বুধবার, ২৫শে মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১০ই চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** ‘জিয়া পরিবারকে শেষ করতে চেয়েছিলেন মাসুদ’ *** ‘এক-এগারোর পর শেখ হাসিনা সরকার মাসুদ চৌধুরীকে পুরস্কৃত করেছিল’ *** সৌদি যুবরাজ ইরানে হামলা চালিয়ে যেতে ট্রাম্পকে চাপ দিচ্ছেন: নিউইয়র্ক টাইমস *** এক-এগারোর কুশীলব মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার কেন গুরুত্বপূর্ণ *** কেন দেশ ছাড়ছেন ‘নবীন পাঞ্জাবি’র মালিক? *** এক-এগারোর ‘কুশীলব’ মাহফুজ আনাম, মতিউর রহমানকে গ্রেপ্তারের দাবিতে সরব নেটিজেনরা *** কামড় দিতেই আইসক্রিম থেকে বেরিয়ে এল কেঁচো, জরিমানা ৩০ হাজার টাকা *** ১০ ঘণ্টারও কম সময়ে ৭ দফায় ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ইরানের *** মানহানির এক মামলায় জামিন পেলেন মেনন-মানিক-ইনু *** শেখ হাসিনার সব অপকর্মের লাইসেন্স ওয়ান-ইলেভেন থেকে এসেছে: ফারুকী

‘শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ত্রুটিপূর্ণ বিচারিক যুক্তি, ফোনালাপে কাউকে হত্যার নির্দেশ নেই’

বিশেষ প্রতিবেদক

🕒 প্রকাশ: ০৭:১৪ অপরাহ্ন, ২০শে নভেম্বর ২০২৫

#

ছবি: সংগৃহীত

চব্বিশের জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গত সোমবার (১৭ই নভেম্বর) সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের যে রায় ঘোষণা করেছেন, এ নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছেন ব্রিটিশ সাংবাদিক ও বিশ্লেষক ডেভিড বার্গম্যান। তার মতে, ১৪ই জুলাইয়ের ফোনালাপকে হত্যার আদেশ হিসেবে দেখা পুরোপুরি ভুল।

তিনি বলছেন, ২০২৪ সালের ১৪ই জুলাইয়ের ফোনালাপ প্রমাণ করে শেখ হাসিনা ‘আগেই’ হত্যার আদেশ দিয়েছিলেন বলে প্রসিকিউশন যে দাবি করেছে এবং ট্রাইব্যুনাল যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, তার ভিত্তি বেশ দুর্বল। ওই ফোনালাপে শেখ হাসিনা চেয়েছেন আদালতের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তিনি (শেখ হাসিনা) কোথাও বলেননি, তিনি রাস্তায় আন্দোলনকারীদের হত্যা করতে চান।

ডেভিড বার্গম্যান বলেন, ট্রাইব্যুনালের দাবি প্রমাণ করতে বিচারক শেখ হাসিনার ১৪ই জুলাইয়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনের উপাচার্য এ এস এম মাকসুদ কামালের (ইন্টারসেপ্টেড) সঙ্গে ফোনে কথোপকথনের তিনটি অংশ আদালতে পড়ে শোনান। কিন্তু শেখ হাসিনার কথোপকথন বিশ্লেষণ করলে আদালতের এই ব্যাখ্যায় (ইন্টারপ্রিটেশনে) ভুল আছে বলে ধারণা হয়।

তিনি বলেন, তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া হয়, শেখ হাসিনা ফোনালাপে ‘ফাঁসি’ শব্দটি ‘হত্যা’ বোঝাতে ব্যবহার করেছেন, তাহলেও কথোপকথনের কোথাও তিনি বলেননি, তিনি এমন কোনো আদেশ ইতিমধ্যে দিয়ে দিয়েছেন। অথচ বিচারক এমনটিই দাবি করেছেন। এখানে কোথাও ফাঁসি দেওয়া, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা বা কাউকে হত্যা করার কোনো নির্দেশের কথা নেই।

বার্গম্যান দাবি করেন, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রসিকিউশন এই যুক্তি ব্যবহার করছিল যে হাসিনা ১৪ই জুলাই ইতিমধ্যেই হত্যার আদেশ দিয়েছেন। কিন্তু এই দাবি ভিত্তিহীন। আর যদি এই দাবির ভিত্তি না থাকে, তাহলে ১৬ই জুলাই হত্যাকাণ্ডগুলোকে ‘রাষ্ট্রের নীতি অনুযায়ী সংঘটিত’ বলা (যা মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রমাণ করার জন্য খুব জরুরি) এবং সেটার পক্ষে যুক্তি দেওয়া অনেক কঠিন হয়ে যায়।

