ছবি: সংগৃহীত
চলতি বছর বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য ছিল একদিকে কঠিন, অন্যদিকে সম্ভাবনার নতুন দরজা খোলার। রাজনৈতিক অস্থিরতা, দীর্ঘ সময় প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ থাকা, হল সংকট ও দর্শকসংখ্যা কমে যাওয়ার মতো একাধিক সমস্যার চাপে পড়ে ছিল ঢাকাই চলচ্চিত্র। বছরের বড় একটি সময় সিনেমা হল কার্যত অচল ছিল।
ফলে নিয়মিত সিনেমা মুক্তির ধারাও ব্যাহত হয়। দুই ঈদের সময় কিছু বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তি পেলেও বছরের বাকি সময়ে প্রেক্ষাগৃহগুলো ছিল অনেকটাই দর্শকশূন্য। এ প্রতিকূল বাস্তবতার মাঝেও ২০২৫ সাল একেবারে নিষ্প্রাণ হয়ে থাকেনি। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বেশ কয়েকটি সিনেমা সম্ভাবনার আলো জ্বালিয়ে রেখেছে।
চলতি বছরে শাকিব খানের সিনেমাগুলো বক্স অফিসে একচ্ছত্র আধিপত্য দেখিয়েছে। অন্যদিকে বেশকিছু সিনেমা গল্প, নির্মাণশৈলী এবং বিষয়বস্তুর কারণে দর্শক ও সমালোচকদের আলোচনায় এসেছে। তারকানির্ভর সিনেমার সাফল্যের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের নির্মাতা, ভিন্ন ধারার ভাবনা ও গল্প বলার সাহসী প্রয়াসও গুরুত্ব পেয়েছে। বছরজুড়ে নানা সংকটের মাঝেও এ বৈচিত্র্যই ২০২৫ সালকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
এ বছরকে শাকিব খানের বছর বললে ভুল হবে না। টানা তিন বছর ধরে তার অভিনীত সিনেমাগুলো ইন্ডাস্ট্রি হিট হওয়া বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। চলতি বছরে শাকিব খানের ‘বরবাদ’ ও ‘তাণ্ডব’ শুধু বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়নি, বরং দর্শককে আবার প্রেক্ষাগৃহমুখী করার ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি তার অভিনীত অন্তরাত্মাও আলোচনায় ছিল। সংকটের সময়ে এসব সিনেমা হল মালিকদের জন্য কিছুটা হলেও স্বস্তি নিয়ে আসে।
বরবাদ বছরের সবচেয়ে বড় বক্স অফিস সাফল্য পায়। তাণ্ডব সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অ্যাকশন থ্রিলারের কাঠামোয় তুলে ধরে আলোচনার কেন্দ্রে আসে। আর অন্তরাত্মা শাকিব খানের রোমান্টিক ড্রামা ঘরানাকে নতুনভাবে সামনে এনে দর্শককে ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা দিয়েছে। একের পর এক সফল সিনেমা উপহার দিয়ে শাকিব খান এ বছরও ইন্ডাস্ট্রির ভরসার নাম হয়ে ওঠেন।
শাকিব খানের দাপটের মাঝেও এ বছর বেশ কয়েকটি সিনেমা দর্শক ও সমালোচকদের নজর কেড়েছে। ভিন্ন ধারার নতুন গল্প বলার চেষ্টায় এসব সিনেমাও দর্শকের আগ্রহ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এ বছরের ঈদুল আজহায় মুক্তি পায় তানিম নূরের পারিবারিক গল্পনির্ভর সিনেমা উৎসব। দীর্ঘদিন পর এমন একটি পরিবারকেন্দ্রিক সিনেমা দর্শকের মধ্যে সাড়া ফেলে। মুক্তির পর থেকেই সিনেমাটি দর্শক দারুণভাবে গ্রহণ করে এবং মুখে মুখে প্রশংসা ছড়িয়ে পড়ে।
সিনেমার প্রচারণায় বলা হয়েছিল পরিবার ছাড়া সিনেমাটি দেখা নিষেধ, যা দর্শকের কৌতূহল আরো বাড়িয়ে দেয়। দেশের প্রেক্ষাগৃহের পাশাপাশি প্রবাসী দর্শকের মধ্যে সিনেমাটি ব্যাপক সাড়া ফেলে। সিনেমাটি বাণিজ্যিকভাবেও সফল হয়।
