ছবি: সংগৃহীত
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচির মধ্যে গত বৃহস্পতিবার (১৩ই নভেম্বর) রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে গিয়ে মারধরের শিকার হয়েছিলেন এক নারী। এক তরুণীর লাঠি দিয়ে মধ্যবয়সী ওই নারীকে পেটানোর ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। মারধরের শিকার ওই নারীকে গতকাল শুক্রবার (১৪ই নভেম্বর) গত বছরের জুলাই আন্দোলনের সময়ের একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ।
ধানমন্ডি থানা–পুলিশ শুক্রবার বিকেলে সালমা ইসলাম নামের এই নারীকে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে। চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট পার্থ ভদ্র তার জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোস্তফা ফিরোজ এ প্রসঙ্গে বলেন, এক নারী ঢাকার ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে মারধরের শিকার হলেন। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, পুলিশ তার সুরক্ষা দেবে, চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে এবং যারা তাকে মারধর করেছে তাদের আটক করবে—এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু হলো উল্টোটা। সেই নির্যাতিত নারীকে একটি হত্যা মামলায় জড়িয়ে সরাসরি কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। শুক্রবার নিজের ইউটিউব চ্যানেলে তিনি এসব কথা বলেন।
মোস্তফা ফিরোজ বলেন, দেখেন তো—এ কেমন অসাধারণ সরকার আর অসাধারণ আইনের প্রয়োগ! শেখ হাসিনার আমলে মানুষ এসব দেখে দেখে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল। এখন আবার সেই একই পথ—একই আচরণ, ঠিক একইভাবে অনুসরণ করছে বর্তমান সরকার ও প্রশাসন। আগে আওয়ামী লীগ অত্যাচার করত—এখন আবার আওয়ামী লীগকেই অত্যাচার করা হচ্ছে।
রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ির সামনে মারধরের শিকার নারী সালমা ইসলামকে (৪০) জুলাই আন্দোলনের এক হত্যাচেষ্টা মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এর আগে বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের শেখ মুজিবের বাড়ি ভাঙচুরের সময় মারধরের শিকার হন সালমা। তাকে উদ্ধার করে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়।
পরে ইউরোপিয়ান ইউনির্ভাসিটির বিবিএ তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আবু সাইদ মু. সাইম হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে শুক্রবার তাকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা ধানমন্ডি মডেল থানার এসআই আনোয়ার মিয়া।
মামলা করার সময় আসামির তালিকায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ ৩৭ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল। এ মামলা হওয়ার পর এর তদন্তভার গ্রহণ করেন উল্লেখ করে সালমা ইসলামকে নিয়ে আদালতে দেওয়া আবেদনে এসআই আনোয়ার লিখেছেন, ‘অত্র মামলাটির তদন্তকালে তদন্তে প্রাপ্ত প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণে অত্র মামলার ঘটনার সহিত উপরিউক্ত গ্রেপ্তারকৃত আসামি জড়িত মর্মে তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়।’
তদন্ত কর্মকর্তার এ বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন সালমা ইসলামের আইনজীবী আবুল হোসেন। তিনি বলেন, ‘উনি (সালমা ইসলাম) আবেগের বশে গতকাল দুপুরে ধানমন্ডি ৩২ এলাকায় “জয় বাংলা” স্লোগান দেন। সেখানে ওনার ওপর মব সৃষ্টি করে মারধর করা হয়। ভুক্তভোগী হওয়ার পরও ওনাকে আজ আদালতে আনা হয়েছে। জুলাইয়ের হত্যাচেষ্টা মামলা দেওয়া হয়েছে। এটা সম্পূর্ণ অন্যায় হয়েছে। যে অপরাধ উনি করেননি, সে মামলায় ওনাকে আসামি করা হয়েছে। আমরা ন্যায়বিচার চাই।’
মোস্তফা ফিরোজ বলেন, আগামী সোমবার পর্যন্ত নানা ঘটনা প্রবাহ চলতে থাকবে। যাকে সন্দেহ হবে, মারধর করে আওয়ামী লীগের দোসর বলা হবে। মারধর কর পুলিশকে দেওয়া হবে। যারা মারবে, তারা ঠিক আছে। যে মারধরের শিকার হবে সে হবে দোষী। পান্না, লতিফ সিদ্দিকী মুক্তি পাইছেন। ওখানে কি ঘটনা ঘটল? যখন নাকি তাদের ওই অনুষ্ঠান স্থলে ‘মব’ তৈরি হলো তখন পান্না ফোন করল যে পুলিশ ভাইরা আসেন, আমাদেরকে রক্ষা করেন। পুলিশ এসে কি করল ওই যে ফোন করল পান্নাসহ লতিফ সিদ্দিকী ওদেরকে নিয়ে উঠায় নিয়ে চলে গেল। আর যারা মারল, ধরল এরা ঠিক আছে, এখানেও তাই।
তিনি আরো বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময়ের একটি পুরোনো মামলা বের করে এনে সালমাকে জড়ানো হয়েছে। হত্যা মামলা মানেই জামিন পাওয়া কঠিন। তাই গণহারে লোকজনকে হত্যা মামলায় ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে এসব মামলার বিশ্বাসযোগ্যতাও ধ্বংস হচ্ছে। পরে মানুষ বলবে—সবই বানানো মামলা, ক্যাঙ্গারু কোর্ট। ক্রমে সব বিচারব্যবস্থাই অবিশ্বাসী হয়ে যাচ্ছে। সালমা এতই ‘বিপজ্জনক’ যে তাকে জামিনও দেওয়া গেল না! সরাসরি কারাগারে। লজ্জা লাগে, প্রচণ্ড হতাশ লাগে—এসব খবর পড়তে।
খবরটি শেয়ার করুন