রবিবার, ৬ই সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২২শে ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনগণকে সম্পৃক্ত করে পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদারের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর *** ইইউর ৬১ বাণিজ্য বাধার ৪৮টিরই সমাধান করা হয়েছে: বাণিজ্যমন্ত্রী *** সাংস্কৃতিক ঐক্যই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শক্তি: সংস্কৃতিমন্ত্রী *** নিখোঁজ শিশুদের জন্য পুলিশের বিশেষ সেল গঠনের দাবি স্বজনদের *** রোহিঙ্গা ইস্যু যেন অন্য কোনো সংকটে চাপা না পড়ে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী *** রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথমবার জন্মভূমি ঠাকুরগাঁওয়ে মির্জা ফখরুল, বিকেলে নাগরিক সংবর্ধনা *** শেষকৃত্য সম্পন্ন করার ১৫ দিন পর কারাগার থেকে ফোনকল—‘আপনার ছেলে জীবিত’ *** ফের সোনার দামে পতন, ভরিতে কত *** মিসরে মাদক মামলায় টিভি উপস্থাপকসহ ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড *** গোপালগঞ্জে বাস খাদে পড়ে নিহত ৩, আহত ৩০

‘শেখ হাসিনার আচরণে মনে হয়নি তিনি রাজনীতিতে ফিরে আসতে ইচ্ছুক’

আদিত্য কবির

🕒 প্রকাশ: ০৭:১০ অপরাহ্ন, ১০ই এপ্রিল ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

দেশের রাজনীতিতে দল নিষিদ্ধ হওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার অংশ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার ঘটনাকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা নতুন করে রাষ্ট্র, গণতন্ত্র ও ভোটারের অধিকার—এই মৌলিক প্রশ্নগুলো সামনে নিয়ে এসেছে।

বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ তার কলাম “আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ: ইতিহাসের প্যারাডক্স”-এ এই প্রশ্নগুলোকে বিশ্লেষণধর্মীভাবে সামনে এনেছেন। তার পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে বিষয়টি পর্যালোচনা করলে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, ক্ষমতার রাজনীতি এবং গণতান্ত্রিক চর্চার নানা দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

মহিউদ্দিন আহমদের লেখাটি আজ শুক্রবার, ১০ এপ্রিল দৈনিক প্রথম আলোর ছাপা সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। এতে শুরুতেই দেশের মানুষের রাজনৈতিক মানসিকতা নিয়ে একটি তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন।

তিনি লিখেছেন, “আমাদের দেশের মানুষের কিছু বৈশিষ্ট্য আছে... পেটে ভাত না থাকলেও আমরা দিনরাত একটা খোয়াবের মধ্যে বাস করি। আর সেটা হচ্ছে রাজনীতি। রাজনীতি মানেই দল। আর দল মানেই দলাদলি...”—এই বক্তব্যে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, রাজনীতি শুধু একটি প্রশাসনিক বা নীতিগত বিষয় নয়; এটি মানুষের আবেগ, পরিচয় ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

তিনি আরও বলেন, “সবাই আছে একটা দৌড়ের ওপর—কে কাকে ডিঙিয়ে, মেরে, উপড়ে ফেলে দেশের দখল নেবে।” এই বক্তব্য রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার চরম রূপকে নির্দেশ করে, যেখানে আদর্শ বা নীতির চেয়ে ক্ষমতা দখলই প্রধান হয়ে ওঠে। তার মতে, রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের লক্ষ্য ও আদর্শকে “মুখরোচক শব্দে” উপস্থাপন করলেও বাস্তবে তা প্রায়ই জনগণের স্বার্থকে উপেক্ষা করে।

দেশে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করেছেন। তার ভাষায়, “এ দেশে দল নিষিদ্ধের খেলা চলছে অনেক দিন ধরে।” পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল তাদের আদর্শিক অবস্থান—“তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না... ইসলামবিরোধী।”

পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময় নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলেও সামরিক শাসক আইয়ুব খান আবারও দলটিকে নিষিদ্ধ করেন। একইভাবে জামায়াতে ইসলামী-ও একাধিকবার নিষিদ্ধ ও পুনর্বহাল হওয়ার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। ১৯৫৩ সালের লাহোর দাঙ্গার পর দলটি নিষিদ্ধ হয়, আবার কিছুদিন পর ফিরে আসে; ১৯৬১ সালে আবার নিষিদ্ধ, ১৯৬৫ সালে পুনরায় সক্রিয়।

১৯৭১ সালে সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগ ও ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিকে নিষিদ্ধ করেন। এই ঘটনা রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের মাধ্যমে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের একটি স্পষ্ট উদাহরণ।

স্বাধীনতার পর প্রথমদিকে সরাসরি কোনো দল নিষিদ্ধ করা না হলেও সংবিধানের মাধ্যমে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ফলে মুসলিম লীগ, জামায়াতসহ কয়েকটি দল কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। তবে ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে একদলীয় শাসন চালু করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) প্রতিষ্ঠা করেন।

মহিউদ্দিন আহমদ এ প্রসঙ্গে বলেন, “এটি কার্যত ছিল নতুন মোড়কে আওয়ামী লীগ ও এর মিত্রদের নিয়ে একটি দল।” অর্থাৎ, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পরিবর্তে একদলীয় কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, যা রাজনৈতিক বহুত্ববাদকে সীমিত করে।

পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে দেন এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতির পথ আবার উন্মুক্ত করেন। তবে তার আমলেও কিছু দল নিষিদ্ধ হয়েছিল, বিশেষ করে অভ্যুত্থানচেষ্টার প্রেক্ষাপটে।

মহিউদ্দিন আহমদ মুক্তিযুদ্ধের সময়কার প্রেক্ষাপটও তুলে ধরেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, “অভিযোগের আঙুল ছিল পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও তার সহযোগী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর... সহযোগী দল হিসেবে বারবার উঠে আসে জামায়াতে ইসলামীর নাম।”

পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করা হয়। তিনি লিখেছেন, “জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের ধরে জেলে ঢোকানো হয়। অনেককে ফাঁসি দেওয়া হয়। দল কিন্তু নিষিদ্ধ হয়নি।” অর্থাৎ, রাষ্ট্র আইনগত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দলটির প্রভাব কমানোর চেষ্টা করলেও সরাসরি নিষিদ্ধ করার পথে তখন যায়নি।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। মহিউদ্দিন আহমদের ভাষায়, “২০২৪ সালের জুলাইয়ে এসে আমরা এক অভূতপূর্ব গণবিদ্রোহের দেখা পাই।” এই সময় আওয়ামী লীগ সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করে। তবে তিনি এই সিদ্ধান্তের পেছনে দ্বৈত ব্যাখ্যার কথা উল্লেখ করেছেন—“সরকার মনে করে... জামায়াত কলকাঠি নাড়ছে। অথবা... জনগণের নজর অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।”

পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ নিজেই নিষিদ্ধ হয় অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে। এর ফলে ২০২৬ সালের নির্বাচনে দলটি অংশ নিতে পারেনি। এ প্রসঙ্গে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন: “কোনো দলকে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করার সার্বভৌম ক্ষমতা কার হাতে থাকবে? ভোটারের হাতে, নাকি সরকারের হাতে?”

এই প্রশ্নটি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর কেন্দ্রে আঘাত করে। গণতন্ত্রে জনগণই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা—এই মৌলিক নীতির সঙ্গে দল নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

মহিউদ্দিন আহমদ তার কলামে একটি শক্তিশালী ধারণা তুলে ধরেছেন—‘প্যারাডক্স’। তিনি লিখেছেন, “এ দেশে আওয়ামী লীগ একদিন নিষিদ্ধ হবে এবং জামায়াতে ইসলামী জাতীয় সংসদ আলো করে বসে থাকবে, এটি ইতিহাসের একটি ‘প্যারাডক্স’।”

এখানে তিনি দেখাতে চেয়েছেন, যে দল একসময় অন্য দলকে কোণঠাসা করেছে, সেই দলই পরবর্তীতে একই পরিণতির শিকার হয়েছে। ইতিহাসের এই ঘূর্ণাবর্ত রাজনীতির অনিশ্চয়তা ও ক্ষমতার অস্থিরতাকে প্রতিফলিত করে।