তিনি বলেন, যদি ট্রাইব্যুনাল-১ যথাযথ যোগ্য ও অভিজ্ঞ ডিফেন্স আইনজীবী নিয়োগ করতেন, তাহলে তারা আসামিকে (শেখ হাসিনা) বাঁচাতে জোর চেষ্টা করতেন। তারা প্রায় নিশ্চিতভাবেই ১৪ই জুলাইয়ের কথোপকথন–সম্পর্কিত প্রসিকিউশনের ব্যাখ্যা খতিয়ে দেখতেন। কিন্তু তা না করে তার বদলে ডিফেন্স আইনজীবী শুধু দাবি করেছেন, ফোনালাপগুলো এআই দিয়ে তৈরি করা। তারা এসব ফোনালাপের কোনো স্বাধীন পরীক্ষার আয়োজনও করেননি।

তার মতে, আসামিপক্ষের আইনজীবীর ব্যর্থতা বিচারকদের দায় কমায় না। বিচারকদের নিজেদেরই, বিশেষ করে ১৪ই জুলাইয়ের কথোপকথনের ক্ষেত্রে প্রমাণগুলো স্বাধীন ও ন্যায়সংগতভাবে বিবেচনা করা উচিত ছিল, কিন্তু তারা তা করেছেন বলে মনে হয়নি। পরিপূর্ণ রায় পাওয়ার পর বোঝা সম্ভব হবে সেখানে ১৪ই জুলাইয়ের ফোনালাপ নিয়ে ট্রাইব্যুনালের যে ভাষ্য এখন পাওয়া গেছে, তার বিস্তারিত আইনি যুক্তি ও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে কি না।

দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক উপসম্পাদকীয়তে ডেভিড বার্গম্যান এসব কথা বলেন। 'শেখ হাসিনার বিচার: আসামিপক্ষের দুর্বল আইনি সহায়তা ও ত্রুটিপূর্ণ বিচারিক যুক্তি' শিরোনামে গতকাল বুধবার (১৯শে নভেম্বর) পত্রিকাটিতে তার লেখাটি প্রকাশিত হয়। আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত এই প্রতিবেদন লেখাকালে তার লেখাটি সম্পর্কে কোনো পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা আসা ও প্রতিবাদপত্র পাঠানোর কথা প্রথম আলোর অনলাইন সংস্করণ থেকে জানা যায়নি। ডেভিড বার্গম্যান বহু বছর ধরে আইসিটির বিচার কার্যক্রম ও বাংলাদেশ নিয়ে লিখছেন।

বিশিষ্ট কলামিস্ট বার্গম্যান বলেন, শেখ হাসিনার এই বিচারে দুটি গুরুতর সমস্যা আছে। প্রথমত, আদালতের নিযুক্ত আসামিপক্ষে যে আইনজীবী ছিলেন, তিনি প্রসিকিউশনের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণগুলো নিয়ে একেবারে সাধারণ যে প্রশ্নগুলো তোলা উচিত ছিল, সেগুলোও তুলতে ‘ব্যর্থ’ হয়েছেন। দ্বিতীয় সমস্যা হলো, বিচারকেরা নিজেদের উদ্যোগেও প্রমাণগুলো কঠোরভাবে খতিয়ে দেখেননি, সব ক্ষেত্রে না হলেও অন্তত কয়েকটি ক্ষেত্রে তা হয়েছে।

তিনি লেখেন, প্রসিকিউশনের পেশকৃত চিত্র এবং তাদের দেওয়া সাক্ষী-প্রমাণ দ্বারা কী প্রতিষ্ঠিত হয়, সে বিষয়ে আদালত প্রসিকিউশনের অবস্থানটাই মেনে নিয়েছেন বলে মনে হয়েছে। আসামিপক্ষের দুর্বল আইনি লড়াইয়ের কারণে বিষয়টা আরও বেশি সমস্যাজনক হয়ে উঠেছে। এই দুই সমস্যার ফলে আদালত বিচারের রায়ে যেসব যুক্তি নিয়ে এসেছেন, তার ভেতর কিছু ত্রুটি দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ছাত্র আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে শেখ হাসিনার কুখ্যাত ‘রাজাকার’ মন্তব্যের পর ছাত্ররা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং এর ফলে আন্দোলন আরও উত্তাল হয়। সেই মন্তব্যেরই কয়েক ঘণ্টা পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে তার ফোনালাপটি (১৪ই জুলাই) হয়েছিল। প্রসিকিউশন যুক্তি দিয়েছে, ওই ফোনকল প্রমাণ করে, শেখ হাসিনা ছাত্রদের হত্যা করার আদেশ দিয়েছিলেন। 

