ফাইল ছবি
ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের কোনো প্রতিনিধি অংশ নেবেন না বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে রোহিঙ্গাবিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারের ফাঁকে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। পরে বিএনপির মিডিয়া সেলের যাচাইকৃত ফেসবুক পেজেও তার বক্তব্য প্রকাশ করা হয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের সাত দেশের জোট বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তাকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ওই সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কে সাম্প্রতিক টানাপোড়েন নতুন মাত্রা পেল। বিশেষ করে ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা এবং গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে তার সাংবাদিকদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব এখন উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগেও দেখা যাচ্ছে।
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছে, ব্রিকসের আউটরিচ পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগের জন্য তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সুবিধা তৈরি করতে পারে। কারণ এর মাধ্যমে দলটি বিএনপি সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের টানাপোড়েনকে নিজেদের রাজনৈতিক প্রচারে ব্যবহার করার সুযোগ পাবে। তবে এই সুবিধা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক পরবর্তী সময়ে কোন দিকে যায় তার ওপর।
ব্রিকস সম্মেলন আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হবে। ব্রিকসের বর্তমান চেয়ারম্যান ভারত। বাংলাদেশ এই জোটের সদস্য নয়। তবে বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্যও আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ভারত। দুই দেশের কূটনৈতিক পর্যায়ে এ নিয়ে আলোচনা চলছিল। কিন্তু সফরের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়নি। গত আগস্টে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়ালও জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশ থেকে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের বিষয়ে তাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য নেই। ৮ সেপ্টেম্বরও তিনি একই ধরনের বক্তব্য দেন।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে অনিশ্চয়তার একটি বড় কারণ শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। ঢাকার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে দিল্লির কাছে নিশ্চয়তা চাওয়া হয়েছিল। বিবিসি বাংলার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকার চাইছিল, ভারতের মাটিতে অবস্থান করে শেখ হাসিনা যেন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারেন।
গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার সাংবাদিকদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। ওই অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের কয়েক নেতা বক্তব্য দেন। ঢাকার পক্ষ থেকে এর তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়।
ভারত অবশ্য ওই অনুষ্ঠানের দায় নেয়নি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান আয়োজন করেছিল। ভারত সরকার এতে কোনো ভূমিকা রাখেনি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ওই অনুষ্ঠানে বলা কোনো বক্তব্য, বিশেষ করে বাংলাদেশের বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে দেওয়া বক্তব্য, ভারত সরকার অনুমোদন করে না।
রয়টার্সও জানিয়েছে, শেখ হাসিনাকে ঘিরে বিরোধ দুই দেশের সম্পর্কের একটি বড় সমস্যা হয়ে আছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নয়নের আগ্রহ দেখালেও শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তার প্রত্যর্পণের দাবি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি আওয়ামী লীগের জন্য কী ধরনের রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে, সেটিই এখন আলোচনার বিষয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ প্রথমত বলতে পারে, বিএনপি সরকার প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনায় ব্যর্থ হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে যে বিরোধ তৈরি হয়েছে, সেটিকে দলটি নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার জন্য ব্যবহার করতে পারে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিকে তারা সরকারের কূটনৈতিক অবস্থানের দুর্বলতা হিসেবে প্রচার করতে পারে।
তবে এর বিপরীত একটি দিকও আছে। সরকার যদি এই সিদ্ধান্তকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে অবস্থান হিসেবে তুলে ধরতে পারে, তাহলে সেটিও রাজনৈতিকভাবে কার্যকর হতে পারে। অর্থাৎ একই সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগ যেমন নিজেদের পক্ষে ব্যবহারের চেষ্টা করতে পারে, সরকারও সেটিকে জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে।
এখানে বিষয়টি শুধু আওয়ামী লীগের লাভ-ক্ষতির হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি পররাষ্ট্রনীতি, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক কূটনীতির বিষয়ও জড়িয়ে আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মান্নান মনে করেন, ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অংশ নেওয়া উচিত ছিল। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারের পর সরকার প্রতিবাদ জানিয়েছে। কিন্তু প্রতিবাদ করার অর্থ ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়া যাবে না—এমন নয়। তার মতে, সম্মেলনে উপস্থিত থেকেও ভারতের কাছে প্রতিবাদ জানানো সম্ভব ছিল।
