ফাইল ছবি
দেশে ফেরার ঘোষণা, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, সরকারের সঙ্গে কোনো গোপন সমঝোতা না থাকা এবং গণতন্ত্র ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। ভারত থেকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে হিন্দুস্তান টাইমসকে তিনি বলেছেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত একান্তই তার নিজের। দেশে ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ, সময় ও প্রবেশপথ পরে জানানো হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে তার দেশে ফেরা নিয়ে ভারত বা বাংলাদেশের তারেক রহমান সরকারের সঙ্গে গোপন আলোচনা বা রাজনৈতিক সমঝোতা হয়েছে—এমন ধারণাও সরাসরি নাকচ করেছেন তিনি।
শেখ হাসিনার এই সাক্ষাৎকারে মূলত কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো দেশে ফেরার তার দৃঢ় ঘোষণা। তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোকে ‘বানোয়াট’ দাবি করে তিনি বলছেন, গ্রেপ্তার বা হত্যার আশঙ্কা তাকে দেশে ফেরা থেকে বিরত রাখতে পারবে না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষমতায় ফেরার জন্য নয়, বরং জনগণের পাশে দাঁড়াতেই তিনি দেশে ফিরতে চান। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। দেশের বাইরে থাকা নেতাদের প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি দলীয় পরামর্শ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনা করেই ঠিক করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
শেখ হাসিনার বক্তব্যে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও স্পষ্ট বার্তা রয়েছে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হলেও দলটির জনসমর্থন ও সাংগঠনিক অস্তিত্ব শেষ হয়ে যাবে না। জনগণের কাছে ভোটের মাধ্যমে দলের গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ের সুযোগ দেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ব্যাপক মামলা, নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতন এবং বাড়িঘরে হামলার অভিযোগ তুলে তিনি বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করেছেন। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তার বক্তব্যে আওয়ামী লীগের পক্ষের প্রচলিত বয়ানও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
সাক্ষাৎকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যু। তারেক রহমান সরকারের পক্ষ থেকে তার প্রত্যর্পণের দাবি এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের সঙ্গে বিষয়টি যুক্ত করার যে আলোচনা চলছে, সে বিষয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও মন্তব্য করেছেন তিনি। তবে প্রত্যর্পণ নিয়ে বিএনপি সরকারের ওপর চাপের বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য না করে এ প্রশ্ন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছেই করা উচিত বলে জানিয়েছেন।
দেশের অর্থনীতি, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট, শিল্প ও কর্মসংস্থান নিয়ে নিজের সরকারের সময়ের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করেছেন শেখ হাসিনা। তার দাবি, তার সরকারের সময় অর্থনীতি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে অগ্রগতি হয়েছিল, বর্তমান সময়ে তা পিছিয়ে যাচ্ছে। সার কারখানা বন্ধ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং শিল্পকারখানার চলতি মূলধনের সংকটের কথাও তুলে ধরেছেন তিনি। একই সঙ্গে বর্তমান সরকারের চীন থেকে যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তার বক্তব্য, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যখন কঠিন, তখন বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে যুদ্ধবিমান কেনার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক।
তিস্তা প্রকল্প ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সহযোগিতা নিয়েও সাক্ষাৎকারে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়েছেন শেখ হাসিনা। তার মতে, তার সরকার তিস্তা নদীর উন্নয়ন নিয়ে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা করেছিল। বর্তমান সরকার চীনের সঙ্গে কী ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে, সে বিষয়ে অবশ্য তিনি সরাসরি মন্তব্য করতে চাননি। তবে তার বক্তব্যে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গুরুত্ব এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়টি বারবার সামনে এসেছে।
শেখ হাসিনা সাক্ষাৎকারে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও উগ্রবাদ নিয়ে। তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বাংলাদেশ ‘আরেকটি পাকিস্তান’ হয়ে ওঠার সতর্কবার্তাকে সমর্থন করে শেখ হাসিনা বলেন, এর মাধ্যমে দেশের সাধারণ মানুষকে বোঝানো হয়নি; বরং উগ্রবাদ, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও দুর্বল প্রতিষ্ঠান—এই সমন্বিত ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। দেশে উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের সম্ভাব্য বিস্তার শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, ভারতসহ পুরো অঞ্চলের জন্যও নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
সব মিলিয়ে হিন্দুস্তান টাইমসকে দেওয়া শেখ হাসিনার এই সাক্ষাৎকারকে শুধু দেশে ফেরার ঘোষণা হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্যের বড় একটি অংশ বাদ পড়ে যায় বলে মনে করেন অভিজ্ঞরা। এতে একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, বিএনপি সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক, ভারতের ভূমিকা, প্রত্যর্পণ ইস্যু, চীন-ভারত ভারসাম্য, অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তার অবস্থান উঠে এসেছে। ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তার প্রত্যাবর্তন ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় এবং আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে কীভাবে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করে—সেই প্রশ্নগুলোই এখন সামনে আসছে।
ফলে শেখ হাসিনার এই বক্তব্য দেশের চলমান রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেওয়ার পাশাপাশি ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সাক্ষাৎকারটি নিচে প্রশ্নোত্তর আকারে তুলে ধরা হলো সুখবর ডটকমের পাঠকদের জন্য—
প্রশ্ন: আপনি কি (দেশে) ফেরার টাইমফ্রেম চূড়ান্ত করেছেন? আওয়ামী লীগের যেসব নেতা স্বেচ্ছা নির্বাসনে আছেন, আপনি কি তাদের সঙ্গে নিয়ে ফেরার পরিকল্পনা করছেন? আপনার সংবাদ সম্মেলনে কেন বলেছেন দেশে ফিরলে আপনাকে হত্যা বা গ্রেপ্তার করা হতে পারে?
