সোমবার, ২১শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৬ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** বাড়ছে হুতিদের হামলা, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির মুখে ইরানের হুঁশিয়ারি *** জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কের পথে প্রধানমন্ত্রী *** সাগরে শক্তিশালী হচ্ছে লঘুচাপ, ৬ অঞ্চলে ৬০ কিমি ঝড়ের আভাস *** আশুলিয়ায় সিলিন্ডার বিস্ফোরণে যেভাবে ছড়াল আগুন *** আশুলিয়ায় কাভার্ড ভ্যান থেকে ৬ লাশ উদ্ধার *** জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রথম স্ত্রীসহ থানায় এমপি নজরুল *** সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে বাড়ল ২০ টাকা *** কমলাপুর রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনে আগুন *** শিল্পকলা একাডেমির সামনে ককটেল বিস্ফোরণ, পল্লবীতে বাসে আগুন *** ন্যাম ভবন থেকে সাতক্ষীরার এমপি নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধার

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার কর্মসূচি: একই বিষয়ে তিন রকম বক্তব্য কেন চিফ প্রসিকিউটরের?

প্রণব সাহা

🕒 প্রকাশ: ০১:১৩ পূর্বাহ্ন, ১৩ই জুলাই ২০২৬

#

ফাইল ছবি

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের পর দেশ ছেড়ে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক ও আইনি আলোচনা শুরু হয়েছে। রয়টার্সে শেখ হাসিনা চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার ইচ্ছার খবর প্রকাশের পর বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে।

এই ঘোষণার আগে ও পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম কয়েক দিনের ব্যবধানে একই বিষয়ে তিনটি ভিন্ন ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। ৮ জুলাই বিবিসি বাংলাকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আইনগত সুযোগের কথা বলেন। ১১ জুলাই একটি অনুষ্ঠানে তিনি রাজনৈতিক ভাষায় শেখ হাসিনাকে ‘কালকেই দেশে চাই’ বলে মন্তব্য করেন।

আবার ১২ জুলাই সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, শেখ হাসিনার সরাসরি আত্মসমর্পণের কোনো আইনি সুযোগ নেই; প্রত্যর্পণ বা অন্য প্রক্রিয়ায় ফিরলেও তাকে গ্রেপ্তার হয়েই কারাগারে যেতে হবে।

একই বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রধান প্রসিকিউটরের পরপর তিন ধরনের অবস্থান জনপরিসরে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আইনজীবীদের একাংশ বলছেন, বিচারিক বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রধান কৌঁসুলির বক্তব্যে ধারাবাহিকতা ও আইনি স্পষ্টতা থাকা প্রয়োজন। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

৮ জুলাই বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, আইনের দৃষ্টিতে শেখ হাসিনা একজন পলাতক আসামি। তিনি কোথায় অবস্থান করছেন, ট্রাইব্যুনাল আনুষ্ঠানিকভাবে জানে না। তবে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, তিনি ভারতে আছেন।

ওই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। সেই চুক্তির আওতায় তাকে দেশে আনার সুযোগ আছে। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, শেখ হাসিনা নিজেও দেশে ফিরে আসতে পারেন।

চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, যে কোনো দণ্ডিত ব্যক্তি আদালতে আত্মসমর্পণ করে আইনগতভাবে অভিযোগ মোকাবিলা করতে পারেন। তবে একজন পলাতক ব্যক্তি বিদেশে বসে কোনো আইনি সুবিধা পাবেন না। তাকে ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করতে হবে, কারাগারে যেতে হবে এবং সেখান থেকেই আপিল বা অন্যান্য আইনগত পদক্ষেপ নিতে হবে।

এই বক্তব্যে মূল বার্তা ছিল—দেশে ফেরার ক্ষেত্রে আইনগত কোনো বাধা নেই; বরং দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের মাধ্যমেই বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব।

এর তিন দিন পর, ১১ জুলাই রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমিতে জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতি নিয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্যের ভাষা আরও রাজনৈতিক হয়ে ওঠে।

তিনি বলেন, "ডিসেম্বরে আসবেন, জানুয়ারিতে আসবেন—এটা আপনার ব্যাপার। কিন্তু আপনাকে তো আমরা কালকেই চাই। অতএব কোনো স্ট্যান্টবাজি করবেন না। এখানে আর কোনো অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করবেন না।"

একই অনুষ্ঠানে তিনি আরও বলেন, যারা বিচার চায় না এবং দেশে ফিরে আসতে চায়, তাদের লক্ষ্য সফল হতে দেওয়া যাবে না। আওয়ামী লীগের নেতাদের বিভিন্ন বক্তব্যকে তিনি "ফাঁকা বুলি" বলেও উল্লেখ করেন।

এই বক্তব্যে আইনি ব্যাখ্যার পাশাপাশি রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একজন প্রসিকিউটরের বক্তব্যে এমন রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহারের বিষয়টি নিয়েও আইনজীবীদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা যায় ১২ জুলাই সাংবাদিকদের সঙ্গে তার আলাপচারিতায়। এদিন চিফ প্রসিকিউটর বলেন, শেখ হাসিনার সরাসরি আত্মসমর্পণের কোনো আইনি সুযোগ নেই। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে তাকে ফেরানোর জন্য ভারত সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে। এখন হয় প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাকে বাংলাদেশে হস্তান্তর করা হবে, নয়তো অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় ফিরলে তাকে পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হবে কিংবা পুশব্যাক করা হবে।

তিনি আরও বলেন, দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার হয়েই কারাগারে যেতে হবে। তার মতে, আইসিটি আইনের ২১(৩) ধারায় নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে আপিল না করায় শেখ হাসিনার আপিলের অধিকারও নেই। একই সঙ্গে তিনি বলেন, দেশের ইতিহাসে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো আসামির জামিন পাওয়ার নজির নেই।

এ ছাড়া তিনি জানান, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেওয়া রায়ে তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ রয়েছে। ফলে দেশে থাকা ব্যাংক হিসাব বা সম্পত্তিও রাষ্ট্রের অনুকূলে যাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এই বক্তব্য ৮ জুলাইয়ের বক্তব্যের সঙ্গে তুলনা করলে কয়েকটি সুস্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়। ৮ জুলাই তিনি বলেছিলেন, শেখ হাসিনা নিজেও দেশে ফিরতে পারেন এবং আত্মসমর্পণ করে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবেন। কিন্তু ১২ জুলাই তিনি বলেন, সরাসরি আত্মসমর্পণের কোনো আইনি সুযোগ নেই এবং প্রত্যর্পণ বা অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় ফিরলেও তাকে প্রথমেই পুলিশের হেফাজতে যেতে হবে।

আইনজীবীদের একটি অংশ মনে করে, এই দুই বক্তব্যের মধ্যে আইনি ব্যাখ্যার পার্থক্য রয়েছে, যা জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে পারে।

এদিকে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরশেদ শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে ভিন্ন একটি আইনি প্রশ্ন সামনে এনেছেন। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার সময় তার কাছে কূটনৈতিক বা লাল পাসপোর্ট ছিল। পরবর্তীকালে সরকার সেই পাসপোর্ট বাতিল করেছে। ফলে বর্তমানে তার কাছে বৈধ ভ্রমণ দলিল আছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।

মনজিল মোরশেদের মতে, বৈধ পাসপোর্ট না থাকলে দেশে ফিরতে শেখ হাসিনার ট্রাভেল পাস প্রয়োজন হবে। আর ট্রাভেল পাস দেওয়ার এখতিয়ার সরকারের হাতে। সরকার ট্রাভেল পাস দিলে তিনি দেশে ফিরতে পারবেন; না দিলে সেটিই হবে বাস্তবিক বাধা।

তবে তিনি এটাও বলেন, দেশে ফিরলেই শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হবে। এরপর তিনি বিলম্বে আপিল করার আবেদন করতে পারবেন। আদালত সেই আবেদন গ্রহণ করবেন কি না, সেটি সম্পূর্ণ আদালতের এখতিয়ার।

মনজিল মোরশেদের মতে, আপিল গ্রহণ করা হলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশ চাওয়া যেতে পারে এবং পরে নিয়ম অনুযায়ী আপিল শুনানি হবে।

অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিকও বিবিসি বাংলাকে বলেন, নির্ধারিত সময় অতিক্রম করলেও আদালত চাইলে বিলম্বিত আপিল গ্রহণ করতে পারেন। অতীতে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে এমন নজির রয়েছে।

চিফ প্রসিকিউটর নিজেও ৮ জুলাই বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছিলেন যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আগের কয়েকটি মামলায় আপিল বিভাগ সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদের "সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার" নীতির ভিত্তিতে বিলম্বিত আপিল গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধ মামলার দণ্ডিত আবুল কালাম আজাদের আপিলের উদাহরণ তিনি তুলে ধরেন।

ফলে ১২ জুলাই দেওয়া তার বক্তব্যে আপিলের সুযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করার বিষয়টিও আইনজীবীদের মধ্যে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।

আইন বিশ্লেষকদের মতে, এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে কি না—এটি একটি প্রশ্ন। দ্বিতীয়ত, দেশে ফিরে তিনি আপিল বা অন্য কোনো আইনি প্রতিকার চাইতে পারবেন কি না—এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রশ্ন। আদালতই শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় প্রশ্নের সিদ্ধান্ত নেবেন।

ফৌজদারি আইনজীবী এস এম শাহজাহানও বলেছেন, কোনো ব্যক্তিকে তার বক্তব্য শোনার সুযোগ না দিয়ে চূড়ান্তভাবে বিচারিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা ন্যাচারাল জাস্টিস বা প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করলে আদালতের সামনে তার বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ থাকা উচিত।

সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরা এখন শুধু রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় নয়; এটি জটিল আইনি প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে। তবে সেই আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটরের পরপর তিনটি ভিন্ন ধরনের বক্তব্য।

৮ জুলাই তিনি বললেন, শেখ হাসিনা নিজে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করতে পারেন। ১১ জুলাই বললেন, তাকে "কালকেই" দেশে চান। আর ১২ জুলাই বললেন, সরাসরি আত্মসমর্পণের কোনো সুযোগ নেই; তাকে প্রত্যর্পণ বা অন্য প্রক্রিয়ায় এনে গ্রেপ্তার করতেই হবে।

রাষ্ট্রের প্রধান প্রসিকিউটরের এমন পরিবর্তিত অবস্থান রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি আইনগত ব্যাখ্যা নিয়েও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা কীভাবে দেশে ফিরবেন, আদৌ ফিরবেন কি না, কিংবা ফিরলে তার আইনি পথ কী হবে—এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর নির্ভর করবে আদালতের সিদ্ধান্ত, সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং ভারত–বাংলাদেশের পারস্পরিক আইনি প্রক্রিয়ার ওপর।

শেখ হাসিনা চিফ প্রসিকিউটর

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250