ছবি: সংগৃহীত
সৌদি আরবে পাকিস্তানি সেনাদের উপস্থিতির কথা এবার সরাসরি নিশ্চিত করল পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী। তবে ঠিক কতজন সেনা সেখানে রয়েছেন, তাদের কী দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং নতুন করে কতসংখ্যক সেনা পাঠানো হয়েছে—এসব বিষয়ে ইসলামাবাদ এখনো বিস্তারিত কিছু জানায়নি। ফলে ৩০ থেকে ৪০ হাজার পাকিস্তানি সেনা সৌদি আরবে মোতায়েনের যে দাবি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এসেছে, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত নয়।
পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী গতকাল বুধবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, পাকিস্তানি বাহিনী সৌদি আরবে ‘ইতিমধ্যেই’ রয়েছে। তার ভাষ্য, পাকিস্তানি সেনারা কয়েক দশক ধরে সৌদি আরবে বিভিন্ন সক্ষমতা ও ক্ষেত্রে কাজ করছে। তিনি একই সঙ্গে বলেন, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যকার মক্কা প্রতিরক্ষা জোট কোনো হঠাৎ তৈরি হওয়া ব্যবস্থা নয়; তিন দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্কের ওপর এটি গড়ে উঠেছে।
এই বক্তব্যের গুরুত্ব এখানেই যে, ৫ অক্টোবর রিয়াদে অনুষ্ঠিত জরুরি বৈঠকের পর তিন দেশ প্রথমবারের মতো মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। ওই বৈঠকের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্য সম্মত সামরিক বাহিনী ও সক্ষমতাগুলো দ্রুত দেশটিতে মোতায়েনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি সামরিক প্রস্তুতি, বাহিনীগুলোর সমন্বয় এবং সম্মিলিত প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ, নতুন করে যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা শুধু পাকিস্তানি সেনাদের সৌদি আরবে থাকা নয়; বরং পুরোনো সামরিক উপস্থিতিকে এখন একটি আনুষ্ঠানিক ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা। ৭ আগস্ট মক্কায় সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের নেতারা যে চুক্তিতে সই করেন, তাতে বলা হয়—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। চুক্তির লক্ষ্য ছিল সম্মিলিত প্রতিরোধ জোরদার এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানো।
এখন সেই চুক্তির প্রথম বড় পরীক্ষা হচ্ছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি আরবের নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরব ইয়েমেনের হুতিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর অন্যতম লক্ষ্য বাব আল-মান্দাব প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এই জলপথ লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হুতিদের সাম্প্রতিক পাল্টা হামলাও সৌদি আরবের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, সৌদি ভূখণ্ডের শহর, বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হয়েছে। ৮ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে রয়টার্স জানায়, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করেও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব তার মিত্রদের কাছ থেকে প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা চাইছে।
এই প্রেক্ষাপটেই পাকিস্তানি সেনা উপস্থিতির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে এখানে দুটি তথ্যকে আলাদা করে দেখা দরকার। একদিকে, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী নিশ্চিত করেছে যে তাদের সেনারা সৌদি আরবে রয়েছে। অন্যদিকে, ৩০ থেকে ৪০ হাজার সেনা মোতায়েনের দাবি এখনো পাকিস্তান সরকার স্বীকার করেনি।
২ অক্টোবর রয়টার্স এক পাকিস্তানি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছিল, সৌদি আরবের সীমান্ত সুরক্ষা এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে পাকিস্তান ৩০ থেকে ৪০ হাজার সেনা পাঠিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পাকিস্তানি সেনা ও সামরিক পরামর্শকেরা সৌদি বাহিনীর সঙ্গে কাজ করছেন। পাকিস্তান ইয়েমেনের এডেনে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীর জন্য সামরিক সরঞ্জামও পাঠিয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
কিন্তু পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ৬ অক্টোবর ওই সংখ্যাকে ‘অনুমানভিত্তিক’ বলে প্রত্যাখ্যান করে। মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য, মক্কা চুক্তির অধীনে সামরিক ব্যবস্থাপনার প্রকৃত বিবরণ গোপনীয় এবং অজ্ঞাতপরিচয় সূত্রের ভিত্তিতে সেনাসংখ্যা প্রকাশ করা ঠিক নয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পাকিস্তান ৩০ থেকে ৪০ হাজার সেনার সংখ্যা প্রত্যাখ্যান করলেও সৌদি আরবে পাকিস্তানি সেনা থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেনি।
সিএনএনের সঙ্গে আহমেদ শরীফ চৌধুরীর বক্তব্য সেই জায়গাতেই নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তিনি সেনা থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন, কিন্তু সংখ্যাটি জানাননি। তিনি বলেছেন, পাকিস্তানি বাহিনী ‘বিভিন্ন সক্ষমতা ও ক্ষেত্রে’ সৌদি আরবে কয়েক দশক ধরে রয়েছে। ফলে তার বক্তব্য থেকে অন্তত এটুকু স্পষ্ট যে সৌদি আরবে পাকিস্তানের সামরিক উপস্থিতি নতুন কোনো ঘটনা নয়; নতুন হচ্ছে সেই উপস্থিতিকে বর্তমান ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা কাঠামোর সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা।
আল–জাজিরার বিশ্লেষণেও একই প্রশ্ন সামনে এসেছে—পাকিস্তানের ঘোষিত ভূমিকা কতটা প্রতিরক্ষামূলক থাকবে এবং সৌদি আরব যদি ইয়েমেনে সরাসরি সামরিক অভিযান বাড়ায়, তখন ইসলামাবাদ কতটা দূরে থাকতে পারবে।
