ছবি: সংগৃহীত
ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম বলছেন, দেশের একটি বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না পাওয়ায় দেশে-বিদেশে নানা সমালোচনা হবে। শেখ হাসিনা মানেই আওয়ামী লীগ। আমাদের দেশে রাজনৈতিক দল সবসময় নেতানির্ভর। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদবিরোধী আন্দোলন ও তার পতন বাংলাদেশকে গণতন্ত্রের পথে নতুন করে যাত্রা শুরুর সুযোগ দেয়।
তিনি বলেন, আবেগপ্রবণ জাতি হওয়ায় আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে, দেশের ভেতরে আমরা যা-ই করি না কেন, বৈশ্বিক ব্যবস্থার অংশ হতে হলে আমাদের কিছু আন্তর্জাতিক মান ও চর্চা মেনে চলতেই হবে। যাতে আমরা বিশ্বে একটি বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি পাই। তার মতে, তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইনউদ্দিনের সমর্থনে গঠিত ফখরুদ্দীন আহমেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক থাকলেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার শামসুল হুদার অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনটি (২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত) একটি নির্দিষ্ট মাত্রার গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল।
১৯৭৩ সালে স্বাধীন দেশে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল ভোট পেয়ে নির্বাচিত হওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, ৫৫ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতিতে আওয়ামী লীগ ৩০০টির মধ্যে ২৯৩টি আসন পায়। সেই বিপুল বিজয়ের পেছনে অনেক কারণ ছিল—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতি, পাকিস্তান আমলে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ ১৬২টির মধ্যে ১৬০টি আসনে আওয়ামী লীগের জয়, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়।
বঙ্গবন্ধুর সরকারের সময় গণমাধ্যম ও সাংবাদিকেরা ছিলেন 'ভিন্নমতের কণ্ঠ' উল্লেখ করে মাহফুজ আনাম বলেন, সংসদের বাইরে ডেইলি ইত্তেফাকে আবুল মনসুর আহমদ, সাপ্তাহিক হলিডেতে এনায়েতুল্লাহ খান, দৈনিক গণকণ্ঠে কবি আল-মাহমুদ ও বাংলাদেশ অবজারভারে পত্রিকাটির সম্পাদক আবদুস সালাম ছিলেন ভিন্নমতের কণ্ঠ।
তিনি বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই মনে হচ্ছে অতীত থেকে শেখার অনেক কিছু আছে। ৫৪ বছর পরও কেন আমাদের গণতন্ত্র এত দুর্বল? কেন এখনো আমরা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে 'শত্রু' হিসেবে দেখি? ক্ষমতাসীন দল বিরোধী দলকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে না। গণতান্ত্রিক শাসনে ফেরার প্রস্তুতি হিসেবে আমাদের অবশ্যই অতীত থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক যাত্রা সফল হয়।
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, আওয়ামী লীগের নানা সমালোচনা থাকলেও এমন একটা বড় দল যেহেতু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাইরে থাকছে, নির্বাচনের নৈতিক বৈধতা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতেই পারেন। অতীতে সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচনকে সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কেউ কেউ বৈধতা দিলেও নৈতিক বৈধতা পায়নি। এর একটি প্রধান কারণ ছিল বিপুলসংখ্যক ভোটারের অনাগ্রহ ও অনুপস্থিতি।
তিনি বলেন, এবারের নির্বাচন কতটা অংশগ্রহণমূলক হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রশ্ন হলো, অংশগ্রহণমূলক বলতে আমরা কী বুঝি? এর দুটি দিক আছে। একটি হলো সব দলের অংশগ্রহণ। অন্যটি হলো অধিক হারে ভোটারের অংশগ্রহণ। এত দিন ধরে আমরা যে ‘ক্লাসিক’ দ্বিদলীয় রাজনীতির আশপাশে ঘুরপাক খেয়েছি, সেই পরিস্থিতি আর নেই। একটি দল—আওয়ামী লীগ—দৃশ্যপটে নেই।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের অনেক গোঁড়া সমর্থক আছেন, যারা জনরোষের ভয়ে সন্ত্রস্ত। তারা অনেকেই আত্মগোপনে। অন্যরা বাড়িতে চুপচাপ বসে। ‘হয়রানির’ ভয়ে তারা হয়তো ভোটকেন্দ্রে যাবেন না। তারা ‘মবের’ পাল্লায় পড়তে পারেন। তাদের সংখ্যা কত? আগামী নির্বাচনে যদি ভোটার উপস্থিতি একটা সম্মানজনক পর্যায়ে থাকে, তাহলে বলা যাবে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়েছে। ভোটার উপস্থিতি যদি চোখে পড়ার মতো কম হয়, তাহলে নির্বাচনটির নৈতিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. রওনক জাহান বলেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে জনমনে গভীর সংশয় বিরাজ করছে। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন কীভাবে অনুষ্ঠিত হবে—সে বিষয়ে এখনো কেউ স্পষ্ট কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না। অনেকে বলছেন, যেভাবে হোক নির্বাচনটা হয়ে যাক। মানুষ অন্ধভাবে বিশ্বাস রাখছে নির্বাচনের পর সংকট কেটে যাবে, কিন্তু আসলে সেটা মনে করার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে রওনক জাহান বলছেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে শুধু সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নয়, সাধারণ মানুষও এখন নিজেদের অধিকার নিয়ে ভাবার জায়গা থেকে সরে এসে কেবল নিরাপত্তা চাইছে। নিরাপত্তা দেওয়া যেন এখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়, বরং “চ্যারিটি” বা দয়ার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবার মনে একটাই ভাবনা—আমাকে সুরক্ষা দাও। রাজনৈতিক কর্মীদের দায়িত্ব শুধু ভোট টানা বা বিরিয়ানি খাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষাও তাদের দিতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘কোনো দেশের সংবিধানে কী লেখা আছে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সে দেশের সংখ্যালঘুরা নিজেদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে কীভাবে ভাবছে। সংখ্যালঘুদের অধিকার ও নিরাপত্তার বাস্তব পরিস্থিতির ওপরই একটি দেশের গণতন্ত্রের প্রকৃত মান নির্ভর করে।’
'ফেসিং দ্য মোস্ট ভাইটাল ইলেকশন এভার, দেয়ার ইজ নো ওয়ে ফরওয়ার্ড উইথআউট ইট' (সামনে ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন, যার কোনো বিকল্প নেই) শিরোনামে আজ শুক্রবার (৯ই জানুয়ারি) ডেইলি স্টারের ছাপা সংস্করণে প্রকাশিত এক উপসম্পাদকীয়তে মাহফুজ আনাম উপরের কথাগুলো বলেন। মহিউদ্দিন আহমদ কথাগুলো বলেছেন দৈনিক প্রথম আলোর ছাপা সংস্করণে আজ প্রকাশিত তার এক উপসম্পাদকীয়তে। তার লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে 'নির্বাচনকে নৈতিক বৈধতা দিতে হলে...' শিরোনামে।
মাহফুজ আনাম ও মহিউদ্দিন আহমদের উপসম্পাদকীয় থেকে নির্বাচিত অংশ এ প্রতিবেদনে নেওয়া হয়েছে। ড. রওনক জাহান তার কথাগুলো বলেন ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে গতকাল বৃহস্পতিবার ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র ও সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার’ শিরোনামের এক সংলাপে। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) এ সংলাপের আয়োজন করে।
মাহফুজ আনাম নিজের উপসম্পাদকীয়তে বলেন, এরশাদবিরোধী আন্দোলন ও তার পতন বাংলাদেশকে গণতন্ত্রের পথে নতুন করে যাত্রা শুরুর সুযোগ দেয়। বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটি চমৎকার নির্বাচন আয়োজন করে এবং তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে বিচারপতি হাবিবুর রহমান ও ২০০১ সালে বিচারপতি লতিফুর রহমানের অধীনে নির্বাচন সেই জনআস্থা আরও সুদৃঢ় করে।
তিনি বলেন, আমাদের ক্ষেত্রে দল সবসময় নেতানির্ভর। বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের, জিয়াউর রহমান বিএনপির, এইচ এম এরশাদ জাতীয় পার্টির প্রতিচ্ছবি ছিলেন। পরবর্তীতে খালেদা জিয়া মানেই বিএনপি ও শেখ হাসিনা মানেই আওয়ামী লীগ হয়ে ওঠে। শীর্ষ নেতার বাইরে দলগুলোর স্বাধীন অস্তিত্ব যেন খুবই সীমিত।
তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন দল বিরোধী দলকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে না। এই সংস্কৃতি বদলাতে হবে। সুশাসনের জন্য এবং এক অর্থে নিজেদের সাফল্যের জন্যও ক্ষমতাসীন দলের একটি শক্তিশালী বিরোধী দল প্রয়োজন। কার্যকর, প্রাণবন্ত ও দায়িত্বশীল বিরোধী দল ছাড়া বাংলাদেশে কার্যকর গণতন্ত্র টিকে থাকা কঠিন।
তার মতে, তবে এর বিপরীত শিক্ষাও আছে। আমাদের একটি দায়িত্বশীল বিরোধী দলও প্রয়োজন। আমরা প্রায়শই দেখি 'বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা'র সংস্কৃতি—যা দেশের কল্যাণ, সুশাসন, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা বা দক্ষ সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য নয়। ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দল পরস্পরকে 'শত্রু' ভাবে।
তিনি বলেন, তাই সবার প্রতি অনুরোধ, দেশকে প্রথম, গণতন্ত্রকে দ্বিতীয় ও নিজের বিজয়কে তৃতীয় স্থানে রাখুন। আপনি জিতলে অভিনন্দন, হারলেও অভিনন্দন। কারণ, আপনি জনগণের রায়কে সম্মান জানিয়েছেন এবং আমাদের গণতান্ত্রিক যাত্রা পুনরায় শুরু করতে সহযোগিতা করেছেন।
খবরটি শেয়ার করুন