ছবি: সংগৃহীত
সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিষ্ঠা লাভের পর থেকে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ মোট চারবার নিষিদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার শিকার এবং অন্য রাজনৈতিক দলে একবার 'বিলুপ্ত' হয়। এর মধ্যে তিনবার নিষিদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার শিকার হয়, একবার অন্যদলে বিলুপ্ত এবং সবশেষ একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত দলটির সাংগঠনিক সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত হলো। এগুলোর মধ্যে সাবেক পাকিস্তান আমলে দলটি দুইবার পুরোপুরি নিষিদ্ধ আর স্বাধীন দেশে একবার 'বিলুপ্ত' ও এরপর দুইবার নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে ও দলের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হয়।
এবারই প্রথম আওয়ামী লীগ দল হিসেবে নিষিদ্ধ না হয়ে তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের বিচারকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। গতকাল ১০ই মে রাতে উপদেষ্টা পরিষদের এক বিশেষ সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এ সভায় সভাপতিত্ব করেন।
জানা যায়, ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষণে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে আওয়ামী লীগকে। এর আগে ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের প্রথম সামরিক শাসক হিসেবে আইয়ুব খান ক্ষমতা নেওয়ার পর সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেন। এ সময় অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আওয়ামী লীগও নিষিদ্ধ হয়।
একাধিক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ সুখবর ডটকমকে জানান, ১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে একদলীয় শাসন চালু করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। গঠন করেন বাকশাল। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পর বাকশালের কার্যক্রমসহ সব রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ করা হয় সামরিক আইনে। তখন আওয়ামী লীগের কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়।
রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মো. সায়েম ১৯৭৬ সালে রাজনৈতিক দলের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। এ সময়ে বাকশাল থেকে বেরিয়ে আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত করেন জোহরা তাজউদ্দিনসহ দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারা। তবে নেতৃত্বের বিরোধে আওয়ামী লীগ (মালেক) ও আওয়ামী লীগ (মিজান) দুই ধারায় বিভক্ত হয়। শেখ হাসিনা নেতৃত্বে আসার পর আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ভেঙে আবার বাকশাল গঠিত হয়।
জানা গেছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনালগ্নে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের এক বেতার ভাষণে আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। ওইদিন, ২৬শে মার্চ ১৯৭১ সালের রাতে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে ইয়াহিয়া শেখ মুজিবুর রহমান ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে 'রাষ্ট্রদ্রোহের' অভিযোগ আনেন এবং তাদের ‘পাকিস্তানের শত্রু’ বলে আখ্যায়িত করেন।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বলেন, 'শেখ মুজিব ও তার অনুসারীরা পাকিস্তানকে ভাঙতে চায়—এটি একটি অপরাধ, যার শাস্তি অনিবার্য।' সেই সঙ্গে তিনি ঘোষণা দেন, 'সারাদেশে সব ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং আওয়ামী লীগকেও রাজনৈতিক দল হিসেবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো।'
তার ওই ভাষণে সেন্সর ব্যবস্থা, সামরিক আইন জারি ও সশস্ত্র বাহিনীকে সরকারের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার আদেশ দেওয়ার কথাও উল্লেখ ছিল। পাশাপাশি তিনি বলেন, 'পরিস্থিতির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি অপরিবর্তিত থাকবে।'
তথ্যমতে, ১৯৪৯ সালের ২৩শে জুন ঢাকার টিকাটুলীর ঐতিহ্যবাহী রোজ গার্ডেনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে প্রথম আত্মপ্রকাশ করে দলটি। সেই দলই আজকের আওয়ামী লীগ। প্রতিষ্ঠার ছয় বছরের মাথায় দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়া হয়।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পরের বছর ১৯৫৫ সালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিল হয়। সেই কাউন্সিলেই দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দ বাদ দেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা।
এইচ.এস/
খবরটি শেয়ার করুন