ছবি: সংগৃহীত
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। আগামী ২০ আগস্ট অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থী কে হবেন, তা নির্ধারণে আজ রোববার ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এরই মধ্যে জোটের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ এবং আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের নাম আলোচনায় এসেছে।
১১ দলীয় ঐক্যের তিনটি দলের শীর্ষ নেতা শনিবার (৮ আগস্ট) রাতে সুখবর ডটকমকে বলেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে জোটের শরিক এলডিপির প্রেসিডেন্ট অলি আহমদ ও আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের নাম বিবেচনায় রয়েছে। তবে রোববারের বৈঠকে আলোচনার পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে জানান তারা।
শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সন্ধ্যা সাতটায় শুরু হওয়া ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন দলের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। বৈঠকে দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ নির্বাহী পরিষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে সর্বসম্মতভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ লক্ষ্যে রোববার ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে। সেখানে বিরোধী দলের প্রার্থী দেওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে।
জামায়াতের এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রায় ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোটের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের পর ১৯৯১ সালে সর্বশেষ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট হয়েছিল। এরপরের সাতটি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
তবে এবার সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা নেই। ৩৪৯ সদস্যের সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হতে প্রয়োজন ১৭৫ ভোট। বিএনপির সদস্যসংখ্যা ২৪৭। অন্যদিকে জামায়াত জোটের সদস্যসংখ্যা ৯০। এর বাইরে স্বতন্ত্র ও অন্যান্য দলের সদস্য রয়েছেন।
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত হলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার হিসেবে তার অবস্থান নিয়ে আলাদা আলোচনা রয়েছে। সংরক্ষিত নারী আসনসহ স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যের সংখ্যা আট। ইসলামী আন্দোলন, জাতীয় পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ ও গণসংহতি আন্দোলনের একজন করে সংসদ সদস্য রয়েছেন। ফলে বিএনপির প্রার্থীকে হারিয়ে বিরোধী জোটের প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা নেই। তারপরও জামায়াতের প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ শনিবার রাতে সুখবর ডটকমকে বলেন, নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিরোধী দলের অধিকার। গণতন্ত্রে জয়-পরাজয়ের চেয়েও বড় বিষয় হচ্ছে অধিকার চর্চা। বিরোধী দল কোনো ক্ষেত্রেই সরকারকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছাড় দিতে চায় না। এ কারণেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়া হচ্ছে।
দলের আরেক সহকারী সেক্রেটারি আবদুল হালিমও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। তার ভাষ্য, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বিরোধী দলের যেখানে যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ আছে, জামায়াত সেসব সুযোগ কাজে লাগাবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়টিও এরই মধ্যে দলীয় পর্যায়ে এগিয়েছে। গত ১ আগস্ট বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দলের প্রার্থী মনোনয়নের দায়িত্ব চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর দেওয়া হয়। ফলে সরকার ও বিরোধী—দুই পক্ষের প্রার্থী নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন আলোচনা চলছে।
বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম আলোচনায় রয়েছে। এ ছাড়া নজরুল ইসলাম খান, আবদুল মঈন খান ও খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নামও বিভিন্ন মহলে এসেছে। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকা হাফিজ উদ্দিন আহমদকেও সম্ভাব্য তালিকায় রাখা হচ্ছে। বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং দল ও সরকারে কার ভূমিকা কোথায় বেশি প্রয়োজন—এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকা ছোট হয়ে এসেছে বলে দলীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে।
এর বিপরীতে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে অলি আহমদ ও মাহমুদুর রহমানের নাম সামনে আসায় রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। কর্নেল (অব.) অলি আহমদ দীর্ঘদিনের রাজনীতিক। তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের অন্যতম নেতা ছিলেন এবং পরে দল থেকে বেরিয়ে এলডিপি গঠন করেন। বর্তমানে তিনি দলটির চেয়ারম্যান। ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এলডিপি ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের সঙ্গে ছিল।