তিনি আরও বলেন, ব্রিকসের অনুষ্ঠানে ভারত ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা থাকবেন। ফলে সেখানে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের অন্যান্য দেশের সঙ্গেও কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ থাকত। তার মতে, কোনো একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের যোগাযোগের সুযোগ সীমিত করা উচিত নয়। জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন।
অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. নঈম আকতার সিদ্দিক ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছেন। তার মতে, ব্রিকসের আউটরিচ পর্বে প্রধানমন্ত্রী না যাওয়ার সিদ্ধান্তকে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম কার্যক্রমের প্রতিবাদ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে তিনি এর ঝুঁকির কথাও বলেছেন। তার মতে, এতে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েন বাড়তে পারে। আমদানি-রপ্তানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সহযোগিতায় এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও কিছু জটিলতা তৈরি হতে পারে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সম্প্রতি জানিয়েছে, ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভেতরেও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে নানা মতপার্থক্য রয়েছে বলে আলোচনা চলছে। পত্রিকাটি লিখেছে, দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগের মধ্যেই শেখ হাসিনার নয়াদিল্লির অনুষ্ঠান এবং তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফর নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তবে ভারতের দিক থেকে সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে দেওয়ার কোনো ইঙ্গিত এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। বরং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের নবনিযুক্ত হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠক হয়েছে। এর আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গেও তিনি বৈঠক করেন। ভারতের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে যোগাযোগ অব্যাহত রাখা হবে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করার জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবিও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। ভারত জানিয়েছে, বিষয়টি তারা প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনা করছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এবারের সম্মেলনে ব্রিকসের ১১টি সদস্যদেশের নেতারা অংশ নিচ্ছেন। বৈশ্বিক অর্থনীতি, পশ্চিম এশিয়ার সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। ভারতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলন নয়াদিল্লির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আয়োজন। এমন একটি সময়ে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি তাই শুধু ভারতকে কেন্দ্র করে একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হবে না। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এর রাজনৈতিক ব্যাখ্যা তৈরি হতে পারে।
আওয়ামী লীগের জন্য সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য লাভ হলো, দলটি ঢাকা-দিল্লি টানাপোড়েনকে নিজেদের রাজনৈতিক বয়ানের অংশ করতে পারবে। শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। তার বক্তব্য ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অস্বস্তিও প্রকাশ্যে এসেছে। আওয়ামী লীগ চাইলে এই দুই বিষয়কে একসঙ্গে ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরতে পারে।
অন্যদিকে সরকার যদি ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের দরজা খোলা রাখে এবং একই সঙ্গে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে আপত্তি অব্যাহত রাখে, তাহলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সুযোগ থাকবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবাদ এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ—দুটিকে পাশাপাশি চালানোই বাংলাদেশের জন্য বেশি কার্যকর হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত ব্রিকস সম্মেলনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগের জন্য তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রচারের উপকরণ হতে পারে। কিন্তু এটিকে আওয়ামী লীগের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক লাভ হিসেবে বিবেচনা করা এখনই কঠিন। ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক আগামী কয়েক মাসে কোন পথে যায়, শেখ হাসিনার বিষয়ে ভারতের অবস্থান কী হয় এবং বিএনপি সরকার কীভাবে অন্যান্য দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ায়—এসবের ওপরই এর রাজনৈতিক ফল অনেকটা নির্ভর করবে।
তাই ব্রিকস বর্জনের সিদ্ধান্তকে একদিকে যেমন সরকারের কঠোর কূটনৈতিক অবস্থানের বার্তা হিসেবে দেখা যায়, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের জন্যও এটি রাজনৈতিক প্রচারের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। তবে সেই সুযোগ কতটা বাস্তব রাজনৈতিক লাভে পরিণত হবে, তা এখনো নির্ভর করছে পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপের ওপর।
খবরটি শেয়ার করুন