তেহরানে একটি বড় পর্দায় ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনির ছবি দেখানো হচ্ছে। ৯ই মার্চ, ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানে ধারাবাহিকভাবে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। এবারের হামলার শুরুতে নিহত হন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তারপর থেকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নিয়ে নানা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল। সম্ভাব্য অনেকের নাম উঠে এসেছিল তালিকায়। তবে গতকাল রোববার (৮ই মার্চ) ইরান তাদের নতুন সর্বোচ্চ নেতার নাম ঘোষণা করেছে। আর তিনি হলেন আলি খামেনি পুত্র মুজতবা আলি।
ইরানের এই সিদ্ধান্তে বোঝা যাচ্ছে, তেহরানের ক্ষমতায় এখনো কট্টরপন্থীরা নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। অন্যদিকে ইসরায়েল আগে থেকেই নতুন সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছে।
ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের বিমান হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া ৫৬ বছর বয়সী মুজতবা খামেনি মধ্যম পর্যায়ের ধর্মীয় নেতা। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার এক সপ্তাহের বেশি সময় পর তাকে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করা হলো।
এর আগে দেশটির বিশেষজ্ঞ পর্ষদের সদস্য আয়াতুল্লাহ মোহসেন হায়দারি আলকাসির রোববার এক ভিডিও বার্তায় বলেছিলেন, আলি খামেনির দিয়ে যাওয়া নির্দেশনার ভিত্তিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ঠিক করা হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, সর্বোচ্চ নেতা এমন একজন হওয়া উচিত যাকে ‘শত্রুরা ঘৃণা করে’।
তিনি বলেন, ‘এমনকি বড় শয়তানও (যুক্তরাষ্ট্র) যাকে ঘৃণা করে সেই হবে সর্বোচ্চ নেতা।’ এর কয়েকদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, মুজতবা তার কাছে ‘গ্রহণযোগ্য’ ব্যক্তি নন।
মুজতবা তার বাবার শাসনামলে নিরাপত্তা বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার চেষ্টাকালে তিনি সংস্কারপন্থীদের বিরোধিতা করেছিলেন।
ইরানের অভিজাত সামরিক বাহিনী বিপ্লবী রক্ষী বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তাকে দেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর বিভিন্ন স্তরে অতিরিক্ত প্রভাব দিয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো জানিয়েছে, তিনি পর্দার আড়ালে বাবার ‘গেটকিপার’ হিসেবে প্রভাব বিস্তার করে গেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নীতি সংস্থা ইউনাইটেড এগেনেস্ট নিউক্লিয়ার ইরান-এর গবেষণা বিভাগের প্রধান কাসরা আরাবি বলেন, বিশেষ করে আইআরজিসির তরুণ কট্টরপন্থী প্রজন্মের মধ্যে তার ভালো সমর্থন আছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। বিশেষ করে বিদেশনীতি ও পারমাণবিক কর্মসূচিতে।
পশ্চিমা শক্তিগুলো চায় ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে। তবে ইরান বলছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল বেসামরিক কাজে ব্যবহারের জন্য।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, মুজতবা খামেনি ইরানের জনগণের একটি অংশের বিরোধিতার মুখে পড়তে পারেন। বিশেষ করে যারা অতীতে রক্তক্ষয়ী দমন–পীড়নের পরও বিক্ষোভ করেছেন।
তিনি ১৯৬৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। যুবক বয়সে ইরান-ইরাক যুদ্ধে অংশ নেন। মুজতবা ইরানের শিয়া ধর্মতাত্ত্বিক শিক্ষার কেন্দ্র কোম মাদরাসাগুলোতে রক্ষণশীল ধর্মীয় আলেমদের কাছে পড়ালেখা করেন এবং তার ধর্মীয় মর্যাদা ‘হুজ্জাতুল ইসলাম’।
তিনি কখনো ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক পদে ছিলেন না। কখনো কখনো তাকে সরকারপন্থী সমাবেশে দেখা গেছে। তবে জনসমক্ষে খুব কম কথা বলেছেন।
