ফাইল ছবি
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে। গত ১৬ জুলাই দলের ভার্চুয়াল সভায় তার দেওয়া কয়েকটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দলটির ভেতরে প্রশ্ন উঠেছে—তিনি কি নিজে থেকেই দায়িত্ব ছাড়তে চাইছেন, নাকি নেতৃত্বের সিদ্ধান্তে তাকে সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে?
দলীয় একাধিক সূত্রের ভাষ্য, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক পুনর্গঠনের পরিকল্পনায় সাধারণ সম্পাদক পদে পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগ কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি, তবু দলটির ভেতরে এ নিয়ে আলোচনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। বিশেষ করে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরা এবং তার আগে সংগঠন পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগের সঙ্গে এই আলোচনাকে যুক্ত করে দেখছেন অনেক নেতা।
টানা সাড়ে ১৫ বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা হারায় আওয়ামী লীগ। একই দিন দেশ ছাড়েন দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা। পরে সরকারের সিদ্ধান্তে দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয় এবং নিবন্ধনও স্থগিতের মুখে পড়ে। সরকার অভিযোগ তোলে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে গুম, হত্যা, দমন-পীড়ন ও সহিংস কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ আওয়ামী লীগ বরাবরই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে এসেছে।
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার প্রায় দুই বছর পর দলটি এখন কার্যত সাংগঠনিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করছে। কেন্দ্রীয় অনেক নেতা বিদেশে, কেউ আত্মগোপনে, কেউ কারাগারে। মাঠপর্যায়ে দলীয় কর্মসূচি নেই বললেই চলে। তবে অনলাইন সভা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণা এবং বিচ্ছিন্ন ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে সংগঠন সচল রাখার চেষ্টা চলছে।
এই প্রেক্ষাপটে ১৬ জুলাই রাতে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের ভার্চুয়াল সভা বিশেষ গুরুত্ব পায়। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই শেখ হাসিনার গ্রেপ্তার দিবস এবং ২০২৫ সালের গোপালগঞ্জের ঘটনাকে স্মরণ করে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শেখ হাসিনা তার ঘোষিত স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন। তিনি নির্দেশ দেন, তার সঙ্গে মামলা থাকা শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে অন্যান্য নেতাকর্মীরাও দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি নেবেন।
একই সভায় ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যই সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দেয়। তিনি শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে বলেন, “পার্টির কাছ থেকে আমি অনেক পেয়েছি। আমার আর কিছু চাওয়ার নেই। আপনার হাত ধরে তিন তিনবার দলের সাধারণ সম্পাদক হয়েছি। ১৮ বছর মন্ত্রী ছিলাম। একজন স্কুলশিক্ষকের ছেলের রাজনীতিতে এর থেকে বেশি আর কী পেতে পারে।”
এরপর তিনি বলেন, “আপনি জানেন আমি শারীরিকভাবে খুব একটা সক্ষম নই। তারপরও আমার চেষ্টার কোনো ত্রুটি হবে না।” সভার শেষ দিকে তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, “আমি সকলের উদ্দেশ্যে বলছি, আমরা যেন নিজেদের মধ্যে লড়াই না করি। আমরা যেন লড়াই করি আমাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে।”
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলেন, “আমাদের নেত্রীর ঘোষণায় বাংলাদেশের সরকারের খুঁটি নড়ে গেছে। তারা আওয়ামী লীগকে ভয় পায়। আরও বেশি ভয় পায় শেখ হাসিনাকে।”
দলীয় সূত্রের ভাষ্য, কাদেরের বক্তব্যের ভাষা ও উপস্থাপনা অনেক নেতার কাছে বিদায়ী বার্তার মতো মনে হয়েছে। বিশেষ করে ‘আমার আর কিছু চাওয়ার নেই’ এবং শারীরিক অক্ষমতার প্রসঙ্গ টানাকে অনেকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব ছাড়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
দলটির কয়েকজন নেতা মনে করছেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আগেই সাধারণ সম্পাদক পদে পরিবর্তন আনা হলে নতুন নেতৃত্বকে সংগঠন পুনর্গঠনের সময় দেওয়া যাবে। আবার অন্য একটি অংশের মতে, এই পরিবর্তনের মাধ্যমে গণ-অভ্যুত্থানের পর দলীয় ব্যর্থতার দায়ও নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে।
