শনিবার, ২৯শে আগস্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৪ই ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** দেশে বাড়তে পারে দারিদ্র্য, ৬ লাখ চাকরি হারানোর শঙ্কা *** তিন দিনে ৩৭৬ অভিযোগে ৮ কোটি টাকার চাঁদা, পাঁচ দিনে ঘুষের অভিযোগ ৬৬ কোটি—তথ্য সংগ্রহের পর কী হবে? *** মক্কা চুক্তিসহ বাংলাদেশের সব ঘটনার ওপর নিবিড়ভাবে নজর রাখছে ভারত *** ফেসবুক থেকে নিজেদের ‘গুটিয়ে নিচ্ছেন’ সাংবাদিকেরা, ভয়ের এই প্রবণতাকে কীভাবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা *** অনলাইনে মত প্রকাশে ভয়, নিজেদের ‘গুটিয়ে নিচ্ছেন’ সাংবাদিকদের কেউ কেউ: জরিপ *** বন্যায় মৃত নারীর কান থেকে গয়না চুরি, ভিডিও ভাইরালের পর গ্রেপ্তার ২ *** নেপাল-তিব্বতে বন্যায় মৃত্যু বেড়ে ৫৫২ *** নেপালে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৮৯ *** ‘স্যার, কসম করেন’, ধরা পড়ার আগে পুলিশের সঙ্গে মোবারকের কথোপকথন *** বাংলাদেশ যেন মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ না দেয়, সেই বার্তা দিতেই কী ঢাকায় এসেছিলেন পরাগ জৈন

দেশে বাড়তে পারে দারিদ্র্য, ৬ লাখ চাকরি হারানোর শঙ্কা

প্রণব সাহা

🕒 প্রকাশ: ১২:৪১ অপরাহ্ন, ২৯শে আগস্ট ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য আর দূরের কোনো ভূরাজনৈতিক সংকট নয়। জ্বালানি আমদানির বাড়তি খরচ, গ্যাসের সরবরাহে টান, সার উৎপাদনে বিঘ্ন এবং শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মধ্য দিয়ে এর প্রভাব এখন দেশের অর্থনীতির ভেতরে ঢুকে পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে মূল্যস্ফীতি, মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়া এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির দুর্বলতা। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের প্রায় ৬ লাখ চাকরি ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। একই সঙ্গে দারিদ্র্য কমানোর যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তার বড় অংশও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের জুনের মাঝামাঝি সময়ের একটি মূল্যায়নে এসব ঝুঁকির কথা উঠে এসেছে। এটি আলাদা কোনো নিয়মিত অর্থনৈতিক পূর্বাভাস নয়; সরকারের জন্য প্রস্তাবিত ‘কনটিনজেন্ট ইমার্জেন্সি রেসপন্স প্রজেক্ট’ বা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত অর্থ ছাড়ের প্রকল্পের মূল্যায়নের অংশ। ওই মূল্যায়নের প্রেক্ষাপটেই বিশ্বব্যাংক পরে ২৬ জুন বাংলাদেশকে ১১০ কোটি ডলারের জরুরি সহায়তা অনুমোদন করে। এর মধ্যে খাদ্যনিরাপত্তার জন্য ৩০ কোটি ডলার এবং জরুরি ব্যয় মেটাতে ৭১ কোটি ৩০ লাখ ডলারের একটি প্রকল্প রয়েছে।

তবে বিশ্বব্যাংকের সতর্কতার সূত্রপাত আরও আগে। ৮ এপ্রিল প্রকাশিত সংস্থাটির নিয়মিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’-এর শিরোনাম ছিল ‘আর্জেন্ট রিফর্মস নিডেড টু রিস্টোর ম্যাক্রো স্ট্যাবিলিটি, সাসটেইন গ্রোথ অ্যান্ড ক্রিয়েট জবস ইন বাংলাদেশ’—অর্থাৎ বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা ও কর্মসংস্থান তৈরিতে জরুরি সংস্কার প্রয়োজন। ওই প্রতিবেদনে চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ করা হয়। বিশ্বব্যাংক বলেছিল, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘ হলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে, সরকারের ভর্তুকির চাপ বাড়বে এবং আমদানি ব্যয়, রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের ওপর চাপ তৈরি হবে।

সেই এপ্রিলের প্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক ছিল দারিদ্র্য। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২২ সালে বাংলাদেশের জাতীয় দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ তিন বছর ধরে দারিদ্র্য বাড়ছে। ২০২৫ সালেই দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বেড়েছে। মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের মজুরি জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও তার সুফল দরিদ্র মানুষের কাছে আগের মতো পৌঁছায়নি।

২০২৬ সালে পরিস্থিতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর আশা ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ না হলে এ বছর প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারতেন। যুদ্ধের কারণে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় ৫ লাখে। অর্থাৎ প্রায় ১২ লাখ মানুষের দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা আটকে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, মূল্যবৃদ্ধিই এ বছর দারিদ্র্য বৃদ্ধির প্রায় ১০ শতাংশের জন্য দায়ী হতে পারে। আয় ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ বাড়লে এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চাকরির ঝুঁকির সঙ্গে জ্বালানি সংকটের যোগসূত্রটি সরাসরি। দেশের প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের অর্ধেকের বেশি আসে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে। কিন্তু দেশে গ্যাসের উৎপাদন ২০১৬ সালের সর্বোচ্চ উৎপাদনের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ কমে গেছে। অন্যদিকে আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। ফলে ওই অঞ্চলে যুদ্ধ বা সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে বাংলাদেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন সরাসরি ধাক্কা খায়।

