ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর আকস্মিক নয়াদিল্লি সফরকে ঘিরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন সমীকরণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। গতকাল সোমবার রাতে, ৫ অক্টোবর, তিনি ঢাকার উদ্দেশে দিল্লি রওনা হন। কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে বাংলাদেশের কয়েকটি গণমাধ্যম জানিয়েছে, আজ মঙ্গলবার দুপুরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তার সাক্ষাতের কথা ছিল। তবে বৈঠকের বিষয়বস্তু নিয়ে ভারতীয় সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর। একই সঙ্গে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে তার ও আওয়ামী লীগের নেতাদের রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়েও ঢাকার অবস্থান দিল্লিকে জানানো হতে পারে বলে কূটনৈতিক সূত্রের দাবি। তবে ত্রিবেদী ঠিক কোন বার্তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে গেছেন, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।
ঘটনার সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক সপ্তাহে ঢাকা ও দিল্লি দুই পক্ষই তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে। ১৯ সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে ভারতের ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ জানায়, নভেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরের সম্ভাব্য সময় খুঁজছে দুই দেশ। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকায় ও দিল্লিতে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ত্রিবেদী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন এবং নরেন্দ্র মোদির সময়সূচির সঙ্গে মিলিয়ে সম্ভাব্য তারিখ খোঁজা হচ্ছে।
এর আগে আগস্টে তারেক রহমানের ভারত সফরের একটি সম্ভাব্য পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ৫ আগস্ট দিল্লি থেকে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারিত হওয়ার পর ঢাকার সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্কে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি হয়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই ঘটনার পর বাংলাদেশ স্পষ্ট করে যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের জন্য একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি করা প্রয়োজন। ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ বলেছে, শেখ হাসিনার উপস্থিতি এবং তার প্রকাশ্য বক্তব্যই সফরের সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় প্রশ্ন হয়ে আছে।
২৯ সেপ্টেম্বর ত্রিবেদী নিজেও তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে তাড়াহুড়ো না করার কথা বলেছিলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী হুমায়ূন কবিরের সঙ্গে সাক্ষাতের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ভারতের আমন্ত্রণ খোলা আছে এবং উপযুক্ত সময় হলে সফর হবে। তিনি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে ইতিবাচক বলেও উল্লেখ করেন।
এর পরদিন, ৩০ সেপ্টেম্বর, ত্রিবেদী আরও স্পষ্টভাবে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠক হবে—এ বিষয়ে তিনি ‘১২০ শতাংশ’ নিশ্চিত। তবে সফরের মাস বা তারিখ তখনও নির্ধারিত হয়নি।
সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে ভারতের ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’ জানায়, নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হচ্ছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ। নতুন বাংলাদেশি হাইকমিশনার আসাদ আলম সিয়ামের দিল্লিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর আলোচনায় আরও গতি আসতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
‘ইকোনমিক টাইমস’ও ২৯ সেপ্টেম্বর জানায়, তারেক রহমানের ভারত সফরের কোনো তারিখ তখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে নভেম্বর-ডিসেম্বরে সফর হতে পারে—এমন আলোচনা চলছিল। অর্থাৎ নভেম্বরের সম্ভাবনা থাকলেও সেটি এখনো আনুষ্ঠানিক সূচি নয়।
ঢাকার বক্তব্য অবশ্য আরও স্পষ্ট হয়েছে গত দুই দিনে। ৫ অক্টোবর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে শুধু আইনগত প্রক্রিয়া নয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছাও প্রয়োজন। তার ভাষ্য, বাংলাদেশ আশা করে ভারত প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াকে দ্রুত এগিয়ে নেবে। তিনি আরও বলেন, দুই দেশের বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তির কাঠামোর মধ্যেই বিষয়টি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
৬ অক্টোবর প্রকাশিত ‘দ্য হিন্দু’র প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে বাংলাদেশের ‘বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম’ জানায়, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ূন কবির শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের ভারতে অবস্থানকে তারেক রহমানের ভারত সফরের ‘প্রধান চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, দিল্লি থেকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা ঢাকার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ভারত যদি এ বিষয়ে সংযত ভূমিকা নেয়, তাহলে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা থাকবে না।
