রবিবার, ২৭শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১২ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ড. ইউনূস আমলে গ্রেপ্তার, জামিনের একমাস পর মৃত্যু সাংবাদিকের, কিছু প্রশ্ন *** বাংলাদেশের কিসের এত দুশ্চিন্তা *** এমবাপ্পের চোট কতটা গুরুতর *** জাতিসংঘ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ নিয়ে সংবাদ সম্মেলন সোমবার *** জাসদ কার্যালয় থেকে আটক ২৭ জন কারাগারে *** দফায় দফায় হামলা, ধ্বংসস্তূপ থেকে যেভাবে বেঁচে ফিরলেন মোজতবা খামেনি *** জাসদ কার্যালয়ে হামলা, মব সৃষ্টি ও আটকের ঘটনায় আসকের নিন্দা *** ঢাকায় তিন দিনে চার স্থানে হামলা-ভাঙচুর-লুট, প্রশ্নের মুখে আইনশৃঙ্খলা *** দখল-চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা সরকারের জন্য অশনিসংকেত: টিআইবি *** পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তানে প্রবেশ করা ২৮ সশস্ত্র ব্যক্তিকে হত্যার দাবি তালেবানের

সুখবর এক্সপ্লেইনার

জাতিসংঘে বাংলাদেশের মুখ আইরিন খান: অভিজ্ঞতা, কূটনীতি ও প্রত্যাশার নতুন অধ্যায়

শুভ্র বড়ুয়া

🕒 প্রকাশ: ১২:২৫ পূর্বাহ্ন, ১০ই জুলাই ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের পরবর্তী স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিউইয়র্কে জাতিসংঘে আইরিন খানকে নিয়োগ দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত কেবল একটি প্রশাসনিক বদলি নয়; এটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক অঙ্গনে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, শরণার্থী সুরক্ষা, আইনের শাসন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা একজন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ব্যক্তিত্বকে এ দায়িত্ব দেওয়ায় দেশ-বিদেশে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে দায়িত্ব পালনকারী স্থায়ী প্রতিনিধি সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরীর স্থলাভিষিক্ত হবেন আইরিন খান। আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরুর আগেই তিনি নিউইয়র্কে দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন।

বাংলাদেশের জন্য এ নিয়োগ এমন এক সময়ে এলো, যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবাধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নয়ন অর্থায়ন, অভিবাসন, শান্তিরক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা—এসব বিষয়ে জাতিসংঘের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে অভিজ্ঞ, পরিচিত এবং আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্য একজন কূটনীতিক বা নীতিনির্ধারককে এ দায়িত্বে পাঠানোকে অনেকেই কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন।

আইরিন খানের কর্মজীবনের শুরু জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এ। প্রায় ২১ বছর তিনি এ সংস্থার বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। সদর দপ্তরের পাশাপাশি এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলে শরণার্থী সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। ভারতে ইউএনএইচসিআরের মিশনপ্রধান এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষাবিষয়ক বিভাগের উপপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

পরে ২০০১ সালে তিনি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব নির্বাচিত হন। সংস্থাটির ইতিহাসে তিনিই ছিলেন প্রথম নারী মহাসচিব। তার নেতৃত্বে অ্যামনেস্টি শুধু রাজনৈতিক বন্দি বা নাগরিক অধিকারের প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; দারিদ্র্য, বৈষম্য, নারীর প্রতি সহিংসতা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার এবং বৈশ্বিক মানবাধিকারের বিস্তৃত প্রশ্নগুলোও সংস্থার কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পায়।

বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সে সময় তার নেতৃত্বকে মানবাধিকার আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে মূল্যায়ন করেছিল। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান এবং রয়টার্স বিভিন্ন সময়ে তার সাক্ষাৎকার ও বক্তব্যে তাকে বৈশ্বিক মানবাধিকার আন্দোলনের অন্যতম প্রভাবশালী কণ্ঠ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তার নেতৃত্বে অ্যামনেস্টি নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে প্রথম বৈশ্বিক প্রচারণা শুরু করে, যা পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচিত হয়।

অ্যামনেস্টি ছাড়ার পর ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ল অর্গানাইজেশনের (আইডিএলও) মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আইনের শাসন, ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ১৬ নম্বর লক্ষ্য বাস্তবায়নে তার ভূমিকা আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়। জাতিসংঘের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

