সোমবার, ২১শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৬ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** বাড়ছে হুতিদের হামলা, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির মুখে ইরানের হুঁশিয়ারি *** জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কের পথে প্রধানমন্ত্রী *** সাগরে শক্তিশালী হচ্ছে লঘুচাপ, ৬ অঞ্চলে ৬০ কিমি ঝড়ের আভাস *** আশুলিয়ায় সিলিন্ডার বিস্ফোরণে যেভাবে ছড়াল আগুন *** আশুলিয়ায় কাভার্ড ভ্যান থেকে ৬ লাশ উদ্ধার *** জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রথম স্ত্রীসহ থানায় এমপি নজরুল *** সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে বাড়ল ২০ টাকা *** কমলাপুর রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনে আগুন *** শিল্পকলা একাডেমির সামনে ককটেল বিস্ফোরণ, পল্লবীতে বাসে আগুন *** ন্যাম ভবন থেকে সাতক্ষীরার এমপি নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধার

সুখবর এক্সপ্লেইনার

পরিস্থিতি অনুকূলে না এলে শেখ হাসিনা ফেরার নতুন সময়সীমা ঘোষণা করতে পারেন

প্রণব সাহা

🕒 প্রকাশ: ১১:৫৪ অপরাহ্ন, ১৪ই জুলাই ২০২৬

#

ছবি: আজকের পত্রিকা

গত ১০ জুলাই আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন, তিনি আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান। ওই বক্তব্য প্রকাশের পর থেকেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। সরকার, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং বিশ্লেষকেরা বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করেন। এই প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বিবিসি বাংলা ‘শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বাস্তবতা কতটা’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

সেখানে বর্তমান রাজনৈতিক ও আইনি বাস্তবতার আলোকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এবং রাজনৈতিক সমঝোতার প্রশ্ন নিয়ে দুই বিশ্লেষকের মতামত তুলে ধরা হয়েছে।

রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, তিনি দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হতে চান এবং জনগণই শেষ পর্যন্ত তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। তবে এই ঘোষণার পরপরই প্রশ্ন উঠেছে—বর্তমান বাস্তবতায় তার দেশে ফেরা কতটা সম্ভব? কারণ, গত দুই বছরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে।

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় ব্যাপক জনরোষের মুখে দেশ ছাড়তে হয়েছিল শেখ হাসিনাকে। এরপর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তার বিরুদ্ধে বিচার শুরু হয় এবং গত বছরের নভেম্বরে অনুপস্থিত অবস্থায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একই বছরের মে মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগ এবং দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অধ্যাদেশ জারি করা হয়। পরবর্তীতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর জাতীয় সংসদেও সেই অধ্যাদেশ অনুমোদন পায়। ফলে আইনগতভাবে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ বর্তমানে নেই।

শুধু রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞাই নয়, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন আদালতে বিপুলসংখ্যক মামলাও রয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ছাত্র–জনতার হত্যাকারী, হত্যার নির্দেশদাতা ও ইন্ধনদাতাদের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে মোট ১ হাজার ৭৮৫টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৬৩টি মামলায় শেখ হাসিনাকে আসামি করা হয়েছে। মোট ৮৩৭টি হত্যা মামলার মধ্যে ৪৫৩টিতে তার নাম রয়েছে। এই পরিসংখ্যানই ইঙ্গিত করে, দেশে ফিরলে তাকে একাধিক আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।

বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিশিষ্ট সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোজাম্মেল হোসেন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি আওয়ামী লীগের জন্য এবং শেখ হাসিনার দেশে ফেরার জন্য ‘খুবই, খুবই প্রতিকূল’। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিশেষ ধরনের রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বড় অংশই দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। অন্যদিকে দলটির কার্যক্রম আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে চলমান দলবদ্ধ সহিংসতা ও মব–সংস্কৃতির বিষয়টিও আওয়ামী লীগের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেনি।

তবে মোজাম্মেল হোসেনের মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা কেবল একটি নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি তার রাজনৈতিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতার অংশ। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, আন্দোলনের ক্ষেত্রে সব পরিস্থিতি অনুকূল হওয়ার অপেক্ষা করা হয় না। যদি নির্ধারিত সময়ে দেশে ফেরা সম্ভব না হয়, তাহলে তিনি নতুন একটি সময়সীমা ঘোষণা করতেও পারেন। তার ভাষায়, পরিস্থিতি যদি এমন হয় যে ডিসেম্বরে ফেরা সম্ভব হলো না, তাহলে তিনি আরেকটি তারিখ দেবেন—এটিও রাজনৈতিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই দেখা উচিত।

