও বাণিজ্য সহজীকরণের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। চুক্তির সুযোগ কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারলে দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হতে পারে। তবে চুক্তির সুবিধা বাস্তবে কতটা কাজে লাগানো যাবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন, ব্যবসায়িক প্রস্তুতি এবং সংশ্লিষ্ট বিধান কার্যকর হওয়ার ওপর।
বাংলাদেশের তরুণদের জন্য জাপানের শ্রমবাজারও সফরের আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। বছরে এক লাখ দক্ষ কর্মী ও শিক্ষার্থী জাপানে পাঠানোর একটি প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে জাপানি ভাষা শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত সনদের ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। নার্সিং, পরিচর্যা, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল ও উৎপাদনশিল্পের মতো ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত জনশক্তি তৈরি করা গেলে বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে। তবে এ ধরনের উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে জাপানের চাহিদা, দক্ষতার মান, ভাষাগত যোগ্যতা এবং কর্মীদের অধিকার সুরক্ষার ওপর।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামোও প্রস্তাবিত সহযোগিতার অংশ। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ সঞ্চয়, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার আধুনিকায়ন, উপকূলীয় সুরক্ষা এবং জলবায়ু সহনশীল নগর অবকাঠামোতে জাপানি অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা চাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক সম্পদের ব্যবহার এবং পর্যটন খাতেও সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে।
১৯৭১ সালের পর থেকে জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। অবকাঠামো নির্মাণ, বন্দর, পরিবহন, জ্বালানি ও শিল্প খাতে দেশটির দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ফলে এবারের সফর দুই দেশের বিদ্যমান সহযোগিতাকে আরও বিস্তৃত করার একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট, জাপানি বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশের সম্ভাবনার পাশাপাশি বিনিয়োগ পরিবেশের দুর্বলতাগুলোও মোকাবিলা করতে হবে। কাজুইকি কাতাওকার মত অনুযায়ী, বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের সমস্যা সমাধান এবং ব্যবসার পরিবেশে সংস্কার নতুন বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে সহায়তা করবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৬ অক্টোবরের সফরে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের আলোচনার পাশাপাশি এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি হয় কি না, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রত্যাশা, জাপানের সঙ্গে ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব ও উন্নয়ন সহযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন বিনিয়োগ, দক্ষ জনশক্তির কর্মসংস্থান এবং উৎপাদনশিল্পের সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করা।
খবরটি শেয়ার করুন