উত্তর: আমি বলেছি, ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরব। কারণ, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটকে অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত চলতে দেওয়া যায় না। যথাযথ সময়ে আমি এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তারিখ, সময় এবং কোন পয়েন্ট দিয়ে প্রবেশ করব তা জানিয়ে দেব। আমি দেশে ফিরতে চাই। কারণ, বাংলাদেশকে উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার সরকারের সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলারে। মাথাপিছু আয় ৪৮২ ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছিল ২৭৮৪ ডলার। এই অগ্রগতিকে এখন ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগের সময়ে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল শতকরা ৬.৮০ ভাগ। তা থেকে কমে এখন জিডিপি দাঁড়িয়েছে ২.২২ ভাগ। ৫৪ বছরের মধ্যে প্রথমবার শিল্পখাত ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধিতে রেকর্ড করেছে। দারিদ্র্য দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিনিয়োগ কমেছে। নতুন করে কমপক্ষে দুই কোটি মানুষ বেকার হয়েছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট আবার ফিরেছে। এটা শুধু আওয়ামী লীগের ইস্যু নয়। এটি একটি জাতীয় সংকট। যখন উন্নয়ন থেমে যায়, তখন কর্মসংস্থান হারায়। যখন আইন ভেঙে পড়ে, তখন জনগণ নিরাপত্তা হারায়। যখন উগ্রপন্থি নেটওয়ার্ক আবার সুযোগ পায়, তখন বাংলাদেশ আঞ্চলিক উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে।
আওয়ামী লীগের বহু নেতা দেশের বাইরে। অন্য অনেকে বাংলাদেশের ভিতরেই আছেন। কিন্তু তারা আত্মগোপন করে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। কে কখন ফিরবেন তা দলীয় পরামর্শের মাধ্যমে এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি মূল্যায়নের পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আমি চাই না কোনো নেতা, কোনো কর্মী বা সমর্থক অপ্রয়োজনে বিপদের মুখে পড়ুক। আমার বিরুদ্ধে কমপক্ষে ৬০০টি বানোয়াট মামলা হয়েছে। আমার জীবন নিয়ে হুমকি নতুন নয়। ১৯৭৫ সালে আমার পরিবারকে হারিয়েছি। তারপর বাংলাদেশে ফিরে আমি সামরিক শাসন, স্বৈরাচার, ষড়যন্ত্র এবং বারবার হত্যাচেষ্টার মুখোমুখি হয়েছি। আমাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে ঢাকায় আমার পাবলিক র্যালিতে ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট গ্রেনেড ছোড়া হয়েছিল। সেখানে কমপক্ষে ২৪ জন নিহত ও কমপক্ষে ৩০০ মানুষ আহত হন। আমি বেঁচে যাই। কিন্তু আমার সহকর্মীদের অনেকে বাঁচতে পারেননি। তারপরও ওই হামলা আমাকে থামাতে পারেনি। এখন হুমকি আমাকে আমার দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখতে পারবে না। আমার নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন নই। ক্ষমতার জন্য আমি ফিরব না। জনগণের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ফিরব।রাজনৈতিক সংবাদ বিশ্লেষণ
প্রশ্ন: আপনি কি দেশে ফেরা এবং আওয়ামী লীগের পুনরুত্থানের প্রস্তুতি শুরু করেছেন?
