ছবি: সংগৃহীত
দেশের পুঁজিবাজারের প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)। প্রতিষ্ঠানটি এখন গভীর সংকটে পড়েছে। এর মূল দায়িত্ব ছিল শেয়ারবাজারে তারল্য সরবরাহ করা। বাজারের পতনে ঢাল হিসেবে দাঁড়ানোই ছিল এর কাজ। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা টিকিয়ে রাখত এই প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সেই আইসিবি এখন তীব্র মূলধন ও তারল্য সংকটে জর্জরিত।
অবস্থা এখন খুবই নাজুক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা নিয়েছিল আইসিবি। এই বিশেষ তহবিলের মেয়াদ শেষ হয়েছে। কিন্তু আইসিবি এই টাকা ফেরত দিতে পারছে না। উল্টো রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির মেয়াদ আরও তিন বছর বাড়ানোর আবেদন করেছে। তারা অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে এই আবেদন পাঠিয়েছে।
পরিসংখ্যান দেখলে এই সংকটের গভীরতা বোঝা যায়। পুঁজিবাজারে আইসিবির নিজস্ব বিনিয়োগ প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বাজার মন্দার কারণে এর বর্তমান মূল্য দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ, সরকার ও বিভিন্ন ব্যাংকের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের এক-তৃতীয়াংশই বাজারে ক্ষয়ে গেছে। এই বিশাল অনার্জিত ক্ষতি আইসিবির হিসাবখাতা দুর্বল করে দিয়েছে। শুধু সরকারি গ্যারান্টির মেয়াদ বাড়িয়ে এর স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
আইসিবির এই অবস্থার পেছনে একটি ভুল নীতি দায়ী। ২০১০ সালের শেয়ারবাজার ধসের পর থেকে এই ভুল শুরু হয়। বাজার যখনই পতনের মুখে পড়েছে, তখনই কৃত্রিমভাবে তা তোলার চেষ্টা হয়েছে। তৎকালীন সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এই চেষ্টা করে। আর এই কাজের প্রধান হাতিয়ার করা হয় আইসিবিকে।
আইসিবি নিজের বাণিজ্যিক লাভ-ক্ষতি বিবেচনা করেনি। চড়া সুদে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে তহবিল ধার করেছে তারা। সেই টাকা বাজারে বিনিয়োগ করেছে। উদ্দেশ্য ছিল বাজারের পতন রোধ করা। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা বাজারের কোনো উপকার করতে পারেনি। বরং আইসিবিকে এক ঋণের চোরাবালিতে ফেলেছে।
২০১০-১১ অর্থবছরে আইসিবির মোট ঋণ ছিল ২ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা প্রায় ছয় গুণ বেড়েছে। এখন ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ২৯৪ কোটি টাকায়। অথচ ২০১০-১১ অর্থবছরে আইসিবির পোর্টফোলিওর বাজারমূল্য ছিল ক্রয়মূল্যের দ্বিগুণ। এখন পোর্টফোলিওর অবক্ষয় দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের এই নীতিই আজ আইসিবিকে বিপদে ফেলেছে।
একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আয়ের চেয়ে সুদ ব্যয় বেশি হলে তা টিকতে পারে না। আইসিবির আর্থিক প্রতিবেদন এটিই প্রমাণ করে। শেয়ার থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ ও ক্যাপিটাল গেইন মিলিয়ে যা আয় হয়, তার সিংহভাগ চলে যায় সুদের পেছনে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিচালন ব্যয়। ক্ষয়ে যাওয়া বিনিয়োগের বিপরীতে প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হচ্ছে।
ফলে লোকসান দিন দিন বাড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি রেকর্ড ১ হাজার ২১৩ কোটি টাকা লোকসান করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই লোকসান হয়েছে ৫৮৮ কোটি টাকা। বিগত সরকারের পতনের পর সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ২ হাজার কোটি টাকা দিয়ে উচ্চ সুদের ঋণ শোধ করা হয়। এতে আইসিবির সুদ ব্যয় কিছুটা কমেছে।
কিন্তু মূল সমস্যা রয়েই গেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে নেওয়া ঋণের সুদ ‘ওভারডিউ’ বা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। এই সুদের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এই সুদ শোধ করার মতো নগদ টাকা আইসিবির কাছে নেই। এই কারণে ঋণদাতা ব্যাংকগুলোকেও (সোনালী, জনতা, অগ্রণী) প্রভিশন রাখতে হচ্ছে। এটি পুরো আর্থিক খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আইসিবির এই বিপর্যয়ের পেছনে কেবল বাজার মন্দা দায়ী নয়। প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ সুশাসন ও তহবিল ব্যবস্থাপনায় বড় ফাঁকফোকর ছিল। অতীতে আইসিবির পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট কমিটির কাজে তদারকি ছিল না। অভিযোগ আছে, বাজারসংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী চক্রের ইন্ধনে কিছু অসাধু কর্মকর্তা কাজ করেছেন। তারা অতিমূল্যায়িত বা ‘জাঙ্ক’ শেয়ার চড়া দামে কিনে আইসিবির পোর্টফোলিওতে যুক্ত করেন।
নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার জন্য তহবিল ব্যবহার করলে পরিণতি এমনই হয়। বর্তমান পর্ষদ অবশ্য তহবিল ব্যবস্থাপনায় কিছু পরিবর্তন এনেছে। ব্লক মার্কেট থেকে শেয়ার কেনা এখন বন্ধ। প্রতি ১৫ দিন পরপর বোর্ডে পোর্টফোলিও মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা দেওয়া হচ্ছে। সেকেন্ডারি মার্কেটে শুধু ‘এ’ ক্যাটাগরির শেয়ারে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। এই পদক্ষেপের কারণে নতুন ক্ষতি হয়তো ঠেকানো গেছে। কিন্তু অতীতে যে বিশাল ক্ষতি হয়েছে, তা এই সাময়িক তদারকি দিয়ে পূরণ সম্ভব নয়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ে দেওয়া চিঠিতে আইসিবি একটি আশঙ্কার কথা বলেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৩ হাজার কোটি টাকা ফেরত দিতে হলে আইসিবিকে শেয়ার বিক্রি করতে হবে। এই মুহূর্তে বাজারে থাকা শেয়ার বিক্রি করলে বড় বিপর্যয় ঘটবে। এমনিতেই দেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘ সময় ধরে তারল্য সংকটে ভুগছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থার অভাব রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে আইসিবি যদি ঋণ শোধের জন্য জোরপূর্বক শেয়ার বিক্রি শুরু করে, তবে বাজারে বড় পতন হবে। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে শেয়ার বিক্রি করে দেবেন। সরকারের জন্য এটি একটি বড় নীতিগত উভয়সংকট। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য টাকা ফেরত নেওয়া প্রয়োজন। আবার বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য আইসিবিকে চাপ দেওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ। তাই গ্যারান্টির মেয়াদ আরও তিন বছর বাড়ানোর আবেদন মেনে নেওয়া ছাড়া বিকল্প কম।
আইসিবিকে এই ঋণের ফাঁদ থেকে বের করার একটি প্রস্তাব এসেছে। এটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। আইসিবির প্রধান ঋণদাতা হলো রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংক। এই ব্যাংকগুলো আবার আইসিবির প্রধান শেয়ারহোল্ডার। আইসিবির প্রস্তাব হলো, ব্যাংকগুলোর এই পাওনা ঋণ ও মেয়াদোত্তীর্ণ সুদকে রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে আইসিবির ‘ইক্যুইটি’ বা শেয়ারে রূপান্তর করা হোক।
এই প্রক্রিয়াকে ডেট-টু-ইক্যুইটি সোয়াপ বলা হয়। এটি করা গেলে আইসিবির ওপর থেকে সুদের চাপ একঝটকায় কমে যাবে। আইসিবির ব্যালেন্স শিট শক্তিশালী হবে। প্রতি বছর ১ হাজার কোটি টাকার সুদ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে তারা রেহাই পাবে। ব্যাংকগুলোর জন্যও এটি দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক হতে পারে। আইসিবি খেলাপি হলে ব্যাংকের ক্ষতি। তার চেয়ে আইসিবির শেয়ারের মালিকানা বাড়লে ভবিষ্যতে বাজার ভালো হলে ব্যাংকগুলো লাভবান হবে। তবে এর জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসির যৌথ অনুমোদন প্রয়োজন।
আইসিবির বর্তমান সংকট আমাদের পুঁজিবাজারের কাঠামোগত দুর্বলতার প্রমাণ। একটি বাজার কখনো কেবল একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কৃত্রিম সহায়তায় চলতে পারে না। আইসিবিকে বারবার ‘ত্রাতা’ বানাতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
ভবিষ্যৎ করণীয় হিসেবে সরকারকে কেবল গ্যারান্টির মেয়াদ বাড়ালেই চলবে না। এই বাড়তি তিন বছর সময়কে সংস্কারের সুযোগ হিসেবে নিতে হবে। যেমন—
প্রথমত, ঋণকে শেয়ারে রূপান্তরের প্রস্তাবটি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। এতে সুদের ক্ষতিকর চক্র থেকে প্রতিষ্ঠানটি মুক্ত হবে।
দ্বিতীয়ত, আইসিবির তহবিল ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। অতীতে যারা নিম্নমানের শেয়ার কিনে ক্ষতি করেছে, তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
তৃতীয়ত, পুঁজিবাজারে আইসিবির একক নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। অন্যান্য বেসরকারি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, যেমন—মিউচুয়াল ফান্ড ও মার্চেন্ট ব্যাংককে সক্রিয় করতে হবে।
আইসিবিকে বাঁচানো কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বের লড়াই নয়। এটি দেশের লাখ লাখ সাধারণ বিনিয়োগকারীর আস্থা ও সামগ্রিক অর্থনীতির আর্থিক শৃঙ্খলার সঙ্গে জড়িত। সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এখন দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আইসিবি যেন আর ঋণের টাকায় বাজার ধরার হাতিয়ার না হয়। একে প্রকৃত অর্থেই একটি পেশাদার বিনিয়োগ সংস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
লেখক: বিজনেস এডিটর, দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ। সাবেক কর্মস্থল—দৈনিক যায়যায়দিন, বর্তমান, দেশ রূপান্তর ও দৈনিক ইত্তেফাক।
খবরটি শেয়ার করুন