এবার সেই ধাক্কা আরও দৃশ্যমান হয়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারে। পেট্রোবাংলার ছয়টি দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস সরবরাহ চুক্তির মধ্যে পাঁচটি ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ যুদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা পরিস্থিতির কারণে সরবরাহকারীরা চুক্তি অনুযায়ী গ্যাস দিতে পারছে না। ফলে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক তাৎক্ষণিক বাজার থেকে বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের জুনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই বাজারে গ্যাসের দাম প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে ২৪ থেকে ২৮ ডলারে উঠেছিল, যা আগের দামের দ্বিগুণেরও বেশি।

দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এর ২৮ জুনের প্রতিবেদনে বলা হয়, কাতার এনার্জি, ওমানের ওকিউ ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল এবং যুক্তরাষ্ট্রের এক্সেলারেট এনার্জি যুদ্ধের পর চুক্তিগুলোতে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করে। এর ফলে পেট্রোবাংলাকে ব্যয়বহুল তাৎক্ষণিক বাজারের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হয়েছে।

এরই মধ্যে কাতার এনার্জি বাংলাদেশকে সতর্ক করেছে, ২০২৬ সালে চুক্তিবদ্ধ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের মাত্র অর্ধেক পর্যন্ত সরবরাহ করতে পারতে পারে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরবরাহ স্বাভাবিক হতে কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে বলে কাতারের ওই প্রতিষ্ঠান ইঙ্গিত দিয়েছে। এরই মধ্যে চলতি অর্থবছরে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ভর্তুকির চাপ প্রায় ১৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মূল বরাদ্দের প্রায় তিন গুণ।

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সও ২৭ জুন জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সার, জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংক ১১০ কোটি ডলারের জরুরি অর্থায়ন অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে ৩০ কোটি ডলার দিয়ে ৬ লাখ টন সার আমদানির অর্থ জোগানো হবে। বাকি ৭১ কোটি ৩০ লাখ ডলার জরুরি ব্যয়, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও ছোট ব্যবসায় সহায়তা এবং স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, পানি ও খাদ্য সরবরাহের মতো অপরিহার্য সেবা সচল রাখতে ব্যবহার করা হবে।

সারের সংকট বাংলাদেশের জন্য আলাদা করে বড় ঝুঁকি। দেশের কৃষিতে প্রতি হেক্টরে গড়ে ৩৯১ দশমিক ৯ কেজি সার ব্যবহার হয়, যা বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণের বেশি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম বা সরবরাহে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে দেশের খাদ্য উৎপাদনেও তার প্রভাব পড়ে। এরই মধ্যে ছয়টি ইউরিয়া সার কারখানার পাঁচটিই গ্যাসের সংকটে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে বলে বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউরিয়ার দামও প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। সংকট দীর্ঘ হলে সারের দাম দ্বিগুণ হওয়ার ঝুঁকির কথাও বলা হয়েছে।

এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়বে কৃষকের আয়েও। বিশ্বব্যাংক বলছে, কৃষির উপকরণ সরবরাহে বিঘ্ন হলে ছোট কৃষকেরা একই সঙ্গে আয় ও খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকিতে পড়বেন। ২৬ জুনের বিশ্বব্যাংকের ঘোষণায় বলা হয়, বাংলাদেশ তার মোট সারের চাহিদার ৮৫ শতাংশের বেশি আমদানি করে। তাই সরবরাহ নিশ্চিত করতে ৬ লাখ টন সার আমদানির অর্থায়ন করা হয়েছে। এই সার আমন ও বোরো মৌসুমে প্রায় ১৪ লাখ হেক্টর জমিতে ধান উৎপাদনে সহায়তা করবে।

জ্বালানির এই বাড়তি ব্যয়ের চাপ শেষ পর্যন্ত সরকারের বাজেটেও পড়ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকি মোট দেশজ উৎপাদনের ২ দশমিক ৮ শতাংশে উঠতে পারে। সব মিলিয়ে ভর্তুকির চাপ ২৫০ কোটি থেকে ৪৮০ কোটি ডলারে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যা ছিল প্রায় ১৫০ কোটি থেকে ২৫০ কোটি ডলার। ফলে সরকারকে বাড়তি অর্থ জোগাতে হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তাসহ অন্য খাতে ব্যয় সংকোচনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