উত্তর: বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগ একমাত্র দল, যা সৃষ্টি হয়েছে ১৯৪৭ সালে। সৃষ্টির সময় থেকেই এ দল দেশের জন্য কাজ করেছে। আমার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই দলকে নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছেন। বাংলাদেশের মানুষ এবং উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে আওয়ামী লীগ। মানুষকে গরিব থেকে ব্যবসায়ী ও বেতনভোগী শ্রেণিতে পরিণত করেছে আওয়ামী লীগ। বেতনভুক্ত শ্রেণি, প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো ও প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন করেছে। আমরা স্বল্প উন্নত একটি দেশ থেকে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে উন্নীত করেছিলাম প্রায়। কিন্তু এখন তারা (সরকার) সবকিছু শেষ করে দিয়েছে। আওয়ামী লীগ এমন একটি রাজনৈতিক সংগঠন, যার উত্থান হয়েছে সাধারণ জনগণ থেকে। অসাংবিধানিক বা অবৈধভাবে ক্ষমতালোভী ব্যক্তিরা এর উত্থান ঘটাননি। সামরিক স্বৈরাচার বাংলাদেশে ক্ষমতা গ্রাস করেছিল। তারা সামরিক শাসন জারি করেছে। গঠন করেছে রাজনৈতিক দল। মুহাম্মদ ইউনূসও অসাংবিধানিক সরকার গঠন করেছিলেন এবং একটি দল সৃষ্টি করেছেন। আওয়ামী লীগকে কেন নিষিদ্ধ করা হলো? আওয়ামী লীগ যদি অনেক খারাপ কাজ করে থাকে, তাহলে জনগণকে সিদ্ধান্ত নিতে দিন। আমরা ভালো হই বা খারাপ হই, নির্বাচনে আমরা জনগণের কাছে যাব এবং তারাই সিদ্ধান্ত নেবে। আমরা যদি খারাপ কাজ করে থাকি, জনগণ আমাদের প্রত্যাখ্যান করবে। যারা ক্ষমতা দখল করেছে, তাদের কী অধিকার আছে আমাদের দলকে নিষিদ্ধ করার? তৃণমূল থেকে শুরু করে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতা-কর্মীকে মামলায় জড়িয়ে ফেলা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ছয় লাখ মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ নিয়ে কি কারও কথা বলা উচিত নয়? ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে যারা অগ্নিসংযোগ, হামলা ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল, যারা পুলিশ সদস্য এবং দীপু দাসের মতো মানুষকে হত্যা করেছে- তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে না। বাংলাদেশে সন্ত্রাসী ও উগ্রবাদীদের অবাধে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আওয়ামী লীগ আছে এবং থাকবে। তারা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে বা অন্য যেকোনো পদক্ষেপ নিতে পারে, কিন্তু আওয়ামী লীগের জনসমর্থন ও প্রতিষ্ঠান হিসেবে দলটি টিকে থাকবে। আমি নিয়মিত আমাদের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলি এবং তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখি। যদিও এক কোটি নেতা-কর্মী গৃহহীন হয়ে পড়েছেন এবং দুই কোটি মানুষ নিজেদের পরিবারের সঙ্গেও আর যোগাযোগ করতে পারছেন না। আওয়ামী লীগের সদস্যদের ওপর এত নির্যাতন চালানোর পরও যদি জনগণের মধ্যে কোনো দল জনপ্রিয় থাকে, তাহলে সেটি আওয়ামী লীগ। মানুষ এখনো এই দলের ওপর বিশ্বাস ও আস্থা রাখে।
প্রশ্ন: ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কি আপনি ভারত সরকার বা ঢাকার সরকারের সঙ্গে গোপন আলোচনা বা সমঝোতা করেছেন?
