ফাইল ছবি
বাংলাদেশ থেকে আগামী ছয় মাসে প্রায় দুই লাখ কর্মী নেওয়ার যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, সেটি আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নয় বলে জানিয়েছে মালয়েশিয়া সরকার। দেশটির যোগাযোগমন্ত্রী ও সরকারের মুখপাত্র ফাহমি ফাদজিল বলেছেন, বাংলাদেশি একজন প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত এই তথ্য মালয়েশিয়া সরকারের কোনো সিদ্ধান্তকে প্রতিফলিত করে না।
আজ বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর পুত্রজায়ায় মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ফাহমি ফাদজিল এ কথা বলেন। মালয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যম মালয়েশিয়াকিনি ও ফ্রি মালয়েশিয়া টুডে-সহ দেশটির বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম তার বক্তব্য প্রকাশ করেছে।
ফাহমি বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি দেশটির মানবসম্পদমন্ত্রী আর রামানানের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে আগামী ছয় মাসে দুই লাখ কর্মী নেওয়ার যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, সেটি মালয়েশিয়া সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকারের একজন ‘জুনিয়র মিনিস্টার’ বা অপেক্ষাকৃত নিম্নপদস্থ মন্ত্রী এই বক্তব্য দিয়েছেন। ফলে সেটিকে বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে না।
মালয়েশিয়ার নিউ স্ট্রেইটস টাইমস-ও জানিয়েছে, বাংলাদেশি একজন মন্ত্রীর দুই লাখ কর্মী নেওয়ার দাবি মালয়েশিয়ার আনুষ্ঠানিক সরকারি সিদ্ধান্ত নয়। সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। একইভাবে মালয় মেইল লিখেছে, আগামী ছয় মাসে দুই লাখ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের বিষয়ে মালয়েশিয়ার কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।
এর আগে ৩০ আগস্ট স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছিলেন, সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া পর্যায়ক্রমে শুরু হবে। ছয় মাসের মধ্যে প্রায় দুই লাখ কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া শেষ হবে বলেও তিনি জানিয়েছিলেন।
সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী আবদুল মঈন খানের সঙ্গে মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার মোহাম্মদ সুহাদা ওসমানের বৈঠকের পর সাংবাদিকদের এসব তথ্য দেন মীর শাহে আলম। তার বক্তব্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ার তালিকাভুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দুই লাখ কর্মী নেওয়া হবে। এর বাইরে আরও ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে কোনো ধরনের অভিবাসন ব্যয় ছাড়াই মালয়েশিয়ায় নেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছিলেন।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেছিলেন, ১০ হাজার কর্মীকে ‘শূন্য ব্যয়ে’ নেওয়ার প্রক্রিয়াও সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে পর্যায়ক্রমে শুরু হবে। অর্থাৎ এসব কর্মীকে নিয়োগের জন্য কোনো অভিবাসন বা নিয়োগসংক্রান্ত ব্যয় বহন করতে হবে না।
মীর শাহে আলমের ওই বক্তব্যের পর বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বড় পরিসরে কর্মী যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। মালয়েশিয়ার ফ্রি মালয়েশিয়া টুডে ১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগামী ছয় মাসে প্রায় দুই লাখ অভিবাসী কর্মী মালয়েশিয়ায় নেওয়া হবে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নিয়োগ পর্যায়ক্রমে সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে শুরু হওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
মালয়েশিয়ার উতুসান মালয়েশিয়া-ও ২ সেপ্টেম্বর সকালে দুই লাখ বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে মীর শাহে আলমের বক্তব্য তুলে ধরা হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, প্রায় দুই লাখ কর্মী ছয় মাসের মধ্যে বিভিন্ন খাতে নেওয়ার কথা রয়েছে এবং তাদের নিয়োগ পর্যায়ক্রমে শুরু হওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে স্পষ্টীকরণ আসে। যোগাযোগমন্ত্রী ফাহমি ফাদজিল বলেন, দুই লাখ কর্মী নেওয়ার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। মালয়েশিয়ার দ্য সান-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির সরকার আগামী ছয় মাসে দুই লাখ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের কোনো অঙ্গীকার করেনি।
এই অবস্থায় বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর বিষয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কারণ, গত কয়েক বছর ধরে দেশটির শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ নিয়ে নানা জটিলতা রয়েছে। মালয়েশিয়া ২০২৪ সাল থেকে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগে বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। শ্রমিক শোষণ, অতিরিক্ত নিয়োগ ব্যয়, প্রতারণা, জোরপূর্বক শ্রম এবং ঋণের ফাঁদে পড়ার মতো অভিযোগের কারণে দেশটির শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোরতা তৈরি হয়।
গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া সফরের সময় দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় খুলে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। দুই দেশের সরকার তখন স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা এবং কর্মীদের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করার বিষয়ে একমত হওয়ার কথা জানায়।
মালয়েশিয়ায় বর্তমানে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী রয়েছেন। ফ্রি মালয়েশিয়া টুডে ১ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বাংলাদেশি প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের সূত্রে বলা হয়, দেশটিতে প্রায় আট লাখ নিবন্ধিত বাংলাদেশি কর্মী রয়েছেন। এর বাইরে অনিবন্ধিত কর্মীও থাকতে পারেন। বাংলাদেশ সরকার মালয়েশিয়ায় থাকা অনিবন্ধিত বাংলাদেশিদের নিবন্ধনের বিষয়টিও তুলেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শ্রমবাজারে অতীতের অভিজ্ঞতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ব্লুমবার্গ-এর চলতি বছরের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে বাংলাদেশের দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে, দুই দেশের শ্রমিক নিয়োগব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগী ও নিয়োগকারী চক্রের প্রভাব, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় এবং ভুয়া চাকরির প্রতিশ্রুতির অভিযোগ রয়েছে। এতে অনেক কর্মী ঋণের বোঝায় পড়েছেন এবং কেউ কেউ মালয়েশিয়ায় গিয়ে প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি।
এমন পরিস্থিতিতে এবার যদি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশিদের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত হয়, তাহলে নিয়োগপ্রক্রিয়া কীভাবে হবে—সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিবাসন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরেই স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা, মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মীদের ব্যয় কমানোর দাবি জানিয়ে আসছেন। জুলাইয়ে মাইগ্র্যান্ট ওয়েলফেয়ার নেটওয়ার্কও বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে বাধ্যতামূলক দ্বিপক্ষীয় শ্রমচুক্তি এবং স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থার দাবি জানিয়েছিল।
ফলে ৩০ আগস্ট প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া দুই লাখ কর্মী পাঠানোর ঘোষণার সঙ্গে বুধবার মালয়েশিয়া সরকারের বক্তব্যের স্পষ্ট পার্থক্য দেখা গেল। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যে পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল, সেটি এখন পর্যন্ত মালয়েশিয়া সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে না। ফলে সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ দুই লাখ কর্মী পাঠানোর যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবে কতটা এগোয়, সেটি এখন দুই দেশের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ও পরবর্তী আলোচনার ওপর নির্ভর করছে।
খবরটি শেয়ার করুন