তিনি বলেন, শুধু তা–ই নয়, আদালত যেভাবে পড়ে শুনিয়েছেন, তাতে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগের দুটির ক্ষেত্রে এই নির্দিষ্ট দাবিটি একটি ভিত্তি হিসেবে এসেছে। রায়ে ট্রাইব্যুনাল এই অভিযোগকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করেছে। কিন্তু এই ব্যাখ্যা প্রশ্নের সৃষ্টি করে। শেখ হাসিনার কথোপকথন বিশ্লেষণ করলে আদালতের এই ব্যাখ্যায় (ইন্টারপ্রিটেশনে) ভুল আছে বলে ধারণা হয়।

তিনি লেখেন, শেখ হাসিনা আইসিটি রায়ের পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সঙ্গে ছাত্রদের তুলনা করছেন। তার অর্থ, তিনি চেয়েছেন আদালতের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক। ট্রাইব্যুনাল যেভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা হয়তো শেখ হাসিনা যেভাবে কথাটা বলেছিলেন সে কারণে, ‘আমি বলে দিছি’। কিন্তু তার এই উক্তি সুস্পষ্ট না, এবং এর অর্থ এটা দাঁড় করানো মুশকিল যে হাসিনা এর মাধ্যমে হত্যার ‘নির্দেশ’ দিয়ে দিয়েছেন। 

উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে ‘স্টেট ডিফেন্স কাউন্সেল’ (রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী) হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আমিনুল গনিকে (টিটু) নিয়োগ দেন প্রথমে। তখন অভিযোগ উঠে, আমিনুল গনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্টে শেখ হাসিনার ফাঁসি চেয়েছিলেন। বিতর্কিত পোস্টের কারণে তার পরিবর্তে গত ২৫শে জুন আমির হোসেনকে নিয়োগ করা হয়।

গত ১২ই আগস্ট শেখ হাসিনার পক্ষে আইনজীবী হতে চেয়ে আবেদন করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না। তবে তার আবেদন খারিজ হয়ে যায়। সেদিন ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘শেখ হাসিনার পক্ষে স্টেট ডিফেন্স (রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী) নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এটা ওভার (শেষ)।’

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে আমির হোসেনের। এতে ট্রাইব্যুনাল ও আমির হোসেনের একটি কথোপকথন রয়েছে, তাকে হাসতেও দেখা যাচ্ছিল। তা দেখে তার সমালোচনা করেন অনেকে। তবে আমির হোসেন দাবি করেন, মামলার বিচার কার্যক্রমের একটি অংশকে অসাধু ইউটিউবাররা বাজেভাবে উপস্থাপন করেছেন। 

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে ‘ক্যাঙারু কোর্ট’ (নিয়ন্ত্রিত আদালত) তিনি মনে করেন না এবং এই ট্রাইব্যুনালের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিরপেক্ষতা নিয়েও তার মধ্যে কোনো সংশয় নেই।

আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর ১২ নম্বর ধারার শিরোনাম ডিফেন্স কাউন্সেলের (রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী) বিধান। সেখানে ১ নম্বর উপধারায় বলা হয়েছে, যেখানে একজন অভিযুক্তকে কোনো আইনজীবী যদি প্রতিনিধিত্ব না করেন, ট্রাইব্যুনাল মামলার যেকোনো পর্যায়ে সরকারি খরচে সেই অভিযুক্তের পক্ষে একজন আইনজীবী নিয়োগ দিতে পারবেন এবং তাকে (আইনজীবী) কী পরিমাণ অর্থ প্রদান করা হবে, তা–ও নির্ধারণ করতে পারবেন ট্রাইব্যুনাল।

মানবতাবিরোধী অপরাধের কোনো আসামির আইনজীবী না থাকলে ন্যায়বিচারের স্বার্থে তার জন্য আইনজীবী ট্রাইব্যুনালই দিয়ে থাকেন। সহজ ভাষায়, এটিই রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী। বিচারিক প্রক্রিয়ায় এটি একটি প্রচলিত আচার।

ডেভিড বার্গম্যান

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250