রবিবার, ৬ই সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২২শে ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনগণকে সম্পৃক্ত করে পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদারের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর *** ইইউর ৬১ বাণিজ্য বাধার ৪৮টিরই সমাধান করা হয়েছে: বাণিজ্যমন্ত্রী *** সাংস্কৃতিক ঐক্যই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শক্তি: সংস্কৃতিমন্ত্রী *** নিখোঁজ শিশুদের জন্য পুলিশের বিশেষ সেল গঠনের দাবি স্বজনদের *** রোহিঙ্গা ইস্যু যেন অন্য কোনো সংকটে চাপা না পড়ে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী *** রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথমবার জন্মভূমি ঠাকুরগাঁওয়ে মির্জা ফখরুল, বিকেলে নাগরিক সংবর্ধনা *** শেষকৃত্য সম্পন্ন করার ১৫ দিন পর কারাগার থেকে ফোনকল—‘আপনার ছেলে জীবিত’ *** ফের সোনার দামে পতন, ভরিতে কত *** মিসরে মাদক মামলায় টিভি উপস্থাপকসহ ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড *** গোপালগঞ্জে বাস খাদে পড়ে নিহত ৩, আহত ৩০

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে পালাবদল ও উত্থান-পতনের অন্তর্গত বাস্তবতা

শাওন দত্ত

🕒 প্রকাশ: ০৮:০৪ অপরাহ্ন, ১৫ই মে ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

ভারতের সীমান্তঘেঁষা গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদল শুধু ভারতেই নয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মাঝেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর সহিংসতা, সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, রাজনৈতিক কার্যালয়ে ভাঙচুর এবং সামাজিক উত্তেজনার ঘটনাগুলো উদ্বেগ তৈরি করেছে উপমহাদেশজুড়ে।

এ পরিস্থিতিকে সামনে রেখে বিশিষ্ট সাংবাদিক, সমাজচিন্তক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সৈয়দ তোশারফ আলী একটি গভীর পর্যবেক্ষণধর্মী বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন, যেখানে তিনি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক, আদর্শিক ও সাংগঠনিক কারণগুলো তুলে ধরেছেন।

দৈনিক যুগান্তরের মুদ্রিত সংস্করণে গতকাল বৃহস্পতিবার (১৪ মে) প্রকাশিত লেখায় বীর মুক্তিযোদ্ধা তোশারফ আলী শুরুতেই পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, যে ভারতকে দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্র ও বহুত্ববাদের উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়েছে, সেখানে উগ্রপন্থি আচরণ এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বিশেষ করে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও দোকানপাটে হামলার ঘটনা তাকে মর্মাহত করেছে। তার মতে, রাজনৈতিক বিজয় কখনো প্রতিপক্ষকে দমন করার লাইসেন্স হতে পারে না; বরং বিজয়ী পক্ষের দায়িত্ব হচ্ছে ধৈর্য, সহনশীলতা ও মহানুভবতার পরিচয় দেওয়া।

তোশারফ আলী ভারতের নির্বাচন কমিশনের অতীত সুনামের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন। দক্ষিণ এশিয়ায় গণতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ভারতকে দীর্ঘদিন অনুসরণীয় উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে ইভিএম নিয়ে প্রশ্ন, ভোট কারচুপির অভিযোগ এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক নতুন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে।

তিনি এটাও মনে করিয়ে দেন যে, ভারতে শক্তিশালী বিচারব্যবস্থা ও ট্রাইব্যুনাল ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে এসব অভিযোগ বিচারিকভাবে নিষ্পত্তির সুযোগ আছে। তিনি ভারতীয় বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ঐতিহ্যের প্রতিও আস্থা প্রকাশ করেন।

প্রবীণ সাংবাদিক ও লেখক তোশারফ আলীর বিশ্লেষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তিনি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে শুধু নির্বাচনি কারচুপি বা প্রশাসনিক প্রভাবের ফল হিসেবে দেখেননি। তার মতে, এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি আদর্শিক ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি। তিনি উল্লেখ করেন, ভারতের রাজনীতিতে “গেরুয়া রাজনীতি” হঠাৎ করে প্রতিষ্ঠিত হয়নি; বরং এটি বহু বছরের সাংগঠনিক কাজ, মতাদর্শিক প্রচার এবং রাজনৈতিক কৌশলের ফল।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, প্রথমে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ঐতিহাসিক রাজনৈতিক শক্তি কংগ্রেসকে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা থেকে সরানো হয়। এরপর ধীরে ধীরে বিভিন্ন রাজ্যে বামপন্থি রাজনীতির প্রভাব কমতে থাকে। এই শূন্যস্থানে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদকে সামনে এনে বিজেপি নিজেদের ভিত্তি শক্তিশালী করে।

তোশারফ আলীর মতে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও যখন বামপন্থার প্রভাব কমতে থাকে, তখন দক্ষিণপন্থি ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান বিশ্বজুড়েই লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। ভারতও সেই প্রবণতার বাইরে ছিল না।