উত্তর: আমার দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত একান্তই আমার নিজের এবং এটি আমার দলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আলোচনার বিষয়। ঢাকার সরকারের সঙ্গে আমার কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা নেই। যারা আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছে এবং আমাদের নেতাদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা করেছে, তারা কোনো গোপন সমঝোতার অংশীদার হতে পারে না।রাজনৈতিক সংবাদ বিশ্লেষণ
প্রশ্ন: কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিরোধী জামায়াতে ইসলামী ও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির চাপের কারণে বিএনপি সরকার আপনার প্রত্যর্পণের জন্য চাপ দিচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
উত্তর: এই প্রশ্নটি আমাকে না করে বিএনপি বা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে করা উচিত। আমি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাই না। আমি শুধু বলতে পারি, জামায়াত ও বিএনপি সবসময় একসঙ্গে ছিল, অতীতেও তারা একসঙ্গে নির্বাচন করেছে। প্রকৃত অর্থে তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। দ্বিতীয়ত, মুহাম্মদ ইউনূসও তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন এবং এই তিনটি গোষ্ঠী মূলত একই। এই গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কী চলছে, তা আমি জানি না। তবে আমরা সবসময় মনে করি, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা উচিত। আমি যখন ক্ষমতায় ছিলাম, তখন আমার পিতা যে পররাষ্ট্রনীতি দিয়ে গিয়েছিলেন, সেটিই অনুসরণ করেছি- সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়।
আমি যখন ক্ষমতায় ছিলাম, তখন বাংলাদেশের সব দেশের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল। আমরা প্রতিটি দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিলাম। আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের অর্থনীতি, দারিদ্র্য বিমোচন, তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আধুনিক বিজ্ঞান, কম্পিউটার ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সুযোগ তৈরি করা, যাতে তারা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।)
আমি জানতাম, বেসরকারি খাতকে গুরুত্ব না দিলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। গ্রামের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা না বাড়লে শিল্পায়নও হবে না। আমাদের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর, তবে আমি শিল্পায়নও করতে চেয়েছিলাম।
প্রশ্ন: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আপনার সর্বশেষ বৈঠকে তিস্তা নদীর উন্নয়নে ভারতের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। এখন আমরা দেখছি, বিএনপি সরকার এই প্রকল্পে চীনের সঙ্গে কাজ করছে, যা ভারতে উদ্বেগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াচ্ছে এবং ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে চীনা জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে আপনার মত কী?
উত্তর: আমি শুধু বলতে পারি, আমি বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াটে নিয়ে গিয়েছিলাম এবং প্রতিটি বাড়িতে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছিলাম। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কিছু নির্দিষ্ট পণ্য কিনতে হয়, কিন্তু বাংলাদেশের কাছে এখন সেগুলো কেনার অর্থ নেই। মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছে না।
আমাদের ছয়টি সার কারখানার মধ্যে পাঁচটি গ্যাসের অভাবে বন্ধ হয়ে আছে। তারা সার সরবরাহ করতে পারছে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। আমাদের সময়ের মতো ব্যাপক সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচিও তাদের নেই। তারা টিকা কেনেনি এবং হাজার হাজার শিশু হামে মারা গেছে।
শিল্পকারখানাগুলোকে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় চলতি মূলধনও তারা দিতে পারছে না। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিমান কেনার পেছনে এত অর্থ ব্যয়ের কারণ কী? আমারও একই প্রশ্ন। তবে এই প্রশ্ন বিএনপি সরকারকেও করা উচিত। তিস্তা প্রকল্পের বিষয়ে আমরা ভারতীয় পক্ষের সঙ্গে এ বিষয়ে ভারতের সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। বর্তমান সরকার কী করছে, সে বিষয়ে আমার কিছু বলার নেই।
প্রশ্ন: আপনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বাংলাদেশকে ‘আরেকটি পাকিস্তানে’ পরিণত হওয়ার বিষয়ে এবং বিভিন্ন উগ্রবাদী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের কারণে নিরাপত্তা হুমকি নিয়ে কথা বলেছেন। এ বিষয়ে আপনি কি বিস্তারিত বলবেন?