দীর্ঘ সময় ধরে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করলেও ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে দলের ভেতরে নানা সময়ে সমালোচনা ছিল। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনের আগে ও পরে দলকে কার্যকরভাবে সংগঠিত রাখতে না পারা, তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ দুর্বল হয়ে পড়া, দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়া এবং সংকটকালে নেতৃত্বের দৃশ্যমান অভাব—এসব অভিযোগ বিভিন্ন সময় দেশের মূলধারার গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।
আন্দোলনের সময় কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের অসহায় অবস্থার বিষয়েও সংবাদ প্রকাশিত হয়। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে ওবায়দুল কাদের প্রকাশ্যে বলেছেন, কোনো নেতা সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন এবং ভুলত্রুটি থাকলে তা স্বীকার করা উচিত।
দেশ ছাড়ার পর দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, দেশে ফিরে পরিস্থিতি অনুকূল হলে তিনি ভুলত্রুটি চিহ্নিত করবেন, প্রয়োজন হলে জনগণের কাছে ক্ষমাও চাইবেন।
তবে দলীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, আওয়ামী লীগের বর্তমান সংকট শুধু ব্যক্তিনির্ভর নয়; এটি সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক দুই দিক থেকেই গভীর। ফলে সাধারণ সম্পাদক পরিবর্তন হলেও দলকে নতুন বাস্তবতায় মানিয়ে নেওয়া সহজ হবে না।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ রাখছেন। বিদেশে অবস্থান করেও তারা অনলাইনে জেলা, উপজেলা, মহানগর এবং সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছেন। শেখ হাসিনার নির্দেশেই এই সাংগঠনিক যোগাযোগ পরিচালিত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট নেতারা দাবি করছেন।
তবে এই প্রক্রিয়া নিয়েও দলে ভিন্নমত রয়েছে। মাঠপর্যায়ের অনেক নেতাকর্মীর অভিযোগ, যারা দীর্ঘদিন ক্ষমতার কেন্দ্র ছিলেন, তারা এখন বিদেশে বসে নির্দেশনা দিচ্ছেন। অন্যদিকে দেশে থাকা নেতাকর্মীরা মামলা, গ্রেপ্তার ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে সংগঠন ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
গত ১০ জুলাই রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার বা অন্য কোনো ঝুঁকি থাকলেও তিনি দেশে ফিরবেন এবং আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হবেন। সেই ঘোষণার পর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক প্রস্তুতি আরও জোরদার হয়েছে বলে দলীয় সূত্রগুলো দাবি করছে।
এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের ভেতরে ধারণা তৈরি হয়েছে, ডিসেম্বরের আগেই সাধারণ সম্পাদক পদে নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। কারণ বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ আগেই শেষ হয়েছে। স্বাভাবিক নিয়মে কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন কমিটি হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তা সম্ভব হচ্ছে না। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বিশেষ পরিস্থিতিতে সভাপতি নতুন দায়িত্ব অর্পণ করতে পারেন বলেও সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করছেন।
সাধারণ সম্পাদক পদে সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়ে দলীয় অন্দরে নানা নাম আলোচনায় থাকলেও এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলছেন, শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দলীয় সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নেতৃত্ব পরিবর্তন নয়; বরং জনআস্থা পুনর্গঠন, সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস এবং অতীতের বিতর্ক মোকাবিলা করা। সেই প্রক্রিয়ায় সাধারণ সম্পাদক পদে পরিবর্তন হলে তা দলীয় পুনর্গঠনের একটি অংশ হতে পারে। তবে সেটি কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে নতুন নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ওপর।
সব মিলিয়ে, ১৬ জুলাইয়ের ভার্চুয়াল সভায় ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সম্ভাব্য পরিবর্তনের আলোচনা আরও জোরালো করেছে। আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা না এলেও দলীয় অন্দরে এখন যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি ঘুরছে, তা হলো—ওবায়দুল কাদের কি স্বেচ্ছায় দায়িত্ব ছাড়বেন, নাকি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে সাধারণ সম্পাদকের পদে নতুন মুখ দেখা যাবে।
খবরটি শেয়ার করুন