ফাইল ছবি
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ১৮ অক্টোবর সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে ইশরাককে ডেকে নিয়ে এ নির্দেশ দেওয়া হয়। পরদিন ১৯ অক্টোবর, সোমবার ইশরাক নিজেই পদত্যাগের ঘোষণা দেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পদ ছাড়তে হলেও জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের খবর প্রথমে অস্বীকার, সংবাদমাধ্যমকে ‘গুজব’ ও ‘উড়োখবর’ আখ্যা দেওয়া, আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি এবং পরদিন সিদ্ধান্তটি স্বেচ্ছায় নেওয়া বলে উপস্থাপন—ইশরাকের এই ধারাবাহিক অবস্থান পরিবর্তন বিএনপি ও সরকারের ভেতরে নতুন অস্বস্তি তৈরি করেছে। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের একটি অংশের মতে, অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি করেছিলেন ইশরাক, পদত্যাগের প্রক্রিয়া নিয়ে তার বক্তব্য সেই বিতর্ক আরও বাড়িয়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পরবর্তী নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপির প্রার্থী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে ইশরাক পদত্যাগের ঘটনাকে নিজের মতো করে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পদ ছাড়তে হয়েছে—এমন বার্তা দলের নেতা-কর্মী ও সম্ভাব্য ভোটারদের কাছে তার রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে বলে ইশরাক ঘনিষ্ঠরা মনে করেন। অন্যদিকে বিতর্কের মুখে নিজেই পদত্যাগ করেছেন—এমন বক্তব্য তাকে কিছুটা রাজনৈতিক সুবিধা দিতে পারে। এমন রাজনৈতিক পরিকল্পনা থেকে তিনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পদত্যাগের নির্দেশের বিষয়টি অস্বীকার করেন।
ইশরাকের পদত্যাগের ঘটনাটি যে কেবল তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয় ছিল না, তা স্পষ্ট হয় ১৮ অক্টোবর রাতে প্রকাশিত সংবাদ এবং পরদিন তার নিজের বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য থেকে। রোববার সন্ধ্যা ৭টা ২৯ মিনিটে সুখবর ডটকমে প্রকাশিত হয় ‘অস্ত্রকাণ্ডে ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী, ইশরাক হারাতে পারেন প্রতিমন্ত্রীর পদ’ শিরোনামের প্রতিবেদন। কয়েক ঘণ্টা পর রাত ১০টার দিকে প্রথম আলো অনলাইনে প্রকাশিত হয় ‘মন্ত্রিসভা থেকে ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ’ শিরোনামের সংবাদ। সরকার নিয়ন্ত্রিত বিটিভি পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ইশরাকের পদত্যাগের খবর প্রচার করে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্রের বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছিল। পরদিনও সংবাদমাধ্যমটি একই তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
কিন্তু প্রথম আলোর সংবাদ প্রকাশের ২২ মিনিট পর, রাত ১০টা ২২ মিনিটে নিজের হোয়াটসঅ্যাপ গণমাধ্যম গ্রুপে ইশরাক লেখেন, পদত্যাগের গুজবে কান না দিতে। চার মিনিট পর পাঠানো অডিও বার্তায় তিনি খবরটিকে ‘গুজব’ ও ‘উড়োখবর’ বলে উল্লেখ করেন। রাত ১০টা ২৮ মিনিটে তার প্রেস কর্মকর্তা প্রতিবাদলিপি দিয়ে খবরটিকে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর দাবি করেন। সংবাদ প্রত্যাহার না করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়। পরে ইশরাকের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজেও একই বক্তব্য প্রকাশ করা হয়।
রোববার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার পর দেওয়া আরেকটি ফেসবুক পোস্টে ইশরাক লেখেন, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে মন্ত্রিসভার কোনো সদস্যের পদত্যাগ বা অন্য কোনো নির্দেশ এলে তা কার্যকর করা প্রথাগতভাবে বাধ্যতামূলক। তার ক্ষেত্রে এমন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে সংবাদ সম্মেলন করে দেশবাসীকে জানাবেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
অথচ কয়েক ঘণ্টা পর সোমবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে ইশরাক জানান, বেলা দুইটায় জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দেবেন। সকাল ৯টা ৮ মিনিটে হোয়াটসঅ্যাপ অডিও বার্তায় বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পাওয়া সিদ্ধান্ত সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করবেন।