বর্তমানে তিনি জাতিসংঘের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সুরক্ষাবিষয়ক বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৯৩ সালে এ বিশেষ ম্যান্ডেট চালুর পর তিনিই প্রথম নারী, যিনি এ দায়িত্ব পেয়েছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে সাংবাদিকের নিরাপত্তা, অনলাইন স্বাধীনতা, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি এবং মানবাধিকার রক্ষাকারীদের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। বিভিন্ন দেশের সরকারকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার গ্রহণযোগ্যতার আরেকটি বড় দিক হলো, তিনি কেবল মানবাধিকারকর্মী নন; একই সঙ্গে একজন নীতিনির্ধারক, গবেষক, শিক্ষক এবং লেখক। বর্তমানে জেনেভার গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে শিক্ষকতা করছেন। তার সহলিখিত বই The Unheard Truth: Poverty and Human Rights সাতটি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে এবং মানবাধিকার ও দারিদ্র্যের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনায় এটি উল্লেখযোগ্য অবদান হিসেবে বিবেচিত হয়।

তিনি বিশ্বব্যাংকের জেন্ডার অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল, ইউএনএইডসের মানবাধিকারবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের প্যানেল, ইউএন গ্লোবাল কমপ্যাক্ট অ্যাডভাইজরি কাউন্সিলসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (ওডিআই), বাংলাদেশের ব্র্যাক এবং উগান্ডার বেয়ারফুট ল–এর পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

তার নিয়োগের খবর প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের আলোচনা শুরু হয়। কিছু ব্যবহারকারী দাবি করেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানের আত্মীয় হওয়ায় এ নিয়োগ পেয়েছেন।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করে, জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, বহুপক্ষীয় কূটনীতির অভিজ্ঞতা, জাতিসংঘ ব্যবস্থার সঙ্গে দীর্ঘ সম্পৃক্ততা এবং বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে বিবেচনায় আইরিন খানের অভিজ্ঞতা তাকে স্বাভাবিকভাবেই শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

বাংলাদেশের কূটনীতির সামনে বর্তমানে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। জলবায়ু অর্থায়ন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ, রোহিঙ্গা সংকট, শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের ভূমিকা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতা—এসব প্রশ্নে জাতিসংঘে বাংলাদেশের অবস্থান আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরতে হবে। একই সঙ্গে মানবাধিকারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আলোচনাতেও বাংলাদেশকে ভারসাম্যপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য অবস্থান উপস্থাপন করতে হয়।

এ প্রেক্ষাপটে আইরিন খানের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে তার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং জাতিসংঘ ব্যবস্থার ভেতরের কাজ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা। তিনি বহু বছর ধরে যেসব বৈশ্বিক আলোচনায় অংশ নিয়েছেন, সেগুলোর অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে সহায়তা করতে পারে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

অবশ্য নতুন দায়িত্বে তার সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। একজন স্বাধীন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ হিসেবে তার অতীত ভূমিকা এবং একটি রাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে ভবিষ্যৎ দায়িত্ব—দুই ভূমিকায় দায়িত্বের ধরন ভিন্ন। জাতিসংঘের বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার হিসেবে তিনি স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ করতেন; কিন্তু রাষ্ট্রদূত হিসেবে তাকে বাংলাদেশের সরকারি অবস্থানই তুলে ধরতে হবে। ফলে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও রাষ্ট্রীয় কূটনীতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হবে।

মানবাধিকার নিয়ে তার দীর্ঘ কাজের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার পরিচিতি যেমন শক্তিশালী, তেমনি বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় সেই অভিজ্ঞতাকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের উন্নয়ন, জলবায়ু ঝুঁকি, রোহিঙ্গা সংকট এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার মতো ইস্যুতে কার্যকর কূটনৈতিক নেতৃত্ব দেওয়ার প্রত্যাশাও থাকবে তার প্রতি।

২০০৬ সালে মানবাধিকার রক্ষায় অবদানের জন্য সিডনি পিস প্রাইজসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সম্মাননা পেয়েছেন আইরিন খান। বাংলাদেশের জন্ম নেওয়া এ আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব যুক্তরাজয়ের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় এবং হার্ভার্ড ল স্কুলে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন। দীর্ঘ আন্তর্জাতিক কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে এবার তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক মঞ্চে।

বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে আনার নজির খুব বেশি নেই। সে দিক থেকে আইরিন খানের নিয়োগ একটি নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। তার সাফল্যের চূড়ান্ত মূল্যায়ন অবশ্য নির্ভর করবে দায়িত্ব গ্রহণের পর জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা দক্ষতার সঙ্গে তিনি তুলে ধরতে পারেন এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতির জটিল বাস্তবতায় কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হন, তার ওপর।

আইরিন খান

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250