রবিবার, ২০শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৫ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** দ্বিতীয় জানাজা শেষে গন্ধমতিতে চিরনিদ্রায় অপ্রতিম, দুপুরে পুলিশের সংবাদ সম্মেলন *** ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছেছে বাংলাদেশ দল *** মমতার আমলে পশ্চিমবঙ্গকে বাংলাদেশে পরিণত করার চেষ্টা হয়েছিল: ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী *** উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক পরীক্ষার কারণে ১,৩৯৯টি ভূমিকম্প হয়ে থাকতে পারে: গবেষণা *** হুতিদের মোকাবিলায় এবার সৌদির পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা তুরস্কের! যুদ্ধ করবে কি? *** কমলাপুর রেলস্টেশনে পরপর দুটি ককটেল বিস্ফোরণ *** তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর আগামী নভেম্বরে করা যায় কি না, আলোচনায় ঢাকা-দিল্লি *** জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান *** মন্ত্রী বড়, নাকি সংসদ সদস্য—কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রশ্ন প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের *** আওয়ামী লীগ-জামায়াত এক হয়েও বিএনপির কিছুই করতে পারেনি: এমপি চাঁদ

সুখবর এক্সপ্লেইনার

৮ মাসের ভাড়া না দিয়ে হোটেল থেকে পালালেন এনসিপির নেতারা

শুভ্র বড়ুয়া

🕒 প্রকাশ: ১০:২৩ পূর্বাহ্ন, ১লা জুলাই ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় রাজনীতিতে নতুন ধারার প্রতিশ্রুতি নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটি নিজেদের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাহক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। বিশেষ করে তরুণ নেতৃত্ব, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দলটির অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক পুঁজি ছিল।

কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর গত প্রায় দুই বছরে বিভিন্ন সময় দলটির একাধিক নেতা ও কর্মীকে ঘিরে নানা লুটপাট, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও ধর্ষণের অভিযোগ সামনে এসেছে। রাজনৈতিকভাবে এসব অভিযোগ এনসিপির ভাবমূর্তির ওপর চাপ তৈরি করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় আজ বুধবার দেশের প্রথমসারির জাতীয় দৈনিক কালবেলায় প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে রাজধানীর একটি আবাসিক হোটেলের প্রায় আট মাসের বকেয়া ভাড়া পরিশোধ না করা, হোটেলে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ এবং দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে হোটেল কর্তৃপক্ষকে চাপে রাখার অভিযোগ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠান লিখিতভাবে বিষয়টি এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে উত্থাপন করেছে এবং দলও জানিয়েছে, তাদের শৃঙ্খলা কমিটি বিষয়টি তদন্ত করছে। কালবেলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ এলাকায় অবস্থিত ইয়ামেনী ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড নামের একটি আবাসিক হোটেলের দুটি কক্ষ প্রায় আট মাস ব্যবহার করেন এনসিপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের কয়েক নেতা। হোটেল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৫ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৭২৫ ও ৭২৭ নম্বর কক্ষ দুটি ব্যবহার করা হয়। প্রতিটি কক্ষের দৈনিক ভাড়া ছিল তিন হাজার টাকা।

সে হিসাবে মোট বকেয়া ভাড়া দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৯৩ হাজার ২০০ টাকা। বুকিংয়ের সময় মাত্র ১০ হাজার টাকা অগ্রিম দেওয়া হলেও পরে আর কোনো অর্থ পরিশোধ করা হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। হোটেল কর্তৃপক্ষের অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তারা হলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ এনসিপির সদস্য সচিব এস এম শাহরিয়ার, সাদেক মির্জা, মিরাসাত হোসেন হিমেল, শাখাওয়াত হোসেন ও তাওসীপ। 

অভিযোগে বলা হয়েছে, এই পাঁচজনের নেতৃত্বে আরও কয়েক ডজন নেতা ওই কক্ষগুলো নিয়মিত ব্যবহার করতেন। শুধু অবস্থানই নয়, সেখানে নারীদের অবাধ যাতায়াত, গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা এবং বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। এসব ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজও হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।

হোটেলটির মহাব্যবস্থাপক খন্দকার রুহুল আমিনের স্বাক্ষরিত অভিযোগপত্র এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আওয়ামী লীগ কার্যালয় সংস্কারের কাজের কথা বলে এনসিপির কয়েক সমন্বয়ক প্রথমে হোটেলে ওঠেন। পরে দীর্ঘ সময় ধরে তারা কক্ষ দুটি ব্যবহার করেন। দলীয় পরিচয়ের কারণে সরল বিশ্বাসে তাদের থাকার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছে হোটেল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু নির্ধারিত সময় শেষে তারা বকেয়া পরিশোধ না করেই চলে যান।

