ছবি: সংগৃহীত
ব্যাংকিং খাত হলো আধুনিক অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন। এর মূল চালিকাশক্তি হলেন দক্ষ ব্যাংকাররা। তাদের প্রধান দায়িত্ব আমানতের নিরাপত্তা দেওয়া। পাশাপাশি বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি সচল রাখা। একজন দূরদর্শী ব্যাংকারকে আর্থিক বিশ্লেষক হতে হয়। একই সঙ্গে তাকে দক্ষ ঝুঁকি ব্যবস্থাপক হতে হয়।
সিটি গ্রুপ দেশের একটি সফল শিল্পগোষ্ঠী। এর ৫০ বছরের গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে। এবারই প্রথম গ্রুপটি খেলাপি হওয়া থেকে বাঁচতে চায়। এ জন্য তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিসহায়তা চেয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, আমাদের সেরা ব্যাংকাররা দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে পেরেছেন কি?
দেশের ৪৮টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা এখানে আটকে গেছে। এটি পুরো আর্থিক খাতের জন্য পদ্ধতিগত ঝুঁকি তৈরি করেছে। এই বিপর্যয়ের দায় কেবল উদ্যোক্তার নয়। সংকটের পেছনে ব্যাংকগুলোর অতি-উৎসাহ দায়ী। পাশাপাশি কাঠামোগত দুর্বলতা এবং ঝুঁকি মূল্যায়নের সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গিও দায়ী।
দেশ তীব্র গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের দিকে যাচ্ছে। এই লক্ষণ গত এক দশক ধরেই স্পষ্ট ছিল। দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি অনেক। তাই ২০১৮ সাল থেকেই সরকার চড়া মূল্যে এলএনজি আমদানি করছে। পেট্রোবাংলা নতুন শিল্পসংযোগ দিতে হিমশিম খাচ্ছিল। এই তথ্য দেশের সাধারণ নাগরিকের কাছেও অজানা ছিল না। এই বাস্তবতার মধ্যেই ২০২০ সালের পর সিটি গ্রুপ মেগা উদ্যোগ নেয়। তারা মুন্সিগঞ্জের হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে ছয়টি বড় কারখানা গড়ে তোলে। এখানে বিনিয়োগ করা হয় প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা।
এখানেই মূল খটকা লাগে। অভিজ্ঞ ব্যাংকারদের প্রতিটি ঋণের কারিগরি ও সম্ভাব্যতা যাচাই করার কথা। অথচ তারা নিশ্চিত গ্যাসসংযোগের গ্যারান্টি ছাড়াই এত বড় অর্থায়নে সায় দিলেন। দেশের শীর্ষ ব্যাংকগুলো প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি ক্যাশ ফ্লো বা নগদ প্রবাহ দেখেনি। তারা সিটি গ্রুপের ‘নাম’ বা ব্র্যান্ড ভ্যালুকেই অন্ধের মতো বিশ্বাস করেছে।
ফলে আজ বিশাল অবকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু গ্যাসের অভাবে কারখানা থেকে রাজস্ব আসছে না। এটি উদ্যোক্তার অতি-উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনার ত্রুটি। তবে তার চেয়েও বড় ত্রুটি ব্যাংকগুলোর ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল শেষে সিটি গ্রুপের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৪,৭৭৪ কোটি টাকা। এই ঋণের সিংহভাগই দেশের তথাকথিত 'সবচেয়ে ভালো' ব্যাংকগুলোর হাতে। এইচএসবিসি ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের মতো বৈশ্বিক জায়ান্টরা এতে অর্থায়ন করেছে। সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, ব্র্যাক, প্রাইম বা মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকও এই অর্থায়নে নেতৃত্ব দিয়েছে। এসব ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীরা এ দেশের ব্যাংকিং জগতের আইকন।
একটি খাতের সেরা মেধাগুলো একযোগে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘গ্রুপথিংক’ বা যৌথ মোহাচ্ছন্নতা বলা যায়। বড় ব্যাংকগুলোর অতি-উৎসাহ দেখে মাঝারি ও ছোট ব্যাংকগুলোও অন্ধভাবে প্রতিযোগিতায় নামে। তারা কোনো গভীর পর্যালোচনা ছাড়াই সিটি গ্রুপকে ঋণ দেয়।
এখন পরিস্থিতি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। সিটি গ্রুপের ঋণ খেলাপি হলে ভালো ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার এক ধাক্কায় ৫ থেকে ৭ শতাংশে গিয়ে ঠেকবে। এই আশঙ্কায় সব ব্যাংকার এখন একতাবদ্ধ হয়েছেন। তারা গ্রুপটির ঋণ পুনর্গঠনের জন্য কমিটি করছেন। প্রশ্ন হলো, এই ‘একতাবদ্ধতা’ ঋণ দেওয়ার আগে কেন দেখা গেল না? কেন অগ্রিম সতর্কতা সংকেত অবহেলা করা হলো?
