ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া থেকে প্রায় আড়াই মাস আগে নিখোঁজ হয়েছিলেন এক নারী। মানসিক অসুস্থতার কারণে নিজের নাম-ঠিকানাও ঠিকভাবে বলতে পারছিলেন না তিনি। স্বামী আলী হোসেন আত্মীয়স্বজনের বাড়ি, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, মাজারসহ বিভিন্ন জায়গায় খুঁজেছেন। কিন্তু কোথাও স্ত্রীর সন্ধান পাননি। শেষ পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওই তাকে পৌঁছে দেয় স্ত্রীর কাছে।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার গোবিন্দল গ্রামে গিয়ে স্ত্রীকে ফিরে পান ৫৭ বছর বয়সী আলী হোসেন। তিনি সাটুরিয়া উপজেলার বালিয়াটি ইউনিয়নের ভাঙ্গাবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা এবং পেশায় দর্জি। প্রায় দুই মাস ২৩ দিন ধরে নিখোঁজ থাকার পর স্ত্রীর সন্ধান মেলায় স্বামী-স্ত্রীর পুনর্মিলনের দৃশ্য আবেগঘন হয়ে ওঠে। পরে সেই মুহূর্তের ভিডিওও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
ঢাকায় বসে মুঠোফোনে সুখবর ডটকমের সঙ্গে কথা হলে আলী হোসেন বলেন, তার স্ত্রী প্রায় পাঁচ বছর আগে অসুস্থ হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিলেন। তখন ঢাকায় চিকিৎসা করানোর পর তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে প্রায় তিন বছর আগে আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সে সময় নয় দিন নিখোঁজ ছিলেন। পরে তাকে খুঁজে পাওয়া যায়।
আলী হোসেন বলেন, এবারও স্ত্রী নিখোঁজ হওয়ার পর তিনি সম্ভাব্য বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেছেন। কিন্তু কোনোভাবেই সন্ধান পাচ্ছিলেন না। তার ভাষায়, ‘দুই মাস ২৩ দিন পর আমি তাকে খুঁজে পেয়েছি। যে কনটেন্ট ক্রিয়েটরের ভিডিওর মাধ্যমে স্ত্রীর খোঁজ পেয়েছি, তাকে ধন্যবাদ।’
স্বজন ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় আড়াই মাস আগে সাটুরিয়ার ভাঙ্গাবাড়ির বাড়ি থেকে হঠাৎ বের হয়ে যান ওই নারী। এরপর আর বাড়িতে ফেরেননি। মানসিক অসুস্থতার কারণে তিনি নিজের পরিচয় বা ঠিকানা স্পষ্টভাবে জানাতে পারছিলেন না। ফলে পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেও তাকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, নিখোঁজ হওয়ার পর ওই নারী মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার গোবিন্দল গ্রামের একটি সড়কের পাশে অবস্থান করছিলেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রোদ-বৃষ্টির মধ্যে তাকে সেখানে ঘোরাফেরা করতে দেখা যেত। খাবার ও আশ্রয়ের জন্য তিনি মানুষের কাছে যেতেন। কিন্তু তিনি কোথা থেকে এসেছেন বা তার বাড়ি কোথায়—এমন তথ্য নিশ্চিতভাবে জানা যাচ্ছিল না।
এই অবস্থায় ওই নারীর সামনে পড়েন স্থানীয় তরুণ রবিউল হক। তিনি ‘ভয়েস অব রবিউল ভাই’ নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক একটি পেজে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভিডিও তৈরি করেন। রাস্তার পাশে অসহায় অবস্থায় নারীটিকে দেখে তিনি তার বিষয়ে একটি ভিডিও ধারণ করেন। উদ্দেশ্য ছিল, ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়লে হয়তো স্বজনেরা তাকে চিনতে পারবেন।
রবিউল হক মুঠোফোনে সুখবর ডটকমকে বলেন, ওই নারীকে রাস্তার পাশে অসহায় অবস্থায় দেখে তার খারাপ লাগে। তখনই তিনি তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নেন। সেই উদ্দেশ্যেই ভিডিও করে ফেসবুকে প্রকাশ করেন। পরে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে ওই নারীর স্বামীর মুঠোফোনেও পৌঁছে যায়।