হোটেলের হিসাব বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ কাজল কালবেলাকে বলেন, বুকিংয়ের সময় ১০ হাজার টাকা দেওয়া হলেও এরপর আর কোনো ভাড়া দেওয়া হয়নি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, হোটেলে অবস্থানকারীদের মধ্যে কেউ শনিরআখড়ার বাসিন্দা ছিলেন, কেউ জুরাইনের, আবার কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তিনি অভিযোগ করেন, সেখানে প্রায়ই নারীরা আসতেন এবং হোটেল কর্তৃপক্ষ আপত্তি জানালে তারা বলেন, “আপনাদের কাজ আপনারা করেন, আমাদের কাজ আমাদের করতে দেন।”

মোহাম্মদ কাজল আরও দাবি করেন, বকেয়া ভাড়া আদায়ের জন্য একাধিকবার বৈঠক করা হলেও প্রতিবারই টাকা দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কোনো সময়সীমা জানানো হয়নি। পরে একসময় দেখা যায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হোটেল ছেড়ে চলে গেছেন। এরপর হোটেল কর্তৃপক্ষ তালা ভেঙে কক্ষ পরিষ্কার করে নতুন করে ভাড়া দেওয়া শুরু করে। বকেয়া আদায়ের উদ্দেশ্যে তারা এনসিপির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন।

অন্যদিকে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, বিষয়টি নিয়ে যেহেতু লিখিত অভিযোগ এসেছে, তাই দলের শৃঙ্খলা কমিটি এটি তদন্ত করছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একটি নতুন রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে বড় সম্পদ সাধারণত জনবিশ্বাস। যখন কোনো দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তখন অভিযোগ সত্য না মিথ্যা—তা নির্ধারণের পাশাপাশি দল কীভাবে অভিযোগের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্ব পায়। আর এনসিপির ক্ষেত্রে এটি প্রথম বিতর্ক নয়। গত প্রায় দুই বছরে দলটির বিভিন্ন নেতা ও কর্মীকে ঘিরে নানা ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে।

কোথাও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ, কোথাও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ, কোথাও ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে প্রশ্ন, আবার কোথাও অতীত রাজনৈতিক পরিচয় গোপন করার অভিযোগ উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগকারীরা বিভিন্ন নথি বা বক্তব্য সামনে এনেছেন। আবার সংশ্লিষ্ট নেতারা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অথবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।

যে দলটি নিজেদের পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাদের জন্য ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক আচরণের মানদণ্ড আরও কঠোরভাবে বিচার করা হয়। সাধারণ মানুষও নতুন দলের কাছে তুলনামূলক বেশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রত্যাশা করেন। ফলে যেকোনো অভিযোগ, তা সত্য হোক বা মিথ্যা, দ্রুত তদন্ত করে অবস্থান পরিষ্কার করা নতুন রাজনৈতিক দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

হোটেল ভাড়া সংক্রান্ত অভিযোগে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। সেটি হলো দলীয় পরিচয়ের ব্যবহার। হোটেল কর্তৃপক্ষের দাবি, এনসিপির পরিচয় ও আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা বিবেচনা করেই তারা দীর্ঘ সময় ভাড়া বাকি রেখেও অবস্থানের সুযোগ দিয়েছিলেন। অভিযোগে নারীদের অবাধ যাতায়াত ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের যে দাবি করা হয়েছে, সেটিও অত্যন্ত স্পর্শকাতর। হোটেল কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের কাছে সিসিটিভি ফুটেজ রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের রাজনীতিতে নতুন বা পুরোনো—সব দলের জন্যই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বিশ্বাসযোগ্যতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একটি অভিযোগ খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পরে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলেও প্রাথমিক ক্ষতি অনেক সময় পূরণ করা কঠিন হয়ে যায়। অন্যদিকে অভিযোগ সত্য হলে দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়ার মূল্যও রাজনৈতিকভাবে দিতে হয়।

এনসিপি যদি নিজেদের ঘোষিত আদর্শ—স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির—প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকে, তাহলে এই অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ এবং দায়ী ব্যক্তি শনাক্ত হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি পরীক্ষা হতে পারে। একইভাবে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ হলে অভিযুক্তদের নামও আনুষ্ঠানিকভাবে দায়মুক্ত করা প্রয়োজন হবে। কারণ অভিযোগ যেমন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত, তেমনি অভিযোগের নিষ্পত্তিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250