আওয়ামী লীগের বর্তমান অবস্থা নিয়ে তিনি সমালোচনামূলক পর্যবেক্ষণ করেছেন। তার মতে, “দলের শীর্ষ নেতারা সবাই পলাতক... আত্মীয়নির্ভর দলের নেতৃত্ব জেনেবুঝেই সব আত্মীয়কে... বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা কার্যত দলের মালিক।” তার ভাষায়, শেখ হাসিনার আচরণে রাজনীতিতে ফিরে আসার স্পষ্ট ইচ্ছা দেখা যায় না। “এখন তার হয়ে কথা বলেন তার ছেলে। আওয়ামী লীগ কি শেষমেশ একটা মা-ছেলের দলে পরিণত হলো?”—এই মন্তব্য দলটির অভ্যন্তরীণ কাঠামো ও নেতৃত্বের প্রশ্নকে সামনে আনে।

এছাড়া তিনি দলটির জনসমর্থন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন: “এত বড় একটা দল, তার নাকি কোটি কোটি সমর্থক। কোথায় তারা?” এই প্রশ্ন রাজনৈতিক সংগঠনের বাস্তব শক্তি ও জনভিত্তির সত্যতা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার দিকে ইঙ্গিত করে।

মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের পেছনে রাজনৈতিক কৌশলও থাকতে পারে। তার ভাষায়, “সরকার এ পর্যায়ে এসে আওয়ামী লীগকে কেন নিষিদ্ধ করল, এটি একটি মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন।” তিনি উল্লেখ করেন, সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর ঐকমত্যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ না দেওয়াও একটি সম্ভাব্য কারণ।

সবশেষে তিনি ইঙ্গিত দেন, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও এ নিষিদ্ধ হওয়ার পেছনে কৌশল থাকতে পারে—“আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের পেছনে এ দলেরও কিছু কৌশল থাকতে পারে। সেটি বোঝা যাবে আগামী দিনে।”

মহিউদ্দিন আহমদের বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয়, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার বিষয়টি কেবল আইনি বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি গভীর রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক ও নৈতিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। দেশের ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিষিদ্ধের শিকার হয়েছে বিভিন্ন দল—কখনো কমিউনিস্ট পার্টি, কখনো জামায়াতে ইসলামী, আবার কখনো আওয়ামী লীগ নিজেই।

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি থেকেই যায়—গণতন্ত্রে চূড়ান্ত ক্ষমতা কার হাতে? রাষ্ট্রের, নাকি জনগণের? যদি জনগণের হয়, তাহলে কোনো দলকে নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে কি সেই ক্ষমতাকে সীমিত করা হচ্ছে না?

দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার ওপর। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে হলে প্রয়োজন সহনশীলতা, আইনের শাসন এবং জনগণের রায়ের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন।

মহিউদ্দিন আহমদ

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনগণকে সম্পৃক্ত করে পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদারের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

🕒 প্রকাশ: ০৪:৫৪ অপরাহ্ন, ৬ই সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইইউর ৬১ বাণিজ্য বাধার ৪৮টিরই সমাধান করা হয়েছে: বাণিজ্যমন্ত্রী

🕒 প্রকাশ: ০৪:৪৯ অপরাহ্ন, ৬ই সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাংস্কৃতিক ঐক্যই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শক্তি: সংস্কৃতিমন্ত্রী

🕒 প্রকাশ: ০৪:৪৪ অপরাহ্ন, ৬ই সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিখোঁজ শিশুদের জন্য পুলিশের বিশেষ সেল গঠনের দাবি স্বজনদের

🕒 প্রকাশ: ০৪:৩৯ অপরাহ্ন, ৬ই সেপ্টেম্বর ২০২৬

রোহিঙ্গা ইস্যু যেন অন্য কোনো সংকটে চাপা না পড়ে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

🕒 প্রকাশ: ০৪:৩৩ অপরাহ্ন, ৬ই সেপ্টেম্বর ২০২৬

Footer Up 970x250