ভিডিওটি দেখেই আলী হোসেন তার স্ত্রীকে চিনতে পারেন। দীর্ঘদিন ধরে খুঁজতে থাকা মানুষটি যে সিংগাইরের গোবিন্দল গ্রামের রাস্তার পাশে রয়েছেন, তা নিশ্চিত হওয়ার পর আর দেরি করেননি তিনি। গত ২৮ সেপ্টেম্বর সেখানে গিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন।
স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রকাশিত ভিডিও ও প্রতিবেদনের বর্ণনা অনুযায়ী, স্বামীকে দেখার পর ওই নারীও তাকে চিনতে পারেন। দীর্ঘদিন পর স্ত্রীকে সামনে পেয়ে আলী হোসেন আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। তিনি স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরেন এবং কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরে তাকে বাড়িতে নিয়ে যান।
ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, স্ত্রীকে খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো আনুষ্ঠানিক পরিচয়পত্র বা প্রচলিত যোগাযোগব্যবস্থা নয়, একজন স্থানীয় মানুষের ধারণ করা ভিডিও কার্যকর সূত্র হিসেবে কাজ করেছে। নিখোঁজ নারী নিজের নাম-ঠিকানা বলতে না পারায় তাকে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু ভিডিওতে তার চেহারা দেখে স্বামী তাকে চিনতে সক্ষম হন। এভাবেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি সাধারণ ভিডিও পরিণত হয় পরিবারের কাছে নিখোঁজ একজন মানুষকে ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে।
রবিউল হক বলেন, তিনি ভিডিওটি তৈরি করেছিলেন মূলত ওই নারীকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার আশায়। পরে স্বামী এসে তাকে নিয়ে যাওয়ায় তিনি নিজেও আবেগাপ্লুত হন। তার বক্তব্য, একজন অসহায় মানুষকে আপনজনের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারাটাই তার কাছে সবচেয়ে বড় পাওয়া।
আলী হোসেনের ক্ষেত্রে ঘটনাটি শুধু নিখোঁজ স্ত্রীকে ফিরে পাওয়ার নয়, দীর্ঘ অনিশ্চয়তারও অবসান। প্রায় আড়াই মাস ধরে তিনি জানতেন না তার স্ত্রী কোথায় আছেন, কী অবস্থায় আছেন। অন্যদিকে, স্ত্রীও পরিচিত পরিবেশ ও স্বজনদের বাইরে একটি অপরিচিত এলাকায় অবস্থান করছিলেন। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় একজনের উদ্যোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ এবং পরিবারের একজন সদস্যের সেই ভিডিও দেখে তাকে শনাক্ত করার মধ্য দিয়ে দুই পক্ষের বিচ্ছিন্নতা কাটে।
৩০ সেপ্টেম্বর স্বামী-স্ত্রীর পুনর্মিলনের ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি দেখে অনেকেই আবেগাপ্লুত হন। একই সঙ্গে রবিউল হকের উদ্যোগের প্রশংসাও করেন অনেকে। তবে এই ঘটনার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—নিখোঁজ ব্যক্তির পরিচয় ও অবস্থান জানাতে স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কতটা কার্যকর হতে পারে, তার একটি বাস্তব উদাহরণ তৈরি হয়েছে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায়।
আড়াই মাসের অপেক্ষা শেষে স্ত্রীকে ফিরে পেয়ে আলী হোসেনের কথায় তাই স্বস্তির পাশাপাশি কৃতজ্ঞতাও স্পষ্ট। তার কাছে সেই ভিডিওটি শুধু একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রকাশনা নয়; সেটিই হয়ে উঠেছিল হারিয়ে যাওয়া স্ত্রীকে ফিরে পাওয়ার ঠিকানা।
খবরটি শেয়ার করুন