ছবি : সংগৃহীত
রবিউল হক
রাধা-কৃষ্ণের প্রেম কাহিনী ছাড়াও সমাজের নানা সামাজিক সমস্যা ধামাইল গানের বিষয়বস্তু হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়। বাঙালির আধুনিক চিন্তার ফসল হিসেবে রাধা-কৃষ্ণের প্রণয় উপাখ্যানকে উপজীব্য করে ধামাইল গানের পরিবেশনা অধিক জনপ্রিয়। তবে রাধা-কৃষ্ণকে অবলম্বন করেই এর পরিবেশনা সীমাবদ্ধ না থেকে যৌতুক, নিরক্ষরতা, জন্মনিয়ন্ত্রণ, বৃক্ষরোপণ, মৎস্যচাষ, এসিড নিক্ষেপ, মাদকদ্রব্যসহ সমাজের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরার মাধ্যমে এর পরিবেশনা চলমান রয়েছে।
পরিবেশনের স্থান: ধামাইল গান বিবাহ অনুষ্ঠান ছাড়াও অন্যান্য অনুষ্ঠানে বাড়ির উঠান, বারান্দা কিংবা খোলা জায়গায় ১০ জনের অধিক নারী একত্রে গোল হয়ে নৃত্য-সহযোগে পরিবেশন করেন।
অঞ্চল: ধামাইল গান সিলেট বিভাগ ছাড়াও সিলেটের পার্শ্ববর্তী বেশ কয়েকটি জেলায় পরিবেশিত হতে দেখা যায়। তবে বর্তমানে এর পরিবেশনা কিছুটা কমে গেছে।
ধামাইল গানের উপলক্ষ: ধামাইল গান রচনা ও পরিবেশনার মূল উপলক্ষ বিয়েকেন্দ্রিক এ কথা অনস্বীকার্য। বিয়ের সময় বর-কনেকে সামনে রেখে ধামাইল গান নৃত্যসহযোগে পরিবেশিত হয়। এছাড়াও অন্নপ্রাশন, অধিবাস, স্বাদভক্ষণ, গৃহপ্রবেশ, ধানকুটা, চিড়াকুটা, ঢেঁকিপাড় ও শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমীসহ বিভিন্ন পূজা-পার্বণে ধামাইল গান পরিবেশিত হয়।
প্রয়োজনীয় উপকরণ: অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধামাইল গান পরিবেশনের সময় ঘি, ধান, ফুল, প্রদীপ, দূর্বা, কুলা, মাটি, চেয়ার, লুঙ্গি, গামছা, সাবান, স্যান্ডো গেঞ্জি, শার্ট, প্যান্ট ব্যবহারের রীতি বেশ প্রচলিত।
সাজসজ্জা: ধামাইল গান পরিবেশনকারীদের তেমন কোনও সাজসজ্জার প্রয়োজন হয় না, এমনকি সাজঘর বলে বিশেষ কোনও ব্যবস্থার দরকার নেই বললেই চলে। নিত্য ব্যবহার্য পোশাকেই বেশিরভাগ ধামাইলের পরিবেশনা হয়ে থাকে।
বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার: ধামাইল গানের পরিবেশনায় বর্তমানে ঢোলের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। এছাড়া হাতে তালি দিয়েই মূলত এর পরিবেশনা এক ভিন্ন আবহ তৈরি করে।
সুরের প্রয়োগ: ধামাইল গানে সুরের বেশ বৈচিত্র্য রয়েছে। অঞ্চলভেদে সুরের পরিবর্তন বেশ লক্ষণীয়। তবে ধামাইল গানে মাধুরী, মেঘমালা, ধামালী, মিতালীসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক সুরের প্রয়োগ রয়েছে বলে ‘বাংলাদেশের ধামাইল গান’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে।
পরিবেশনা রীতি: ধামাইল গানের শিল্পীদের ছন্দময় করতালির মাধ্যমে সম্মিলিত কণ্ঠের টানা সুর, তাল এবং লয়ের মিশ্রণে এ গান পরিবেশিত হয়। তবে ধামাইল গান গাওয়ার সময় বর ও কনেকে কেন্দ্র করে শিল্পীরা গোলাকার হয়ে দাঁড়িয়ে আবহ সৃষ্টি করে। এ সময় তাদের পরিবেশনার উপকরণ হিসেবে সাবান, তেল, কলস ভর্তি পানি, পিঁড়ি, গামছা, লুঙ্গি, দুর্বাঘাসের ব্যবস্থা রাখা হয়। এর পর তারা পর্বানুসারে নিয়মানুযায়ী ধামাইল পরিবেশন করে থাকেন। তবে সিলেটে ছিয়াশি পর্বের ধামাইল পরিবেশনার প্রচলন রয়েছে বলে জানা যায়।
সিলেট অঞ্চলের মেয়েরা ধামাইল গান চক্রাকারে কাঁধে হাত রেখে কিংবা দুহাতে তালি দিয়ে গোলাকার হয়ে ঘুরে ঘুরে নৃত্যাকারে পরিবেশন করে থাকেন।
ধামাইল গানের শিল্পীদের বর্তমান অবস্থা: বর্তমানে এদশের ঐতিহ্যবাহী ধামাইল গানের পরিবেশনা পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বিলুপ্তির পথে। তবে নিজেদের তাগিদে ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্য এর পরিবেশনা এখনো সিলেটের প্রান্তিক অঞ্চলসমূহে চর্চিত হয়ে আসছে। আমাদের ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনাগুলোর চর্চা অব্যাহত রাখতে হলে পৃষ্ঠপোষকতার কোনও বিকল্প নেই।
তথ্যসূত্র
১. ইসরাফিল শাহীন (সম্পা.), পরিবেশন শিল্পকলা, খন্ড ১২, এশিয়াটিক সোসাইটি, ঢাকা, ২০০৭
২. সুমনকুমার দাস, বাংলাদেশের ধামাইল গান, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০১০
৩. সেলিম আল দীন, মধ্যযুগের বাঙলা নাট্য, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০১৮
৪. সাইমন জাকারিয়া, বাংলাদেশের লোকনাটক: বিষয় ও আঙ্গিক বৈচিত্র্য, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০০৮
রবিউল হক, লোক গবেষক ও শিল্পী
এস/ আই.কে.জে/