রবিবার, ২০শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৫ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** দ্বিতীয় জানাজা শেষে গন্ধমতিতে চিরনিদ্রায় অপ্রতিম, দুপুরে পুলিশের সংবাদ সম্মেলন *** ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছেছে বাংলাদেশ দল *** মমতার আমলে পশ্চিমবঙ্গকে বাংলাদেশে পরিণত করার চেষ্টা হয়েছিল: ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী *** উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক পরীক্ষার কারণে ১,৩৯৯টি ভূমিকম্প হয়ে থাকতে পারে: গবেষণা *** হুতিদের মোকাবিলায় এবার সৌদির পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা তুরস্কের! যুদ্ধ করবে কি? *** কমলাপুর রেলস্টেশনে পরপর দুটি ককটেল বিস্ফোরণ *** তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর আগামী নভেম্বরে করা যায় কি না, আলোচনায় ঢাকা-দিল্লি *** জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান *** মন্ত্রী বড়, নাকি সংসদ সদস্য—কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রশ্ন প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের *** আওয়ামী লীগ-জামায়াত এক হয়েও বিএনপির কিছুই করতে পারেনি: এমপি চাঁদ

সুখবর এক্সপ্লেইনার

আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিলের পর চট্টগ্রাম-৪ আসনে কী ঘটতে পারে

জেবিন শান্তনু

🕒 প্রকাশ: ১১:৪৩ পূর্বাহ্ন, ১লা জুলাই ২০২৬

#

ফাইল ছবি

চট্টগ্রাম-৪ সংসদীয় আসনের নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে কয়েক মাস ধরে চলা আইনি অনিশ্চয়তা নতুন মোড়ে পৌঁছেছে গতকাল মঙ্গলবার (৩০ জুন) দেওয়া আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে। ঋণখেলাপির কারণে বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিল করে আদালত জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি এই নির্বাচনের ফল ভোগ করতে পারবেন না।

তবে রায়ের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এখন আসনটির প্রতিনিধিত্ব কীভাবে নির্ধারিত হবে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীকে কি সংসদ সদস্য ঘোষণা করা হবে, নাকি নতুন করে ভোট গ্রহণের প্রয়োজন হবে—এই দুটি সম্ভাবনাই এখন আলোচনায় রয়েছে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ আসনে সর্বাধিক ভোট পেয়েছিলেন আসলাম চৌধুরী। তবে তার মনোনয়নপত্রের বৈধতা নিয়ে আদালতে মামলা চলমান থাকায় নির্বাচন কমিশন ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করতে পারেনি। আপিল বিভাগের নির্দেশেই সেই ফলাফল আটকে ছিল। সর্বশেষ রায়ে আদালত তার প্রার্থিতাকে অবৈধ ঘোষণা করায় বিষয়টি এখন নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

মামলার মূল প্রশ্ন ছিল, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার দিন আসলাম চৌধুরী আইনগতভাবে ঋণখেলাপি ছিলেন কি না। নির্বাচন কমিশন আপিলে তার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করলেও সেই সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়। হাইকোর্ট আবেদন খারিজ করলেও পরে আপিল বিভাগ বিষয়টি শুনানির জন্য গ্রহণ করে। শেষ পর্যন্ত আদালত সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, সংশ্লিষ্ট নির্বাচনে তিনি যোগ্য প্রার্থী ছিলেন না। এর ফলে নির্বাচনে অংশগ্রহণই আইনগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

রায়ের পর চট্টগ্রাম-৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকীর আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেন, প্রচলিত নির্বাচনী নীতিতে কোনো বিজয়ী প্রার্থী পরে অযোগ্য ঘোষিত হলে অনেক ক্ষেত্রে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। তবে তিনি এটিও স্পষ্ট করেছেন যে, এই মামলায় আপিল বিভাগ আলাদা কোনো নির্দেশনা দিয়ে থাকলে সেটিই কার্যকর হবে। তাই পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

অন্যদিকে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেছেন, এই রায় ভবিষ্যতের জন্য আসলাম চৌধুরীর রাজনৈতিক পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় না। তার মতে, অযোগ্যতার বিষয়টি ছিল নির্দিষ্ট নির্বাচনের সময়কার আইনি অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। ভবিষ্যতে যদি তিনি আইনগতভাবে সব শর্ত পূরণ করেন, তাহলে নতুন কোনো নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।