তিনি আরও বলেন, ভারতীয় সমাজে ধর্ম বরাবরই একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উপাদান হিসেবে কাজ করেছে। ফলে “নির্ভেজাল ধর্মনিরপেক্ষতা” বাস্তবে কতটা কার্যকর ছিল, সে প্রশ্নও তিনি তুলেছেন। তার ভাষ্যে, কংগ্রেস কিংবা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস কখনো পুরোপুরি ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক ধারা অনুসরণ করতে পারেনি। আবার বামপন্থিরাও সর্বভারতীয় পর্যায়ে কখনো এমন শক্তিশালী জনসমর্থন গড়ে তুলতে পারেনি, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উত্থান প্রসঙ্গে তোশারফ আলী বলেন, তিনি মূলত বামপন্থি রাজনীতির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলনের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। কেন্দ্রীয় সরকারের বঞ্চনার অভিযোগ তুলে ধরে জনসমর্থন ধরে রাখার কৌশল দীর্ঘদিন কার্যকর ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই কৌশল দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ, তার সরকারের অধীনে স্থানীয় পর্যায়ে দুর্নীতি, দলীয় নেতাকর্মীদের দৌরাত্ম্য এবং প্রশাসনিক অরাজকতা সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে।

তোশারফ আলী বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, স্থানীয় পর্যায়ের দুর্নীতির ঘটনাগুলো বিজেপি-ঘনিষ্ঠ মিডিয়া সফলভাবে জনমনে তুলে ধরেছে। এর ফলে তৃণমূল সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একইসঙ্গে নারী নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও জনমনে বিরূপ প্রভাব ফেলে। কলকাতার আরজি কর হাসপাতালের নৃশংস ঘটনার উদাহরণ টেনে তিনি দেখিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধে আঘাত হেনেছে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, এসআইআর-সংক্রান্ত দুর্ভোগ ও হয়রানি থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতেও মমতা সরকার ব্যর্থ হয়েছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের ওয়াকফ সম্পত্তি সুরক্ষার প্রশ্নেও সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে সংখ্যালঘুদের রক্ষাকর্তা হিসেবে যে রাজনৈতিক ভাবমূর্তি তৃণমূল কংগ্রেস দীর্ঘদিন ধরে ধরে রেখেছিল, তাতেও ফাটল দেখা দেয়।

তোশারফ আলীর পর্যবেক্ষণে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ার অভিযোগ। তিনি উল্লেখ করেন, প্রায় এক কোটি ভোটারের নাম বাদ দিয়ে নির্বাচন আয়োজনের ফলে ফলাফল বিজেপির অনুকূলে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। যদিও তিনি সরাসরি নির্বাচনকে অবৈধ বলেননি, তবে নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে জনমনে যে সংশয় তৈরি হয়েছে, তা তার লেখায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

বিশ্লেষণের শেষাংশে তিনি সতর্ক করে দেন যে, বিজয়ের পর প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করতে ভয়ভীতি ও আতঙ্কের রাজনীতি গ্রহণ করা হলে তা গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত হয়ে উঠবে। একজন শুভাকাঙ্ক্ষী প্রতিবেশী দেশের নাগরিক হিসেবে তিনি পশ্চিমবঙ্গে সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও রাজনৈতিক সহাবস্থানের পরিবেশ ফিরে আসার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

সৈয়দ তোশারফ আলীর এই বিশ্লেষণের বিশেষত্ব হলো, তিনি আবেগ নয়, বরং রাজনৈতিক বাস্তবতা, ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা ও সামাজিক মনস্তত্ত্বের আলোকে ঘটনাগুলো ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। তার লেখনীতে যেমন রয়েছে গণতন্ত্র ও মানবিকতার প্রতি দায়বদ্ধতা, তেমনি রয়েছে উপমহাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত প্রজ্ঞার ছাপ।

রাজনৈতিক ঘটনাকে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে দাঁড়িয়ে বিশ্লেষণ করার যে দক্ষতা তিনি দেখিয়েছেন, তা সমকালীন সাংবাদিকতায় ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে। একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে তার পর্যবেক্ষণ গভীর, ভারসাম্যপূর্ণ এবং চিন্তাশীল পাঠকদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান।

সৈয়দ তোশারফ আলী

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনগণকে সম্পৃক্ত করে পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদারের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

🕒 প্রকাশ: ০৪:৫৪ অপরাহ্ন, ৬ই সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইইউর ৬১ বাণিজ্য বাধার ৪৮টিরই সমাধান করা হয়েছে: বাণিজ্যমন্ত্রী

🕒 প্রকাশ: ০৪:৪৯ অপরাহ্ন, ৬ই সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাংস্কৃতিক ঐক্যই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শক্তি: সংস্কৃতিমন্ত্রী

🕒 প্রকাশ: ০৪:৪৪ অপরাহ্ন, ৬ই সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিখোঁজ শিশুদের জন্য পুলিশের বিশেষ সেল গঠনের দাবি স্বজনদের

🕒 প্রকাশ: ০৪:৩৯ অপরাহ্ন, ৬ই সেপ্টেম্বর ২০২৬

রোহিঙ্গা ইস্যু যেন অন্য কোনো সংকটে চাপা না পড়ে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

🕒 প্রকাশ: ০৪:৩৩ অপরাহ্ন, ৬ই সেপ্টেম্বর ২০২৬

Footer Up 970x250