এই সংকটের একটি গভীর কাঠামোগত দিক রয়েছে। উন্নত অর্থনীতিতে বৃহৎ শিল্পায়নের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন আসে পুঁজিবাজার থেকে। বড় করপোরেটগুলো বন্ড বা শেয়ার ছেড়ে তহবিল সংগ্রহ করে। এতে ঝুঁকি হাজারো বিনিয়োগকারীর মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশে শক্তিশালী পুঁজিবাজার বা বন্ড মার্কেট গড়ে ওঠেনি। ফলে ৩৫ হাজার কোটি টাকা টার্নওভারের সিটি গ্রুপকেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপরই নির্ভর করতে হয়েছে।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মূল তহবিল আসে গ্রাহকদের স্বল্পমেয়াদি আমানত থেকে। এই তহবিল দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি মেগা প্রজেক্টে অর্থায়ন করা ভুল। এটি ব্যাংকিংবিদ্যার মৌলিক নিয়মের পরিপন্থী। এই সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যাংকগুলো একই গ্রুপকে বারবার ঋণ দিতে থাকে। এটি একপর্যায়ে একক গ্রাহক ঋণসীমা লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করে।
সিটি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত ফজলুর রহমান এ দেশের শিল্পায়নের পথিকৃৎ ছিলেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে তার অবদান অনেক। তিনি ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছিলেন। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তার প্রয়াণের পর গ্রুপটি কিছুটা নেতৃত্বসংকটে পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলারের তীব্র অস্থিরতা এবং ব্যাংকঋণের সুদহার বৃদ্ধি।
তবে ব্যাংকারদের সব যুক্তি পুরোপুরি মেনে নেওয়া যায় না। পুরো দায় পূর্বের সরকারের জ্বালানি নীতি ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকটের ওপর চাপানো ঠিক নয়। কারণ, ব্যাংকারের কাজই হলো সম্ভাব্য প্রতিকূল পরিস্থিতি বা 'স্ট্রেস টেস্টিং' করে ঋণ দেওয়া।
যদি কোনো একটি বড় শিল্পগোষ্ঠী ভেঙে পড়লে পুরো ব্যাংকিং খাত কেঁপে ওঠে, তবে বুঝতে হবে আমাদের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নীতিমালার গোড়াতেই গলদ রয়েছে। সম্পর্কের খাতিরে বা অতীতের ট্র্যাক রেকর্ড দেখে বর্তমানের ঝুঁকি আড়াল করার এই সংস্কৃতি ভালো নয়।
সিটি গ্রুপের বর্তমান পরিস্থিতি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। এই সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় বেশ কিছু সংস্কার জরুরি।
যেমন—ব্যাংকগুলোকে নাম বা জামানতের মোহে অন্ধ হওয়া বন্ধ করতে হবে। প্রতিটি প্রকল্পের নগদ প্রবাহ এবং স্বাধীন ফিজিবিলিটি রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে ঋণ দিতে হবে।
বড় ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নকে ব্যাংক ব্যবস্থার বাইরে নিয়ে আসতে হবে। বড় কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারমুখী করতে হবে। শক্তিশালী বন্ড মার্কেট গঠন এখন সময়ের দাবি।
প্রকল্পের রাজস্ব আদায়ে বিলম্ব দেখা দিলে ব্যাংকগুলোকে শুরুতেই কঠোর হতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) তদারকি আরও জোরদার করতে হবে।
একটি গ্রুপ যখন অনেক ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়, তখন ব্যাংকগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান স্বচ্ছ হতে হবে। সিন্ডিকেট বা কনসোর্টিয়াম ঋণের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বণ্টনের নিয়মাবলি কঠোরভাবে মানতে হবে।
এখন, সিটি গ্রুপকে টিকিয়ে রাখা দেশের সাপ্লাই চেইন ও কর্মসংস্থানের স্বার্থেই জরুরি। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে নীতিসহায়তা দেবে, তার সঙ্গে কঠোর সুশাসনের শর্ত জুড়ে দিতে হবে। এটি যেন অন্য বড় খেলাপিদের জন্য ভুল দৃষ্টান্ত না হয়।
পরিশেষে, সিটি গ্রুপের সংকটটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি আমাদের ব্যাংকিং খাতের যৌথ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার দলিল। দেশের সেরা ব্যাংকাররা যদি ঋণের গুণগত মান নিশ্চিত করতে না পারেন, তবে আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখা কঠিন হবে। আশা করা যায়, বর্তমান সংকটটি ব্যাংক ও ব্যবসায়ী—উভয় পক্ষকেই অতি-উচ্চাকাঙ্ক্ষা পরিহার করতে বাধ্য করবে। একই সঙ্গে এটি একটি বাস্তবসম্মত, টেকসই ও দূরদর্শী আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
লেখক: বিজনেস এডিটর, দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ। এর আগে তিনি দৈনিক যায়যায়দিন, বর্তমান, দেশ রূপান্তর ও ইত্তেফাকে কাজ করেছেন।
খবরটি শেয়ার করুন