এখানেই ত্রিবেদীর দিল্লি সফরের তাৎপর্য। একদিকে তিনি ঢাকায় বসে ভারতীয় সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করছেন, অন্যদিকে ঢাকার বক্তব্যও দিল্লিতে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তার রয়েছে। ফলে তাকে এখন শুধু নিয়মিত কূটনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে নয়, দুই সরকারের মধ্যে রাজনৈতিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
ভারতের ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এ ৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বিশ্লেষণে অর্থনীতিবিদ ও নীতি গবেষক সৈয়দ মুনির খসরু লিখেছিলেন, ত্রিবেদীর কূটনৈতিক তৎপরতা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গতি তৈরি করতে পারে; কিন্তু সম্পর্কের বড় সিদ্ধান্তগুলো শেষ পর্যন্ত দিল্লির নীতিনির্ধারণের ওপর নির্ভর করবে। তার বিশ্লেষণে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য ও যোগাযোগকে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
অন্যদিকে সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক মেরামত করা সম্ভব হলেও এ জন্য দুই পক্ষেরই উদ্যোগ প্রয়োজন। তার মতে, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে জনগণ, ব্যবসা ও শিক্ষা—বিভিন্ন পর্যায়ে স্বাভাবিক যোগাযোগ বজায় রাখবে; তবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের প্রশ্নটি জটিল এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত।
শেখ হাসিনা ইস্যুতে ত্রিবেদীর সাম্প্রতিক বক্তব্যও এই সফরের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। ৩ অক্টোবর ঢাকায় ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’-এর এক আলোচনায় তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনাকে ভারতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া ছাড়া ভারতের সামনে তখন খুব বেশি বিকল্প ছিল না। একই সঙ্গে তিনি জানান, তার প্রত্যর্পণের বিষয়ে আইনগত প্রক্রিয়া চলছে এবং আদালত জড়িত থাকায় নির্দিষ্ট সময়সীমা বলা সম্ভব নয়।
এর পরদিনই ঢাকার পক্ষ থেকে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দ্রুত করার দাবি ওঠে। অর্থাৎ ত্রিবেদীর বক্তব্য এবং ঢাকার পাল্টা প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের প্রধান অমীমাংসিত প্রশ্নটি আবার সামনে এসেছে।
তারেক রহমানের ভারত সফর তাই এখন শুধু একটি রাষ্ট্রীয় সফরের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, তার রাজনৈতিক বক্তব্য, প্রত্যর্পণ অনুরোধ, দুই দেশের পারস্পরিক নিরাপত্তা-উদ্বেগ এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কের কাঠামো। ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর ১৯ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই পক্ষই সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চায়, কিন্তু শেখ হাসিনাকে ঘিরে অবস্থানের পার্থক্য কাটিয়ে ওঠার জন্য একটি মধ্যপন্থা খোঁজা হচ্ছে।
ঢাকার সাম্প্রতিক অবস্থান থেকেও বোঝা যাচ্ছে, ভারত সফর বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ৬ অক্টোবর হুমায়ূন কবির বলেন, তারেক রহমান কখনো ভারত সফর না করার কথা বলেননি। তিনি জানান, সফরটি হবে দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর মধ্যে এবং সুবিধাজনক সময়ে। একই সঙ্গে তিনি ত্রিবেদীর ভূমিকার প্রশংসা করে বলেন, ঢাকায় বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তার মূল্যায়নকে নয়াদিল্লি গুরুত্ব দেবে—এটাই বাংলাদেশের প্রত্যাশা।
তাই ৫ অক্টোবর রাতে ত্রিবেদীর আকস্মিক দিল্লি যাত্রাকে বিচ্ছিন্ন কূটনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ কম। সফরের সময়, তারেক রহমানের সম্ভাব্য নভেম্বর সফর নিয়ে চলমান আলোচনা এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে ঢাকার সাম্প্রতিক কঠোর অবস্থান—সবকিছু মিলিয়ে ধারণা করা যায়, দিল্লিতে তার আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য ঢাকার প্রত্যাশা ও শর্তগুলো।
তবে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো—ত্রিবেদী ঠিক কী বার্তা নিয়ে নরেন্দ্র মোদির কাছে গেছেন, তার আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দিল্লি বা ঢাকা কোনো পক্ষই দেয়নি। ফলে তারেক রহমানের ভারত সফরের তারিখ চূড়ান্ত হয়েছে কিংবা শেখ হাসিনা ইস্যুতে কোনো সমঝোতা হয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সময় এখনো আসেনি। বরং ত্রিবেদীর দিল্লি সফরকে দুই দেশের মধ্যে চলমান আলোচনায় নতুন একটি রাজনৈতিক যোগাযোগের পর্ব হিসেবে দেখাই তথ্যের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আগামী নভেম্বরের সম্ভাব্য সফর শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নির্ভর করছে দুই পক্ষের আলোচনায় কতটা সমন্বয় তৈরি হয় তার ওপর। বিশেষ করে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে তার রাজনৈতিক তৎপরতা এবং ঢাকার চাওয়া ‘অনুকূল পরিবেশ’ নিয়ে দিল্লির অবস্থান কতটা স্পষ্ট হয়, সেটিই এখন নজরের কেন্দ্রে।
খবরটি শেয়ার করুন