এখানেই ৬ লাখ চাকরি হারানোর আশঙ্কাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু পরিবহন খরচ বাড়ে না; কারখানায় উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ে। গ্যাসের সরবরাহ কমলে উৎপাদনের সময় কমাতে হয়, কখনো কারখানা বন্ধ রাখতে হয়। উৎপাদন কমলে শ্রমিকের কাজের সময় কমে, আয় কমে এবং শেষ পর্যন্ত চাকরিও ঝুঁকিতে পড়ে। বিশ্বব্যাংকের জুনের মূল্যায়নে শিল্পকারখানা, পরিবহন ও কৃষিকে জ্বালানি সংকটের সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানও পরিস্থিতির কিছু লক্ষণ ইতিমধ্যে দেখতে পাচ্ছেন। তার মতে, শিল্পকারখানায় নতুন করে গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না, কোথাও কাজের সময় কমেছে, আবার জ্বালানি সংকটের কারণে কিছু কারখানা বন্ধও হয়েছে। ফলে বিশ্বব্যাংকের চাকরি হারানোর আশঙ্কাকে কেবল ভবিষ্যতের হিসাব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এর কিছু উপাদান ইতিমধ্যেই অর্থনীতিতে দেখা যাচ্ছে।

স্বাস্থ্য খাতও এই সংকটের বাইরে নয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যয় বাড়লে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের পরিচালন ব্যয় বাড়ে। আমদানি করা চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ তৈরির কাঁচামাল ও অন্যান্য চিকিৎসাসামগ্রীর ক্ষেত্রেও পরিবহন ও জাহাজভাড়ার বাড়তি খরচ যোগ হয়। ফলে স্বাস্থ্যসেবা দিতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়।

বিশ্বব্যাংকের জুনের মূল্যায়নে আরও বলা হয়েছে, দেশের প্রায় ২৫০টি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ওষুধ তৈরির কাঁচামালের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভরশীল। হাসপাতালগুলোতে ব্যবহৃত ৯০ শতাংশের বেশি সরঞ্জামও আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় অস্থিরতা দীর্ঘ হলে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বাড়তে পারে।

অন্যদিকে সরকারের আর্থিক অবস্থাও সংকট সামাল দেওয়ার সক্ষমতাকে সীমিত করছে। বিশ্বব্যাংকের এপ্রিলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত সীমিত, ব্যাংক খাতে বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে এবং সরকারের রাজস্ব আহরণও কম। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ। জুনে ব্যাংক খাত শক্তিশালী করতে বিশ্বব্যাংক আরও ৪৫ কোটি ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন করেছে।

অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এমন এক সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আঘাত করছে, যখন দেশের ভেতরেই কয়েকটি বড় দুর্বলতা আগে থেকে ছিল। মূল্যস্ফীতি বেশি, কর্মসংস্থান তৈরির গতি দুর্বল, মানুষের প্রকৃত আয় চাপে, ব্যাংক খাত ঝুঁকিপূর্ণ এবং সরকারের হাতে অতিরিক্ত ব্যয় করার সুযোগ সীমিত। নতুন করে জ্বালানি, খাদ্য ও সারের দাম বাড়লে এসব দুর্বলতা একে অপরকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতিও আশাব্যঞ্জক নয়। রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদি চাপের মধ্যে রয়েছে। আগস্টে বিশ্বের প্রায় ৪৩ শতাংশ তেল উৎপাদন সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত বলে রয়টার্স ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও সারের সরবরাহব্যবস্থায় যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা খাদ্য ও পরিবহন ব্যয়েও প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশের জন্য তাই মূল প্রশ্ন শুধু যুদ্ধ কখন শেষ হবে, তা নয়। প্রশ্ন হলো, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে অর্থনীতির কোন খাত কতটা ধাক্কা সামলাতে পারবে। বিশ্বব্যাংক ২৬ জুন যে ১১০ কোটি ডলারের জরুরি সহায়তা দিয়েছে, তার একটি বড় অংশই এই ধাক্কা সামলানোর জন্য। সংস্থাটি ৬ লাখ টন সার আমদানির অর্থ দিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও ছোট ব্যবসায় সহায়তার ব্যবস্থা করেছে এবং জরুরি জ্বালানি আমদানির অর্থও রেখেছে।

কিন্তু এই অর্থায়ন সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়। বিশ্বব্যাংকের এপ্রিলের মূল্যায়নে যে সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল, তার মধ্যে ছিল রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটানো, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। এসব সংস্কার দ্রুত করা না গেলে বাহ্যিক ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা আরও কমবে।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, জ্বালানি সংকট থেকে শুরু হওয়া চাপ শেষ পর্যন্ত মানুষের আয় ও চাকরিতে গিয়ে ঠেকতে পারে। কারখানায় উৎপাদন কমলে শ্রমিকের আয় কমবে, কৃষিতে সারের সংকট হলে উৎপাদন ব্যাহত হবে, জ্বালানি ব্যয় বাড়লে পরিবহন ও খাদ্যের দাম বাড়বে। আর মূল্যস্ফীতির সঙ্গে আয় তাল মেলাতে না পারলে দরিদ্র পরিবারের ওপর চাপ আরও বাড়বে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কারণেই বিশ্বব্যাংকের ৬ লাখ চাকরি হারানোর আশঙ্কাকে শুধু একটি সংখ্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও অনেক পরিবারের আয়, খাদ্যনিরাপত্তা ও দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিটিও তত বেশি বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

বিশ্বব্যাংক

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250