এখানেই তার বক্তব্যের মূল অসংগতি। আগের রাতে যে খবরকে মিথ্যা ও গুজব বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, পরদিন সকালে সেই সিদ্ধান্তই প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পাওয়া বলে স্বীকার করেন। সংবাদ সম্মেলনে অবশ্য তার ব্যাখ্যা ছিল, সিদ্ধান্তটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের আগেই কোনো সহকর্মী সংবাদমাধ্যমে জানিয়ে দেওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইশরাক বলেন, “আমি যদি প্রধানমন্ত্রীকে গিয়ে বলিও স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে চাচ্ছি, অফিশিয়ালি কিন্তু তার নির্দেশই আসবে।” তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার প্রধান হওয়ায় নির্দেশ দেওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু এ ব্যাখ্যা আগের রাতে খবরটিকে অসত্য বলার বিষয়টি পুরোপুরি মীমাংসা করে না। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা এবং কোনো তথ্য মিথ্যা হওয়া এক কথা নয়।
জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক বলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছেন। ঢাকা-৬ আসন ও আশপাশের এলাকায় মাদক নির্মূল এবং জনজীবনের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কাজ করার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তাতে সম্মত হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনের পর নেতা-কর্মীদের সামনে এসে তিনি বলেন, “আমি আজকে পদত্যাগ করলাম আমার এই পদ থেকে।”
তবে পদত্যাগের পেছনে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের বিষয়টি সংবাদমাধ্যমের একাধিক প্রতিবেদনে উঠে আসার পরও ইশরাক কেন প্রথমে তা অস্বীকার করেছিলেন, সে প্রশ্নের সরাসরি উত্তর মেলেনি। তার বক্তব্যে পদত্যাগের সিদ্ধান্তের সময়, উদ্যোগের উৎস এবং আগের রাতের প্রতিবাদের মধ্যে অসংগতি রয়ে গেছে।
ইশরাকের এই আচরণে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে দলীয় সূত্রের দাবি। কারণ, অস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নেওয়ার ঘটনায় সমালোচনা সামাল দেওয়ার বদলে পদত্যাগের নির্দেশ অস্বীকার করে তিনি সরকার ও দলের বক্তব্যের সঙ্গে নিজের অবস্থানের দূরত্ব তৈরি করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের খবর অস্বীকার করে পরে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের দাবি তোলায় তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ইশরাকের রাজনৈতিক জীবনে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। তার বাবা, বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ও অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের শেষ মেয়র সাদেক হোসেন খোকার মৃত্যুর পর তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান গড়ে তোলেন। ২০২০ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী হন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপসের কাছে পরাজয়ের পর আইনি লড়াই চালিয়ে যান। ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল তাকে মেয়র ঘোষণা করলেও শেষ পর্যন্ত তিনি শপথ নিতে পারেননি।
গত ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান ইশরাক। কিন্তু ১৭ অক্টোবর রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে পিস্তল হাতে তার উপস্থিতির ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। অভিযানে তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের আচরণ এবং একজন প্রতিমন্ত্রীর নিজে অস্ত্র হাতে লোকজনকে ধাওয়া করার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এর পরদিনই প্রধানমন্ত্রী তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন বলে সরকারের একাধিক সূত্র জানায়।
এখন ইশরাকের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু মন্ত্রিত্ব হারানোর নয়; নিজের বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং দলের ভেতরে রাজনৈতিক অবস্থানও সামলাতে হবে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদ ঘিরে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা থাকলে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ তার ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে দলীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের ওপর। তবে পদত্যাগের নির্দেশ অস্বীকার করে পরে সেটিকে স্বেচ্ছায় নেওয়া সিদ্ধান্ত হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা তার রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
খবরটি শেয়ার করুন