বিশ্লেষক রিয়াজ খোখর লিখেছেন, মক্কা চুক্তি সক্রিয় হওয়ার অর্থ এই নয় যে পাকিস্তান বা তুরস্ক সরাসরি ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্রে ঢুকে পড়বে। বরং সৌদি ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষা, আকাশ প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা সহায়তা ও সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে ভূমিকা রাখার সুযোগ বেশি।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসও বলেছে, ৫ অক্টোবরের ঘোষণা সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পাকিস্তানি বা তুর্কি সেনা পাঠানোর সমার্থক নয়। দুই দেশের অতীত অবস্থান বিবেচনায় লজিস্টিক, প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা ও প্রতিরক্ষামূলক সহায়তার সম্ভাবনাই বেশি বলে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
তুরস্কের অবস্থানও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ৮ অক্টোবর বলেছেন, আঙ্কারা সৌদি আরবকে প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা দেওয়ার উপায় বিবেচনা করছে। তিনি সরাসরি আক্রমণাত্মক অভিযানে তুরস্কের অংশ নেওয়া বা সেনা পাঠানোর সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। তুরস্কের সম্ভাব্য সহায়তার মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ও কারিগরি সহযোগিতার কথা এসেছে। তবে দেশটির সংসদে চুক্তির অনুমোদন এখনো সম্পন্ন হয়নি।
এখানে মক্কা চুক্তির নেপথ্য কারণও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চুক্তিটি শুধু হুতি হুমকির তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পরিবর্তিত কাঠামোরও প্রতিফলন। সৌদি আরব তার নিরাপত্তা নির্ভরতা বহুমুখী করতে চাইছে, তুরস্ক উপসাগরীয় অঞ্চলে নিজের সামরিক ও কূটনৈতিক ভূমিকা বাড়াচ্ছে এবং পাকিস্তান সৌদি আরবের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে একটি আনুষ্ঠানিক বহুপক্ষীয় কাঠামোর মধ্যে নিয়ে যাচ্ছে।
জার্মান সম্প্রচারমাধ্যম ডয়চে ভেলেও মনে করছে, মক্কা চুক্তির কার্যকর হওয়া ইয়েমেন যুদ্ধকে নতুন মাত্রা দিতে পারে। কারণ সৌদি আরব এখন শুধু নিজের ভূখণ্ড রক্ষার চেষ্টা করছে না; একই সঙ্গে ইয়েমেনে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা কমানোর উদ্যোগও জোরদার করছে। ফলে সৌদি ভূখণ্ডে মিত্রদেশগুলোর প্রতিরক্ষা সহায়তা এবং ইয়েমেনের ভেতরে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর অভিযান—এই দুটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, মক্কা জোটের প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি কোথায় গিয়ে থামবে। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের হাসান আলহাসান ও আসনা ওয়াজিদের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চুক্তির কার্যকারিতা নির্ভর করবে তিন দেশের সামরিক সক্ষমতা কতটা বাস্তবে সমন্বিত করা যায় এবং তারা ভিন্ন ভিন্ন আঞ্চলিক স্বার্থের মধ্যে কতটা সমন্বয় করতে পারে তার ওপর। অর্থাৎ কাগজে সম্মিলিত প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি থাকলেই একটি কার্যকর সামরিক জোট তৈরি হয় না; যৌথ কমান্ড, গোয়েন্দা বিনিময়, অস্ত্রব্যবস্থার সমন্বয় ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও প্রয়োজন।
এই জায়গায় পাকিস্তানের জন্যও ঝুঁকি আছে। ২০১৫ সালে ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটে পাকিস্তানের সরাসরি অংশগ্রহণের প্রশ্নে দেশটির পার্লামেন্ট বিদেশে যুদ্ধরত কোনো পক্ষের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না হওয়ার অবস্থান নিয়েছিল। এবার মক্কা চুক্তি সেই পুরোনো বিতর্ককে নতুন করে সামনে আনছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও পাকিস্তানের সামরিক ভূমিকা, বেসামরিক তদারকি এবং চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ না করার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
তবে এখন পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রকাশ্য অবস্থান থেকে একটি সীমারেখা স্পষ্ট। দেশটি সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তায় সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, কিন্তু ইয়েমেনের ভেতরে সরাসরি যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি। ফলে সৌদি আরবে পাকিস্তানি সেনাদের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার অর্থ এই নয় যে পাকিস্তান হুতিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনের মাটিতে সরাসরি যুদ্ধে নেমে গেছে।
বরং বর্তমান পরিস্থিতিকে দেখা যায় একটি ধাপে ধাপে এগোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে। কয়েক দশকের পাকিস্তানি সামরিক উপস্থিতি এখন মক্কা চুক্তির আওতায় নতুন রাজনৈতিক ও কৌশলগত অর্থ পাচ্ছে। সৌদি আরব তার ভূখণ্ডের আকাশ, সীমান্ত ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষায় মিত্রদের সক্ষমতা ব্যবহার করতে চাইছে। পাকিস্তান ও তুরস্ক নিজেদের সামরিক সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে। আর হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা সেই ব্যবস্থাকে দ্রুত বাস্তব পরীক্ষার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সুতরাং নেপথ্যের বিষয়টি শুধু ‘সৌদি আরবে পাকিস্তানি সেনা পাঠানো’ নয়। এর চেয়ে বড় পরিবর্তন হলো—সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক নিজেদের নিরাপত্তাকে একটি অভিন্ন কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছে এবং সেই কাঠামো প্রথমবারের মতো বাস্তব সংকটে সক্রিয় হয়েছে। এই জোট ইয়েমেনের যুদ্ধে সরাসরি কতটা প্রবেশ করবে, নাকি মূলত সৌদি ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে—মধ্যপ্রাচ্যের আগামী দিনের সামরিক সমীকরণে সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
খবরটি শেয়ার করুন