উত্তর: জয় যা বলেছে, তা কোনো আবেগপ্রসূত বক্তব্য ছিল না। বাংলাদেশের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে এটি ছিল একটি গুরুতর সতর্কবার্তা। ‘আরেকটি পাকিস্তান’ বলতে কোনো দেশের সাধারণ মানুষকে বোঝানো হয়নি। এর অর্থ হলো উগ্রবাদ, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং দুর্বল হয়ে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বিপজ্জনক সমন্বয়। বাংলাদেশকে সেই দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে এবং এটি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের জন্যই বিপজ্জনক। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে, ভারতীয় উপমহাদেশে আল-কায়েদা বাংলাদেশকে ব্যবহার করে সন্ত্রাসী সেল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে পারে। স্থানীয় তদন্তেও একই ধরনের আশঙ্কার কথা উঠে আসছে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে কেরানীগঞ্জ থেকে সাভার পর্যন্ত একাধিক ঘটনার সঙ্গে একই উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের যোগসূত্রের কথা বলা হয়েছে। এসব ঘটনায় প্রেসার কুকার বোমা, পাইপ বোমা, গ্রেনেড, বিস্ফোরক সামগ্রী, অস্ত্র এবং নব্য-জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ-এর (নিও-জেএমবি) সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কথা উঠে এসেছে। যখন আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তা ও দেশের অভ্যন্তরীণ তদন্ত একই দিকে ইঙ্গিত করে, তখন কোনো দায়িত্বশীল সরকার এই হুমকি অস্বীকার করতে পারে না।রাজনৈতিক সংবাদ বিশ্লেষণ
ধর্মীয় উন্মত্ত জনতার সহিংসতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে মাজার, দরগাহ, ভাস্কর্য, সাংস্কৃতিক স্থাপনা ও ধর্মনিরপেক্ষ প্রতীকগুলো হামলার শিকার হয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশের সন্ত্রাসবিরোধী সক্ষমতাও দুর্বল করা হচ্ছে। কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) এবং অ্যান্টি-টেরোরিজম ইউনিটের মতো বিশেষায়িত ইউনিটগুলো ভেঙে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে। যখন জঙ্গিদের ছেড়ে দেওয়া হয় এবং সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকর্তাদের হয়রানি বা নিপীড়নের শিকার হতে হয়, তখন এর ফল দাঁড়ায় জাতীয় নিরাপত্তায় এক ধরনের শূন্যতা।
উগ্রবাদী নেটওয়ার্কগুলো যদি বাংলাদেশে আবারও নিরাপদ পরিবেশ পেয়ে যায়, তাহলে এর প্রভাব ভারত, মিয়ানমার, বঙ্গোপসাগর, আঞ্চলিক বাণিজ্য, অভিবাসন, সামুদ্রিক যোগাযোগপথ, কূটনৈতিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা পর্যন্ত পৌঁছাবে। তাই জয়ের সতর্কবার্তাটি শুধু রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা উচিত। প্রশ্ন: ভারতে আপনি কীভাবে সময় কাটাচ্ছেন? বাংলাদেশের কোন বিষয়টি আপনার সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে?
উত্তর: যেকোনো রাজনৈতিক নেতার জন্য নিজের জনগণের কাছ থেকে দূরে থাকা সবচেয়ে কঠিন বিষয়। নির্বাসন আমার জীবনে নতুন কিছু নয়, কিন্তু জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা কখনো সহজ হয় না। আমি ভারতে মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে অবস্থান করছি এবং এর জন্য ভারত সরকার ও দেশটির জনগণের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু আমার মন পড়ে আছে বাংলাদেশে। আমি প্রতিদিন বাংলাদেশের পরিস্থিতির খোঁজ রাখি। আমাদের নেতা-কর্মীদের অবস্থা, নিপীড়নের শিকার পরিবারগুলো, অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং তরুণদের হতাশার বিষয়গুলো সম্পর্কে আমি নিয়মিত খোঁজ রাখি। আমার সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে বাংলাদেশের মানুষকে- তাদের মুখ, ভাষা, সরল বিশ্বাস এবং গ্রামবাংলার মাটিকে। আমি সেই বাংলাদেশকে মিস করি, যে বাংলাদেশ ভয় নয়, আশা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল।
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে হাসিনা বলেন, যেভাবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিপীড়ন ও নির্যাতন করা হচ্ছে, তাদের বাড়িঘরে হামলা চালানো হচ্ছে তা শুরু হয়েছিল (অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান) মুহাম্মদ ইউনূসের সময়ে। এমন কোনো দিন নেই, যেদিন মানুষ হত্যা করা হচ্ছে না। রংপুরের ঘটনাই ধরুন। সেখানে একই পরিবারের চারজনকে হত্যা করা হয়েছে। বগুড়া শহরে আমাদের যুব শাখার একজন সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে। প্রতিটি দিন এবং রাতে হত্যাকাণ্ড চলছে। আমাদের লোকজনের বিরুদ্ধে মামলা করছে অথবা গ্রেপ্তার করছে। তারা বাড়িঘরে প্রবেশ করছে। সেখানে নারী পুরুষকে অপমান করছে। প্রহার করছে। প্রবীণদের হয়রান করছে। এই পরিস্থিতিতে আমি বুঝতে পারি না কিভাবে প্রত্যর্পণ একটি শর্ত হতে পারে।
আমি তো আমার নিজের দেশে ফিরব। বুঝতে পারি না কেন তাতে আপত্তি জানানো হচ্ছে। তারা প্রত্যর্পণ চুক্তি নিয়ে কথা বলছে। আমি নিজের ইচ্ছায় আমার দেশে ফিরতে চাই। আমি ফিরব। আমি কি সারাজীবন বিদেশে কাটাতে পারি? দেশে, আমার লোকজনের কাছে আমাকে ফিরতে হবে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয় তখনই, যখন গণতন্ত্র ধ্বংস হয়। উগ্রপন্থিদের উত্থান হয়। সংখ্যালঘুরা অনিরাপদ বোধ করেন। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
খবরটি শেয়ার করুন