ফাইল ছবি
ব্রিটিশ সাংবাদিক ও কলামিস্ট ডেভিড বার্গম্যান মনে করেন, শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং অপ্রত্যাশিত পরিণতিগুলোর একটি হলো ১৮ মাসে (ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের আমলে) জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন দ্রুত বেড়ে যাওয়া। ... ঐতিহাসিকভাবে জামায়াত কখনোই বড় গণনির্বাচনী শক্তি ছিল না। জেনারেল এইচ এম এরশাদের পতনের পর অনুষ্ঠিত একাধিক নির্বাচনে তাদের ভোটের হার কখনোই ১২ শতাংশ ছাড়ায়নি। সর্বোচ্চ অবস্থান ছিল ১৯৯১ সালের নির্বাচনে।
তার মতে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সমর্থনকারী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের অভিযোগে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই জামায়াত কলঙ্কিত ছিল। এই প্রেক্ষাপটে জামায়াতের বর্তমান গতি সত্যিই বিস্ময়কর। তাই দলটিকে সমর্থন করা উচিত—এমন ইঙ্গিত না দিয়ে, কিংবা তাদের যৌক্তিক সমালোচনা এড়িয়ে না গিয়েও প্রশ্ন ওঠে—তাদের দ্রুত উত্থানকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়?
দেশের রাজনীতিতে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার প্রশ্ন নতুন নয়; বরং এটি একাধিকবার ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ফিরে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত এবং সেই সিদ্ধান্তকে আইনি ভিত্তি দেওয়ার উদ্যোগ নতুন করে বিতর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে—ঐতিহাসিক অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও জামায়াতে ইসলামীর বিষয়ে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের অবস্থান কী।
২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কয়েক মাস পর, ২০২৫ সালের ১২ মে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে একটি গেজেট প্রকাশ করা হয়।
এই নিষেধাজ্ঞার মূল যুক্তি ছিল ‘জুলাই হত্যাযজ্ঞের’ বিচার না হওয়া পর্যন্ত দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত রাখা। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে সংশোধন এনে দলটির নেতা-কর্মীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে। ফলে আওয়ামী লীগ কার্যত জাতীয় নির্বাচনের বাইরে চলে যায়। দলটিকে ছাড়াই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
এরপর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় এসে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলো সংসদে বিল আকারে পাস করতে শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৮ এপ্রিল সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল পাস করা হয়, যা আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাকে আরও দৃঢ় আইনি ভিত্তি দেয়।
সরকারের পক্ষ থেকে এই বিলকে একটি ‘গণহত্যাকারী সন্ত্রাসী সংগঠন’ নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। তবে এই ভাষ্য ও সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
এদিকে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কিত। পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী হিসেবে দলটির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। স্বাধীনতার পর দলটি নিষিদ্ধ হয়েছিল, কিন্তু পরে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় আবার ফিরে আসে।
২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগ সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্রসংগঠনকে কৌশলগত কারণে, বিশেষ করে জুলাই-আগস্টের আন্দোলনকে দমাতে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তবে সেই নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আদালতের মাধ্যমে তা প্রত্যাহার করা হয় এবং জামায়াত আবার রাজনৈতিক কার্যক্রমে সক্রিয় হয়।
এখানেই বর্তমান বিতর্কের মূল প্রশ্নটি সামনে আসে—যদি ‘গণহত্যা’ বা ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের’ অভিযোগের ভিত্তিতে একটি দলকে নিষিদ্ধ করা হয়, তাহলে একই ধরনের ঐতিহাসিক অভিযোগ থাকা অন্য দলের ক্ষেত্রে কেন ভিন্ন অবস্থান? বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতের বিরুদ্ধে নতুন করে কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি। বরং বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, দলটি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় এবং তাদের ওপর আরোপিত আগের নিষেধাজ্ঞাও কার্যকর নেই।
সরকার আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধন এনে নিষেধাজ্ঞাকে স্থায়ী রূপ দিয়েছে। কিন্তু একই আইনের প্রয়োগ জামায়াতের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে না, যা ‘আইনের সমান প্রয়োগ’ প্রশ্নে বিতর্ক তৈরি করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে ‘দ্বৈত মানদণ্ডের’ উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
অনেকের মতে, যদি কোনো দলকে ‘গণহত্যা’ বা গুরুতর অপরাধের দায়ে নিষিদ্ধ করা হয়, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত হতে হবে সর্বজনীন ও নিরপেক্ষ। নির্দিষ্ট একটি দলকে লক্ষ্য করে আইন প্রয়োগ করলে তা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগকে জোরালো করে।
সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে নির্দিষ্ট অভিযোগ ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে। বিশেষ করে সহিংসতা, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড কিংবা সাংবিধানিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগকে সামনে এনে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু একই ধরনের অতীত বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও জামায়াতে ইসলামীকে কেন একইভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে না—সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, এখানে কৌশলগত রাজনৈতিক হিসাব কাজ করছে। বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতের সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষ রাজনৈতিক সমঝোতায় থেকেছে। নির্বাচনী রাজনীতি, আন্দোলন কিংবা সরকারবিরোধী কর্মসূচিতে এই দুই দলের মধ্যে সহযোগিতার নজির রয়েছে। জামায়াত এখন জাতীয় সংসদে বিরোধী দল। ফলে সরকারি দল বিএনপি জামায়াতকে নিষিদ্ধ করলে গণতান্ত্রিক ভিত্তি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিতে পারে।
অবশ্য চব্বিশের হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার সুপারিশেও রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ না করার কথা বলা হয়েছে। তাদের মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত করা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, তেমনি জামায়াতের ক্ষেত্রে ভিন্ন অবস্থানও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন