রবিবার, ২৭শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১২ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ড. ইউনূস আমলে গ্রেপ্তার, জামিনের একমাস পর মৃত্যু সাংবাদিকের, কিছু প্রশ্ন *** বাংলাদেশের কিসের এত দুশ্চিন্তা *** এমবাপ্পের চোট কতটা গুরুতর *** জাতিসংঘ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ নিয়ে সংবাদ সম্মেলন সোমবার *** জাসদ কার্যালয় থেকে আটক ২৭ জন কারাগারে *** দফায় দফায় হামলা, ধ্বংসস্তূপ থেকে যেভাবে বেঁচে ফিরলেন মোজতবা খামেনি *** জাসদ কার্যালয়ে হামলা, মব সৃষ্টি ও আটকের ঘটনায় আসকের নিন্দা *** ঢাকায় তিন দিনে চার স্থানে হামলা-ভাঙচুর-লুট, প্রশ্নের মুখে আইনশৃঙ্খলা *** দখল-চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা সরকারের জন্য অশনিসংকেত: টিআইবি *** পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তানে প্রবেশ করা ২৮ সশস্ত্র ব্যক্তিকে হত্যার দাবি তালেবানের

রাজধানীতে মবের মুখে তিন সাংবাদিক জ ই মামুন, মুন্নী সাহা ও প্রভাষ আমিন

নিজস্ব প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ১২:৫৪ পূর্বাহ্ন, ১৬ই জুলাই ২০২৬

#

ফাইল ছবি

রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় বুধবার (১৫ জুলাই) রাতে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মুন্নী সাহা, জ ই মামুন ও প্রভাষ আমিনকে ঘিরে হেনস্তার ঘটনা ঘটেছে। ইম্পালস হাসপাতালের সামনে আল মদিনা রেস্টুরেন্টে এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। পরে অন্য সাংবাদিকদের তৎপরতা এবং পুলিশের উপস্থিতিতে তারা নিরাপদে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সাংবাদিক মহলে নতুন করে নিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

দৈনিক সমকাল-এর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক আবু সালেহ রনি বুধবার রাতে নিজের ফেসবুক পোস্টে ঘটনার কথা জানান। তিনি ঘটনার একটি ভিডিওও প্রকাশ করেন। পোস্টে রনি লেখেন, মতপার্থক্য বা রাজনৈতিক ভিন্ন অবস্থান থাকতে পারে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে হেনস্তা করার সুযোগ নেই। তিনি আরও জানান, সহকর্মীদের দ্রুত তৎপরতা এবং পুলিশের উপস্থিতির কারণে তিন সাংবাদিক নিরাপদে ঘটনাস্থল ছেড়ে বাসায় ফিরতে সক্ষম হন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে কয়েকজন ব্যক্তিকে তিন সাংবাদিককে ঘিরে প্রশ্ন করতে এবং তাদের ভিডিও ধারণ করতে দেখা যায়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিদের সঙ্গে সাংবাদিকদের কথোপকথনও ভিডিওতে শোনা যায়। তবে কী কারণে তাদের ঘিরে ধরা হয়েছিল বা কারা এতে জড়িত ছিলেন, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ঘটনার পর সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠনের সদস্য এবং সংবাদকর্মীরা বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাদের বক্তব্য, রাজনৈতিক মতভেদ বা অতীতের অবস্থানের কারণে কাউকে জনতার হাতে তুলে দেওয়া কিংবা প্রকাশ্যে হেনস্তা করা আইনের শাসনের পরিপন্থী। অভিযোগ থাকলে সেটির নিষ্পত্তি আদালত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হওয়া উচিত।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের গণমাধ্যম অঙ্গনেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ওই সময়ের পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে সম্পাদকীয় ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে রদবদল হয়। এ সময় এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা প্রভাষ আমিন প্রতিষ্ঠানটি থেকে চাকরিচ্যুত হন। একই সময়ে বিভিন্ন টেলিভিশন ও সংবাদমাধ্যমের একাধিক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা এবং সমালোচনাও বাড়তে থাকে।

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জ ই মামুনও ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর হত্যা মামলায় আসামি হন, যা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় তাকে হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে, যা গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বেশ কয়েকজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাও দায়ের হয়। তাদের মধ্যে জ ই মামুন, মুন্নী সাহা ও প্রভাষ আমিনের নাম বিভিন্ন মামলায় অন্তর্ভুক্ত হয়। এসব মামলায় তাদের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে সংঘটিত বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়। সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকেরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, সংবাদমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট সংগঠন এবং সাংবাদিক নেতারা এসব মামলার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, সাংবাদিকতার পেশাগত কাজকে অপরাধের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়; অভিযোগ থাকলে তা অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিচার হওয়া প্রয়োজন।

মুন্নী সাহা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর একাধিকবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রলের শিকার হন। বিশেষ করে তার উপস্থাপনা ও অতীতের টেলিভিশন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ে। গত বছর রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় তিনি জনতার হাতে অবরুদ্ধ হন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজন তাকে ঘিরে ধরেন এবং বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। পরে পুলিশ সেখানে পৌঁছে তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। সে সময় পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, তার নিরাপত্তার স্বার্থেই তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল। পরে আইনগত প্রক্রিয়া শেষে তিনি থানা থেকে বেরিয়ে আসেন। ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।

প্রভাষ আমিনও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রলের শিকার হন। তার বিভিন্ন মন্তব্য ও টেলিভিশন আলোচনায় দেওয়া বক্তব্য নিয়ে নানা ধরনের সমালোচনা ছড়িয়ে পড়ে। একইভাবে জ ই মামুনও বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্রমণাত্মক মন্তব্যের মুখোমুখি হয়েছেন। সাংবাদিকদের একটি অংশের মতে, রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রভাবে সংবাদকর্মীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা আগের তুলনায় আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে 'মব জাস্টিস' বা জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিভিন্ন ঘটনায় দেখা গেছে, কোনো অভিযোগ বা সন্দেহের ভিত্তিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার পরিবর্তে জনতা ঘিরে ধরে জিজ্ঞাসাবাদ, ভিডিও ধারণ কিংবা শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা করছে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এ ধরনের প্রবণতা বিচারব্যবস্থা ও আইনের শাসনের জন্য উদ্বেগজনক। কারণ এতে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি নিরপরাধ ব্যক্তিও হয়রানির শিকার হতে পারেন।

গণমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, সাংবাদিকদের কাজের সমালোচনা বা তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকতেই পারে। কিন্তু তার সমাধান জনতার আদালতে নয়, আইন ও আদালতের মাধ্যমেই হওয়া উচিত। অন্যথায় সংবাদপেশার স্বাধীনতা এবং ব্যক্তির মৌলিক অধিকার—দুটিই ঝুঁকির মুখে পড়ে।

বুধবার রাতের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট তিন সাংবাদিক নিরাপদে ঘটনাস্থল ত্যাগ করলেও বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিক সমাজে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় ও ঘটনার পেছনের কারণ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। তবে গণমাধ্যমকর্মীরা আশা করছেন, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হবে এবং ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তি যেন আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে হয়রানি করতে না পারে, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সাংবাদিক মবের শিকার

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250