চলতি বছর ঈদুল ফিতরে মুক্তি পাওয়া দাগি ছিল একটি উল্লেখযোগ্য চমক। আফরান নিশো, তমা মির্জা ও সুনেরাহ বিনতে কামালের অভিনয়ে নির্মিত এ অপরাধ থ্রিলার বিচার ব্যবস্থা, নৈতিকতা ও অপরাধবোধের জটিল প্রশ্ন সামনে আনে। গল্পের মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা ও চরিত্র নির্মাণ সিনেমাটিকে সাধারণ থ্রিলারের সীমা ছাড়িয়ে দর্শককে ভাবতে বাধ্য করে।
‘জংলি’ একজন যুবকের ভেতরের দ্বন্দ্ব, পরিবর্তন ও আত্মানুসন্ধানের গল্প বলে। সিয়াম আহমেদ, শবনম বুবলী ও দীঘির অভিনয়ে নির্মিত সিনেমাটি অ্যাকশন থ্রিলারের পাশাপাশি আবেগ, সম্পর্ক এবং মানসিক টানাপড়েনকেও গুরুত্ব দেয়। ফলে সিনেমাটি কেবল বিনোদন নয়, চরিত্রভিত্তিক এক অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে।
‘এশা মার্ডার: কর্মফল’ ছিল বছরের অন্যতম সাহসী ক্রাইম থ্রিলার। ধর্ষণ তদন্ত, ন্যায়বিচার ও সামাজিক প্রতিক্রিয়ার মতো সংবেদনশীল বিষয় তুলে ধরে সিনেমাটি দর্শক ও সমালোচকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করে। আজমেরী হক বাঁধন ও পূজা অ্যাগনেস ক্রুজের শক্তিশালী অভিনয় সিনেমাটির আবেগ এবং বিশ্বাসযোগ্যতা আরো বাড়িয়ে দেয়।
এ বছর মানবিক গল্পনির্ভর কয়েকটি সিনেমা দর্শকমনে জায়গা করে নেয়, যা বছরের আরেকটি ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা যায়।
‘জয়া আর শারমিন’ কভিড-১৯ লকডাউনের প্রেক্ষাপটে দুই নারীর জীবন, সংগ্রাম ও সম্পর্কের গল্প বলে। নিঃসঙ্গতা, টিকে থাকার লড়াই এবং মানবিক বন্ধনের আবেগ সিনেমাটিকে গভীর ও স্পর্শকাতর করেছে। ধীরগতির বর্ণনা দর্শককে চরিত্রগুলোর সঙ্গে সহজে যুক্ত হতে সাহায্য করে।
ভালোবাসা দিবসে মুক্তি পাওয়া একটি সরল অথচ আবেগঘন প্রেমের গল্প ‘ময়না’। সামাজিক বাধা, আত্মানুসন্ধান ও সম্পর্কের বাস্তবতা তুলে ধরে সিনেমাটি দেখায় ভালোবাসা শুধু আবেগ নয়, জীবনের চলার পথে শক্তির উৎসও হতে পারে।
নদীপাড়ের জীবনের পটভূমিতে নির্মিত ‘জলে জ্বলে তারা’ প্রেম ও সংগ্রামের রূপক গল্প বলে। ধীরগতির নির্মাণ, প্রকৃতিনির্ভর দৃশ্যায়ন ও আবহমান পরিবেশ সিনেমাটিকে শিল্পমনস্ক দর্শকের কাছে বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
সংকটের মধ্যেও দর্শকের হালকা বিনোদনের চাহিদা পূরণ করেছে ‘ব্যাচেলর ইন ট্রিপ’। নাসিম সাহনিক পরিচালিত এ কমেডি-অ্যাডভেঞ্চার সিনেমায় বন্ধুত্ব, ভ্রমণ ও আধুনিক জীবনের নানা হাস্যরস সহজ এবং সাবলীল ভঙ্গিতে তুলে ধরা হয়। তরুণ দর্শকের মধ্যে সিনেমাটি ভালো সাড়া ফেলে এবং দর্শককে কিছুটা স্বস্তির বিনোদন দেয়।
দর্শক ও সমালোচকদের পছন্দের তালিকায় এ বছর আলাদা করে জায়গা করে নেয় আরো কয়েকটি সিনেমা। বলী, সাবা, বাড়ির নাম শাহানা, অন্যদিন, ফেরেশতে ও দেলুপি সিনেমাগুলো শিল্পভাষা, নির্মাণশৈলী ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে আলোচনায় আসে।
সীমিত মুক্তি ও কম দর্শকসংখ্যার বাস্তবতার মধ্যেও এসব সিনেমা প্রমাণ করেছে শক্ত গল্প ও সততার নির্মাণ এখনো নিজের জায়গা তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য ছিল ভালোমন্দে ভরা একটি বছর। একদিকে শাকিব খানের নেতৃত্বে বাণিজ্যিক সিনেমাগুলো ইন্ডাস্ট্রিকে টিকিয়ে রেখেছে, অন্যদিকে কিছু সাহসী, চিন্তাশীল ও ভিন্ন ধারার কিছু সিনেমা নতুন পথের ইঙ্গিত দিয়েছে। এটা বলাই যায়, এ বছর প্রতিকূল সময়ের মধ্যেও নতুন গল্প বলার আকাঙ্ক্ষা হারায়নি বাংলা চলচ্চিত্র।
জে.এস/
খবরটি শেয়ার করুন