অর্থাৎ বর্তমান রায় তার এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর প্রভাব ফেললেও ভবিষ্যতের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাকচ করছে না।

চট্টগ্রাম-৪ আসনের সামনে এখন দুটি বাস্তবসম্মত পথ রয়েছে। প্রথমটি হলো, আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায়ে যদি নতুন নির্বাচনের নির্দেশনা না থাকে, তাহলে নির্বাচন কমিশন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। দ্বিতীয়টি হলো, আদালত যদি মনে করেন একজন অযোগ্য প্রার্থীর অংশগ্রহণ পুরো নির্বাচনী প্রতিযোগিতাকে প্রভাবিত করেছে, তাহলে পুনর্নির্বাচনের নির্দেশনা কার্যকর হতে পারে। কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে, তা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে রায়ের বিস্তারিত পর্যবেক্ষণের ওপর।

নির্বাচনী আইন নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি কেবল ভোটের ব্যবধানের প্রশ্ন নয়; বরং আইনের ব্যাখ্যার প্রশ্ন। কোনো প্রার্থী শুরু থেকেই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্য না হলে তার প্রাপ্ত ভোটের আইনগত মূল্য কী হবে, সেটিই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিভিন্ন দেশে এবং বাংলাদেশের অতীতের কিছু মামলায় এ ধরনের পরিস্থিতিতে ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত দেখা গেছে। ফলে এই মামলাও ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে উঠতে পারে।

সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালত সাধারণত দুটি বিষয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করার চেষ্টা করেন। একদিকে আইনের শাসন নিশ্চিত করা, অন্যদিকে ভোটারদের রায়ের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান দেখানো। যদি আদালত মনে করেন ভোটারদের দেওয়া বৈধ ভোটের প্রতিনিধিত্ব দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীর মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব, তাহলে সেই পথ অনুসরণ করা হতে পারে।

আবার যদি মনে হয় অযোগ্য প্রার্থীর উপস্থিতি অন্য প্রার্থীদের নির্বাচনী সুযোগকে প্রভাবিত করেছে, তাহলে নতুন নির্বাচনই অধিক গ্রহণযোগ্য সমাধান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এ মামলাটি নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। কারণ মনোনয়ন যাচাইয়ের সময় একজন প্রার্থীর ঋণখেলাপি বা অন্যান্য আইনগত যোগ্যতা নির্ধারণে কমিশনের সিদ্ধান্ত পরবর্তীতে আদালতে বাতিল হয়েছে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, মনোনয়ন যাচাই প্রক্রিয়া আরও কঠোর ও তথ্যনির্ভর না হলে ভবিষ্যতেও ভোটগ্রহণের পর এ ধরনের আইনি জটিলতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। এতে শুধু প্রার্থীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন না, দীর্ঘ সময় একটি আসনের ভোটাররাও কার্যকর প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত হন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই রায়ের প্রভাব শুধু একটি আসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিএনপি ও জামায়াত—দুই দলের জন্যই এটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যদি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীকে সংসদ সদস্য ঘোষণা করা হয়, তাহলে আদালতের রায়ের ভিত্তিতে নির্বাচনী ফল পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত তৈরি হবে।

আবার পুনর্নির্বাচনের সিদ্ধান্ত এলে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোকে নতুন কৌশল নিয়ে মাঠে নামতে হবে। সেই ক্ষেত্রে আসলাম চৌধুরী তার আইনগত অবস্থান পরিবর্তন করতে পারলে আবারও প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন বলে আইনজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন।

চট্টগ্রাম-৪ আসনের ভোটারদের জন্যও পরিস্থিতিটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। নির্বাচনের কয়েক মাস পরও তাদের প্রতিনিধি চূড়ান্ত না হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর নির্বাচন কমিশন দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলে এই অনিশ্চয়তার অবসান ঘটবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সব মিলিয়ে আপিল বিভাগের রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্নের নিষ্পত্তি করলেও নির্বাচন-পরবর্তী সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। এখন সবার নজর পূর্ণাঙ্গ রায়ের দিকে। সেই রায়ই নির্ধারণ করবে চট্টগ্রাম-৪ আসনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থী সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব নেবেন, নাকি ভোটারদের আবারও নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।

একই সঙ্গে এই মামলার নিষ্পত্তি ভবিষ্যতে প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালন এবং নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

আসলাম চৌধুরী

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250