ছবি: দ্য গার্ডিয়ান
ব্রিটেনে মুসলিমবিরোধী ঘৃণাজনিত অপরাধ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গণমাধ্যমে মুসলিমদের নিয়ে পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদনের সংখ্যাও বেড়েছে। এমনটাই বলছে একটি নতুন গবেষণা। গণমাধ্যমে মুসলিম ও ইসলামকে কীভাবে উপস্থাপন করা হয়, তা পর্যবেক্ষণকারী অলাভজনক সংস্থা সেন্টার ফর মিডিয়া মনিটরিংয়ের প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, সেন্টার ফর মিডিয়া মনিটরিং ৩০টি সংবাদমাধ্যমের প্রায় ৪০ হাজার নিবন্ধ বিশ্লেষণ করেছে। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ নিবন্ধে মুসলিম বা ইসলামকে নেতিবাচক বিষয় বা আচরণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্যে মুসলিমদের নিয়ে প্রকাশিত প্রায় অর্ধেক নিবন্ধ—অর্থাৎ প্রায় ২০ হাজার প্রতিবেদনে—‘উচ্চমাত্রার পক্ষপাত’ পাওয়া গেছে।
সংস্থাটির পরিচালক রিজওয়ান হামিদ বলেন, ‘যুক্তরাজ্যে এ ধরনের সবচেয়ে বড় গবেষণা হিসেবে এই প্রতিবেদনটি দেখাচ্ছে—দেশটির সংবাদমাধ্যমে মুসলিমদের উপস্থাপনের ক্ষেত্রে গভীর কাঠামোগত পক্ষপাতের উদ্বেগজনক প্রমাণ রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এই তথ্যগুলো আমাদের গণমাধ্যম ব্যবস্থার ভেতরে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। যখন একটি সম্পূর্ণ সম্প্রদায়কে বারবার সন্দেহ বা হুমকির দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরা হয়, তখন তা অনিবার্যভাবেই জনমত, রাজনৈতিক বিতর্ক এবং ব্রিটিশ মুসলিমদের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে।’
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রিটেনে ডানপন্থী ভোটারদের উদ্বেগ ও স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া সংবাদমাধ্যমগুলো মুসলিমদের নিয়ে পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদন প্রকাশের সম্ভাবনা বেশি দেখিয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, দ্য স্পেকটেটর ম্যাগাজিন এবং জিবি টেলিভিশন চ্যানেল পক্ষপাতের পাঁচটি বিভাগেই সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে। এই বিভাগগুলো হলো—নেতিবাচক প্রতিবেদন, জেনারেলাইজেশন বা সাধারণীকরণ, ভুল উপস্থাপন, প্রাসঙ্গিক তথ্য বাদ দেওয়া এবং সমস্যাযুক্ত শিরোনাম। এ ছাড়া দ্য টেলিগ্রাফ, জিউয়িশ ক্রনিকল, ডেইলি এক্সপ্রেস, দ্য সান, ডেইলি মেইল এবং দ্য টাইমসের মতো পত্রিকাগুলোর নামও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এই সংবাদমাধ্যমগুলোর ক্ষেত্রে ক্ষতিকর কাভারেজ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।’
অন্যদিকে যেসব সংবাদমাধ্যম মুসলিম ও তাদের ধর্মকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম পক্ষপাত দেখিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে আইটিভি, মেট্রো, বিবিসি, পিএ মিডিয়া, দ্য গার্ডিয়ান, এসোসিয়েটেড প্রেস, লন্ডন ইভনিং স্ট্যান্ডার্ড এবং স্কাই নিউজ।
গবেষণাটি এমন এক সময় প্রকাশিত হলো, যখন ব্রিটেনজুড়ে মুসলিমরা ক্রমবর্ধমান বৈরিতার মুখোমুখি। এর পেছনে আংশিকভাবে দায়ী কঠোর ডানপন্থী জননেতাদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি এবং অভিবাসনবিরোধী মনোভাবের বিস্তার। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বিস্তৃত গবেষণা দেখিয়েছে যে মুসলিমদের নেতিবাচক উপস্থাপনার সঙ্গে ঘৃণাজনিত অপরাধ বৃদ্ধি, চাকরিক্ষেত্রে বৈষম্য এবং কঠোর নীতিমালার প্রতি সমর্থনের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে।’
গত অক্টোবর যুক্তরাজ্য জানায়, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক অপরাধ আগের সময়ের তুলনায় ১৯ শতাংশ বেড়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৪ সালে সাউথপোর্ট শহরে মেয়েদের নৃত্যশিক্ষার একটি ক্লাসে সংঘটিত গণছুরিকাঘাতের ঘটনার পর মুসলিমবিদ্বেষী অপরাধ হঠাৎ বেড়ে যায়। সামাজিক মাধ্যমে কিছু উসকানিদাতা এই হামলার জন্য একটি কাল্পনিক মুসলিম অভিবাসীকে দায়ী করেছিল।
সাম্প্রতিক সময়ে মসজিদগুলোও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। একই সঙ্গে ব্রিটিশ মুসলিম ও অন্যান্য জাতিগত সংখ্যালঘুরা ক্রমবর্ধমান অনিরাপত্তা ও উদ্বেগের কথা জানাচ্ছেন। জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং কট্টর ডানপন্থী রিফর্ম ইউকে দলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সঙ্গে এই পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, যুক্তরাজ্যে যে ধরনের বর্ণবাদ আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তা ১৯৭০ ও ১৯৮০–এর দশকে দেখা বৈষম্যের স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার গত বছরের শেষ দিকে আইটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এই পরিস্থিতি ‘আমাদের দেশকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে।’
গবেষণায় বিশ্লেষিত একটি উদাহরণে সেন্টার ফর মিডিয়া মনিটরিং জানিয়েছে, ডানপন্থী কিছু গণমাধ্যম যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি দাবিকে জোরালোভাবে প্রচার করেছে। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, লন্ডন শহর নাকি ‘শরিয়া আইনে’ পরিচালিত হচ্ছে। গত সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি লন্ডনের দিকে তাকাই, যেখানে আপনারা একটি ভয়াবহ মেয়র পেয়েছেন, ভয়াবহ, ভয়াবহ মেয়র। শহরটি বদলে গেছে, ভীষণ বদলে গেছে। ... এখন তারা শরিয়া আইন চালু করতে চায়। কিন্তু আপনি অন্য একটি দেশে আছেন। আপনি সেটা করতে পারেন না।’
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেট্রো পত্রিকা এই দাবিটির সত্যতা যাচাই করে। আর দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যাসহ বিশ্লেষণ প্রকাশ করে। তবে ‘মতামতনির্ভর কিছু গণমাধ্যম, যেমন ডেইলি এক্সপ্রেস এই ষড়যন্ত্রতত্ত্বকে আরও এগিয়ে নিয়ে গিয়ে সেটিকে বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করেছে।’
সংস্থাটি বলেছে, ‘ভিত্তিহীন দাবিকে বিতর্কের বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা ভুল তথ্যকে স্বাভাবিক করে তোলে এবং মুসলিমবিরোধী বয়ানকে উসকে দেয়। এতে স্পষ্ট হয়, ভুল তথ্যকে দৃঢ়ভাবে চ্যালেঞ্জ করা গণমাধ্যমের দায়িত্ব; তা অনিচ্ছাকৃতভাবে বৈধতা দেওয়ার নয়।’
জে.এস/
খবরটি শেয়ার করুন