ফাইল ছবি (সংগৃহীত)
আওয়ামী লীগের ইতিহাসে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে কঠিন সময়ে দলের নেতৃত্ব দিয়ে হাল ধরে রেখেছিল তাজউদ্দীন আহমদের পরিবার। বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের একমাত্র ছেলে ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমদ সোহেল তাজ এখন আর সেই ধারায় ফিরতে চান না। একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘আজকের আওয়ামী লীগ একটি মাফিয়া লীগে পরিণত হয়েছে। এ দলে আমার কোনো প্রত্যাশা নেই।’ তিনি বলেন, ‘আমি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভালো দেখছি না। আমি আর রাজনীতিতে ফিরতে আগ্রহী নই।’
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিকভাবে 'পচন' এবং নিজের রাজনৈতিক হতাশা নিয়ে দৈনিক যুগান্তরে বিশেষ সাক্ষাৎকার দেন সোহেল তাজ। সাক্ষাৎকার নেন পত্রিকাটির ডিজিটাল বিভাগের তরুণ সাংবাদিক আশরাফুল ইসলাম। গতকাল রোববার (৩রা আগস্ট) রাতে ২৪ মিনিট ১৬ সেকেন্ডের ভিডিও সাক্ষাৎকারটি যুগান্তরের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত হয়। যা পরদিন সকাল ১১টা পর্যন্ত দেখা হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৭ হাজার ৫০০ বার।
এক সময়ের আশাবাদ থেকে চূড়ান্ত হতাশা
সাংবাদিক আশরাফুল ইসলামের এক প্রশ্নের জবাবে সোহেল তাজ বলেন, তিনি একসময় স্বপ্ন দেখতেন দেশের জন্য কিছু করার। তিনি বলেন, ‘আমার মা-বাবা দেশের প্রতি যেভাবে আন্তরিক ছিলেন, সেটা আমার চোখে দেখেছি। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই মাত্র ২৮ বছর বয়সে আমেরিকা থেকে ফিরে এসেছিলাম—বাংলাদেশের পরিবর্তনের অংশ হবো এই বিশ্বাস নিয়ে।’
২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে যখন আওয়ামী লীগ সবচেয়ে সংকটে, সেই সময়ই তিনি দলীয় প্রতীকে জয়লাভ করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী পাঁচ বছরের রাজনৈতিক নির্যাতন, দমন-পীড়ন এবং বিচারহীনতার কালচার দেখে রাজনীতি ছেড়ে দেন সোহেল তাজ।
পরে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের ইশতেহার দেখে আশাবাদী হয়ে দেশে ফিরে আসেন তিনি। কিন্তু দুর্নীতি, অনিয়ম ও আদর্শচ্যুত রাজনীতির বাস্তবতা তাকে আবার হতাশ করে। ‘নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন এবং দুর্নীতি রোধের পরিবর্তে তাকে আঁকড়ে ধরা হয়েছে,’ বলেন সোহেল তাজ। তিনি বলেন, ‘আমি ইতিহাসের ছাত্র। আমার কাছে এটা পরিষ্কার ছিল—এই পথের পরিণতি খারাপ হবে। যা এখন দৃশ্যমান।’
‘মাছের পচন শুরু হয় মাথা থেকে’—দলের ভেতর থেকেই তীব্র সমালোচনা
আওয়ামী লীগের বর্তমান অবস্থা নিয়ে সোহেল তাজ বলেন, ‘এই সংগঠনটি জনগণের পালস থেকে ছিটকে পড়েছে। এখন সবাই নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত। আর এই পচন শুরু হয়েছে উপরের দিক থেকেই। ’তিনি আরও বলেন, ‘২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচন… এরপর পুরো বডিটাই পচে গেছে। আমরা প্রতিহিংসার রাজনীতি বেছে নিয়েছি, বিরোধী দলকে হত্যা-গুমের নীতিতে চলেছি। যার ভুক্তভোগী শুধু প্রতিপক্ষ নয়, নিজেদের কর্মীরাও।’
ড. ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের জল্পনা
চলতি বছরের ১৭ই জুলাই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন সোহেল তাজ ও তার বোন শারমিন আহমদ। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় সাক্ষাৎ-বৈঠকের পর অনেকেই ধারণা করছেন, তিনি হয়তো আওয়ামী লীগের কঠিন সময়ে আবার নেতৃত্বে ফিরবেন।
তবে এ প্রসঙ্গে তার সোজাসাপ্টা মন্তব্য, ‘স্বাধীনতা সংগ্রামের আওয়ামী লীগ আর আজকের আওয়ামী লীগ এক নয়। আজকের দল একটি পরিবার-কেন্দ্রিক প্রাইভেট প্রপার্টির মতো হয়ে গেছে। এটি আর সেই নীতি-আদর্শিক আওয়ামী লীগ নেই। আমি এমন কোনও প্রক্রিয়ায় যেতে আগ্রহী না, যেখানে অনুশোচনা বা আত্ম-উপলব্ধি নেই।’
আত্মসমালোচনা ছাড়া দল পরিবর্তন সম্ভব নয়
সাবেক এই স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘দলের ভেতর কেউই আত্মসমালোচনা করছে না। আমি ছাড়া কেউ অনুশোচনা প্রকাশ করেনি। যদি আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে টিকে থাকতে চায়, তাহলে আত্ম-উপলব্ধি ও অনুতাপ থেকে শুরু করতে হবে। অন্যথায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।’
এক পর্যায়ে সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ‘আপনি একজন জনপ্রিয় রাজনীতিক, যদি মানুষ আপনাকে চায়—তাহলে কি আপনি ফিরে আসবেন?’ উত্তরে তিনি বলেন, ‘না, আমি খুব হতাশ। বাংলাদেশের রাজনীতির প্রচার কৌশল, কালচার কিছুই বদলায়নি। আমি আর ফিরতে চাই না।’
রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলের আশার মৃত্যু
সোহেল তাজ বলেন, ‘যতক্ষণ না আমরা উপলব্ধি করব যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কথাটি শুধুই ব্যবসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, ততক্ষণ সত্যিকার পরিবর্তন সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগ গত ১৫ বছরে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত তাৎপর্য ধ্বংস করেছে।’
খবরটি শেয়ার করুন