ইরানে তার ভূমিকা নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে বিতর্ক আছে। পশ্চিমা সমালোচকেরা মনে করেন, ১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র–সমর্থিত রাজতন্ত্র উৎখাত করা দেশে আবার পারিবারিক শাসনের ইঙ্গিত গ্রহণযোগ্য নয়।
২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ মুজতবার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তাদের মতে, তিনি তার বাবার দপ্তরে কাজ করা ছাড়া কখনো নির্বাচিত বা নিয়োগপ্রাপ্ত কোনো সরকারি পদে না থেকেও বাস্তবে সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধিত্ব করতেন।
তাদের ওয়েবসাইটে বলা হয়, খামেনি তার কিছু দায়িত্ব আগে মুজতবার কাছে অর্পণ করেছিলেন। সেখানে বলা হয়, তিনি আইআরজিসির কুদস ফোর্স এবং আধাসামরিক বাসিজ বাহিনীর কমান্ডারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন।
বাসিজ হলো গার্ড বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত একটি বাহিনী। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি তার বাবার আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সহায়তা করেছেন।
২০২২ সালে পুলিশ হেফাজতে এক তরুণীর মৃত্যুর ঘটনায় ইরানে বিক্ষোভ শুরু হলে মুজতবা সমালোচনার প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। ওই তরুণীকে পোশাকবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
এরপর ২০২৪ সালে একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দেখা যায় তিনি কোম শহরে পড়ানো ইসলামি আইনবিষয়ক ক্লাস স্থগিতের ঘোষণা দিচ্ছেন। এতে এর পেছনের কারণ নিয়ে নানা জল্পনা তৈরি হয়। মুজতবা দেখতে অনেকটাই তার বাবার মতো এবং তিনি কালো পাগড়ি পরেন।
সমালোচকেরা বলেন, তার ধর্মীয় মর্যাদা সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। ‘হুজ্জাতুল ইসলাম’ পদমর্যাদা ‘আয়াতুল্লাহ’র নিচে। অথচ তার বাবা ও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা রুহুল্লাহ খোমেনি আয়াতুল্লাহ ছিলেন।
তবু তিনি সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে আলোচনায় ছিলেন, বিশেষ করে আরেক সম্ভাব্য প্রার্থী সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি ২০২৪ সালে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার পর।
২০০৭ সালে লেখা একটি মার্কিন কূটনৈতিক বার্তায় তিনটি ইরানি সূত্র মুজতবাকে খামেনির কাছে পৌঁছানোর একটি পথ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। পরে এই তথ্য উইকিলিকস প্রকাশ করে।
অনেকে বিশ্বাস করেন, ২০০৫ সালে কট্টরপন্থী রাজনীতিক মাহমুদ আহমেদিনেজাদের হঠাৎ উত্থানের পেছনেও মুজতবার ভূমিকা ছিল। মুজতবার স্ত্রী গত শনিবারের বিমান হামলায় নিহত হন। তার স্ত্রী ছিলেন সাবেক পার্লামেন্ট স্পিকার গোলামআলি হাদ্দাদাদেলের মেয়ে।
ইরানের ৮৮ সদস্যের বিশেষজ্ঞ পর্ষদ জনগণকে ঐক্য ধরে রাখতে এবং মুজতবা খামেনিকে সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। রোববার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত এক বিবৃতিতে পর্ষদ জানায়, ভোটের ভিত্তিতে তাকে নির্বাচন করা হয়েছে।
মুজতবা কখনো প্রকাশ্যে উত্তরাধিকার প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করেননি। কারণ, তার ক্ষমতায় আসা নিয়ে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের আগে পাহলভি রাজতন্ত্রের মতো পারিবারিক শাসন ব্যবস্থা জড়িয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
তিনি সাধারণত নিজেকে একটু আড়ালেই রাখতেন। তাকে জনসভা, জুমার খুতবা বা রাজনৈতিক ভাষণ দিতে তেমন দেখা যায় না। ফলে অনেক ইরানি তার কণ্ঠও কখনো শোনেননি।
জে.এস/
খবরটি শেয়ার করুন