রাষ্ট্রপতি পদে অলি আহমদের নাম অবশ্য এবারই প্রথম আলোচনায় আসেনি। ২০২৪ সালের অক্টোবরে এলডিপির কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে দলের মহাসচিব রেদোয়ান আহমদ তাকে রাষ্ট্রপতি করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তখন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে সরিয়ে অলি আহমদকে ওই পদে বসানোর দাবি জানানো হয়েছিল।
অলি আহমদের রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকার কথাও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা হিসেবে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং ‘বীর বিক্রম’ খেতাব পান। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক দলের নেতা হওয়ায় জোটের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে তার নাম বিবেচনায় আসা অস্বাভাবিক নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে মাহমুদুর রহমান এখন সাংবাদিক ও সম্পাদক হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘদিন তিনি দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর পর দেশে ফেরেন তিনি। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, তুরস্ক থেকে একটি ফ্লাইটে ঢাকায় ফেরেন মাহমুদুর রহমান।
পরবর্তী সময়ে তিনি আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশকের দায়িত্ব নেন। ২০২৪ সালের অক্টোবরে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাকে পত্রিকাটির সম্পাদক ও প্রকাশক হওয়ার তথ্য জানানো হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি গ্রেপ্তার হন এবং দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন। পরে বিদেশে অবস্থান করেন। দেশে ফেরার পর আবারও আমার দেশ প্রকাশনার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।
সাম্প্রতিক সময়েও তিনি দুর্নীতি, সন্ত্রাস, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে বক্তব্য দিয়ে আসছেন। গত জুনে চট্টগ্রামে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের সঙ্গে আমার দেশ কোনো আপস করবে না এবং যে কোনো দলের অন্যায়ের বিরুদ্ধে পত্রিকাটি সাংবাদিকতা চালিয়ে যাবে।
অলি আহমদ ও মাহমুদুর রহমান—দুজনের পেশাগত ও রাজনৈতিক পরিচয় এক নয়। একজন দীর্ঘদিনের রাজনীতিক ও রাজনৈতিক দলের প্রধান, অন্যজন সাংবাদিক ও সম্পাদক। রাষ্ট্রপতি পদে তাদের নাম বিবেচনায় আসার বিষয়টি তাই ১১ দলীয় ঐক্যের রাজনৈতিক কৌশল নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে। জোট শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কাউকে সামনে রাখবে, নাকি রাজনীতির বাইরের কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে প্রার্থী করবে—তা রোববারের বৈঠকের পর স্পষ্ট হতে পারে।
রাষ্ট্রপতি পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিন গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হয়। নির্বাচন কমিশন গত বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে। তফসিল অনুযায়ী, ২০ আগস্ট ভোট গ্রহণ হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যরাই ভোট দেন। ফলে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে তাদের প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। তারপরও জামায়াতের প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্তকে শুধু ফলাফলের হিসাব দিয়ে দেখছেন না দলটির নেতারা। তাদের বক্তব্য, বিরোধী দলের জন্য সংসদীয় রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র তৈরি করা এবং সরকারকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কোনো পদ ছেড়ে না দেওয়াই এর মূল উদ্দেশ্য।
১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সঙ্গে এবারের পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও রয়েছে। সে সময় তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ প্রার্থী দিয়েছিল। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যদের সমর্থনে ১৭২ ভোট পেয়ে আবদুর রহমান বিশ্বাস নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট। জাতীয় পার্টির ৩৫ জন সংসদ সদস্য ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন।
সেই নির্বাচনের ৩৫ বছর পর আবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জামায়াত। তবে এবারের নির্বাচন ১৯৯১ সালের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা কম। অলি আহমদ ও মাহমুদুর রহমানের নাম এখন আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত কার নাম জোটের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়, সেটিই রোববারের বৈঠকের পর পরিষ্কার হবে।
খবরটি শেয়ার করুন