ছবি: সংগৃহীত
সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও তৃতীয় মাত্রা টকশোর উপস্থাপক জিল্লুর রহমান বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ তো নয়ই, বরং সরকারে থাকা অনেকেই, এমনকি সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসও বিভিন্ন সময় প্রতিহিংসা ও ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রাগ-অনুরাগের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করার যে শপথ তারা নিয়েছিলেন, সেই শপথ তারা রক্ষা করতে পেরেছেন বলে আমার মনে হয় না। তারা যেভাবে নিজেদের জন্য সরকারি বা রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধাগুলো নিয়েছেন, তাদের কাছ থেকে আমরা তা আশা করিনি।
তিনি বলেন, এই সরকারকে এক মুহূর্তের জন্য আমার কাছে নিরপেক্ষ বলে মনে হয়নি। এনসিপি নামে যে দলটি গঠিত হয়েছে, সেটা এই সরকারের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে তৈরি হয়েছে। আমি বলব, অন্তর্বর্তী সরকার এই তরুণদের ব্যবহার করেছে এবং তাদের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করেছে। এই সরকারকে আমার কাছে অনেক বেশি জামায়াতে ইসলামীর দ্বারা প্রভাবিত বলে মনে হয়েছে।
তিনি বলেন, আমার কাছে মনে হয় যে পুলিশ নিষ্ক্রিয়, সেনাবাহিনী নির্লিপ্ত এবং প্রশাসন বিভ্রান্ত। প্রশাসন বা আমলাতন্ত্রকে সরকারের নির্দেশ শুনতে হয়; কিন্তু প্রশাসনের ওপর এ সরকারের খুব বেশি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে আমার মনে হয় না। তবে গত ১৭-১৮ মাসে প্রশাসনসহ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় জামায়াত যথেষ্ট প্রভাব তৈরি করতে পেরেছে; বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসের জামায়াত এবার সবচেয়ে অনুকূল পরিবেশ পেয়েছে।
দৈনিক প্রথম আলোকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে জিল্লুর রহমান এসব কথা বলেন। তার সাক্ষাৎকারটি আজ রোববার (১লা ফেব্রুয়ারি) প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয়েছে ‘নির্বাচন ঘিরে আগে এতগুলো দেশের এত সক্রিয়তা দেখা যায়নি’ শিরোনামে। প্রথম আলোর ওয়েবসাইট থেকে সাক্ষাৎকারটির লিংক ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। নানা শ্রেণি-পেশার নেটিজেনদের মধ্যে জিল্লুর রহমানের বক্তব্য নিয়ে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা ও পর্যালোচনা চলছে।
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) সভাপতি জিল্লুর রহমান সাক্ষাৎকারে বলেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কোনোভাবেই অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন বলা যাবে না। কারণ, আওয়ামী লীগ এবং তার মিত্রদের একটা বড় অংশ নির্বাচনে অনুপস্থিত। আওয়ামী লীগ বাইরে এবং এ রকম একটা খারাপ নির্বাচন হবে, সেটাকে আসলে শেষ পর্যন্ত কেউই আর অ্যাকসেপ্ট (গ্রহণ) করতে চাইবে বলে আমার কাছে মনে হয় না।
তিনি বলেন, সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার যে চেষ্টা, এই সরকারের মধ্যে আমি কখনোই সেটা দেখিনি। ঐকমত্য কমিশন আট-নয় মাস ধরে যে আলোচনা করল, সেখানে ৫০-এর বেশি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে থেকে ৩০-৩২টি দল অংশ নিতে পেরেছে। বাকি দলগুলোকে তারা বাইরে রেখেছে বা যুক্ত করার চেষ্টা করেনি। এক্সিকিউটিভ অর্ডারে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম সাসপেন্ডেড, কিন্তু বাকি দলগুলোকে কেন ইনভাইট করা হলো না? তাদের এই আলোচনায় নারীদের প্রতিনিধিত্ব, মাইনরিটি কমিউনিটির প্রতিনিধিত্ব কি দেখা গেছে? তাদের সঙ্গে কি আলাদাভাবে কথা বলা হয়েছে? না, সেটাও হয়নি।
তিনি বলেন, সরকার নিজে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশে বড় দল চারটি-বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি এবং ইসলামী আন্দোলন। প্রধান উপদেষ্টাসহ সরকারের উপদেষ্টারা বিভিন্ন সময়ে এই চারটি দলের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। কোন বিবেচনায়, কীভাবে এই সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হলো? কীভাবে বিবেচনা হলো যে এই চারটিই বড় দল?
তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্তগুলো সরকার নিজের মর্জিমতো নিয়েছে। তার মানে আস্থার সংকট কাটানোর ক্ষেত্রে এই সরকারের আসলে তেমন কোনো ভূমিকা নেই। আমার কাছে বরং মনে হয়েছে যে আস্থার সংকটটা থাকলেই সরকারের সুবিধা। এটা তারা জিইয়ে রাখতে চাইছে। অধ্যাপক ড. ইউনূস দক্ষিণ আফ্রিকার মতো বাংলাদেশের নেলসন ম্যান্ডেলা হতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেই দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারেননি বা সে রকমভাবে কাজ করেননি।
খবরটি শেয়ার করুন