মোজাম্মেল হোসেন আরও বলেন, গত দুই বছরে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও ইতিহাসের ওপর যেভাবে আঘাত এসেছে, তাতে সাধারণ মানুষের একটি অংশের কাছে শেখ হাসিনার অতীতের রাজনৈতিক ভুলের গুরুত্ব কিছুটা কমে গেছে। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে যে দ্রুত বিচার হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক মহলের কাছে পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য হয়নি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত—শেখ হাসিনার এমন অভিযোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. সাব্বির আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরা—এই দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখতে হবে। তার মতে, আওয়ামী লীগ যেহেতু আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তাই দলটিকে রাজনীতিতে ফিরতে হলে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সেই নিষেধাজ্ঞা চ্যালেঞ্জ করতে হবে। কিন্তু শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে দেশে ফিরতে চাইলে তাকে বাধা দেওয়ার সুযোগ খুব বেশি নেই। বরং দেশে ফিরলে তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।

সাব্বির আহমেদের মতে, গণমাধ্যমে নিজেই দেশে ফেরার ঘোষণা দেওয়ার মধ্যেও একটি রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। তিনি বলেন, এ ধরনের ঘোষণা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সরকারের ওপর একটি চাপ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ, তাকে দেশে ফিরতে দেওয়া হবে কি না, অথবা ফিরলে তার সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করা হবে—এ প্রশ্ন আন্তর্জাতিকভাবেও আলোচনায় আসতে পারে।

তবে তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক বাস্তবতার বিচারে আওয়ামী লীগের সামনে সবচেয়ে বড় সংকট হলো জনসমর্থনের প্রশ্ন। জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনীতি কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে—একটি আওয়ামী লীগপন্থী এবং অন্যটি আওয়ামী লীগবিরোধী। আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি দলটিকে আবার রাজনীতিতে দেখতে চায় না। ফলে দলটির পক্ষে স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফিরে আসা সহজ হবে না।

ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, ধরেও যদি নেওয়া হয় আওয়ামী লীগের ৩০ শতাংশ সমর্থক এখনো রয়েছে, তবুও বাকি বড় অংশ তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান করছে। ফলে এই মুহূর্তে সেই সমর্থকদের একত্রিত করেও শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা বা আওয়ামী লীগকে স্বাভাবিক রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার মতো বাস্তবতা তৈরি হয়নি। তার মতে, স্বাভাবিক রাজনীতিতে ফিরতে হলে আওয়ামী লীগকে শেষ পর্যন্ত সমঝোতার রাজনীতির পথেই হাঁটতে হবে। তবে সেই সমঝোতা কখন, কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় হবে, তা সময়ই বলে দেবে।

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, গত প্রায় দুই বছরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যাপকসংখ্যক মামলা হয়েছে এবং অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দেশের ভেতরে থাকা বহু নেতাকর্মী আত্মগোপনে রয়েছেন। বিভিন্ন সময় ঝটিকা মিছিল বা সাংগঠনিক তৎপরতা চালানোর চেষ্টা করলেও অনেককে আটক করা হয়েছে। ফলে সাংগঠনিক দিক থেকেও দলটি বর্তমানে কঠিন সংকটের মধ্যে রয়েছে।

এই বাস্তবতায় শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা বাস্তবায়ন হবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। একদিকে রয়েছে তার বিরুদ্ধে শত শত মামলা, মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং আওয়ামী লীগের ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা। অন্যদিকে রয়েছে তার নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা এবং দেশে ফেরার ঘোষণা। বিবিসি বাংলার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, বর্তমান পরিস্থিতি শেখ হাসিনার জন্য অনুকূল নয়—তবে তার রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেশে ফেরার সময়সীমা পুনর্নির্ধারণের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা কেবল একটি সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের প্রশ্ন নয়; বরং দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, আইনি কাঠামো, আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ—সবকিছুর সঙ্গেই বিষয়টি নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। তাই আগামী কয়েক মাসে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় এবং শেখ হাসিনা তার ঘোষণায় অটল থাকেন কি না, নাকি পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন সময়সীমা ঘোষণা করেন—সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে উঠেছে।

মোজাম্মেল হোসেন সাব্বির আহমেদ

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250