নওশাদ জামিল। ছবি: সংগৃহীত
নওশাদ জামিল
সরাসরি বলি, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হবে। এটি অনেকটাই পূর্বনির্ধারিত ফলাফল বলেই মনে হয়। এখন অনেকে বলতে পারেন, কীভাবে? শুনুন, অঙ্কটা খুব জটিল নয়। এ পর্যন্ত দেশে তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিবারই ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়েছে। এবারও ভিন্ন হ্যাঁ জয়ী হবে।
জামায়াত-এনসিপি এবং অন্তর্বর্তী সরকার প্রকাশ্যেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছে। ফলে শেষ পর্যন্ত তাদের প্রত্যাশিত ফলাফলই আসবে এটাই অনুমেয়। তবে ফলাফল অত্যন্ত সূক্ষ্ম কৌশলে সাজানো হতে পারে, যেন তা বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়।
জামায়াত-এনসিপি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের দুটি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য আছে মনে হয়। প্রথমটি হলো, গণভোটে 'হ্যাঁ' জয়যুক্ত ও ক্ষমতার মাঝামাঝি অবস্থান। দ্বিতীয়টি হলো, একটুখানি পড়ুন, সেটিও বুঝতে পারবেন।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে ভবিষ্যতে বিএনপি যদি ক্ষমতাসীন হয়, তাহলে গণভোটের ফল বাস্তবায়নের নামে সরকারের ওপর ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি করা যাবে। বিএনপি সরকারকে রাজনৈতিকভাবে বেকায়দায় ফেলা সম্ভব হবে।
সবশেষে তাদের পরিকল্পনাটা হলো যেভাবে আওয়ামী লীগ সরকারকে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পরাজিত করা হয়েছে, বিএনপিকেও তেমনভাবে পরাজিত করা হবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে জামায়াত-এনসিপি ও অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড সেদিকেই ইঙ্গিত করে বলে মনে হয়।
জামায়াত-শিবির ও এনসিপি বুঝে গেছে, এখনই তারা বাংলাদেশে সরাসরি ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত নয় এবং জনগণের বড় অংশও তাদের ক্ষমতায় দেখতে প্রস্তুত নয়। এজন্য তারা ক্ষমতার শীর্ষে নয় বরং এখন ক্ষমতার মাঝামাঝি অবস্থান নিতে চায় তারা।
এখন অনেকে বলতে পারেন, কীভাবে জামায়াত ক্ষমতার মাঝামাঝি থাকতে চায়? শুনুন, জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান একাধিকবার ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের কথা বলেছেন। বিএনপি কি স্বেচ্ছায় জামায়াত-এনসিপিকে সরকারে নেবে?
এ কথা সবাই মানবেন, বাধ্য না হলে বিএনপি জাতীয় সরকার গঠনে যাবে না। অতীতে বিএনপি ভুল করেছিল জামায়াতকে মন্ত্রিত্ব দিয়ে, এবারও কি জামায়াতকে ক্ষমতার হালুয়া-রুটি দেবে?
বিএনপিকে বাধ্য করার লক্ষ্যেই জামায়াত-এনসিপি ও অন্তর্বর্তী সরকার ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পথে হাঁটতে পারে। নির্বাচনের ফল অত্যন্ত সূক্ষ্ম কৌশলে সাজানো হতে পারে, যেখানে বিএনপি আসনে এগিয়ে থাকবে, তবে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। ফলে সরকার গঠনের জন্য বিএনপিকে বাধ্য হয়ে জামায়াত-এনসিপির সমর্থন নিতে হবে।
ক্ষমতায় যেতে মরিয়া বিএনপি সরকার গঠনের স্বার্থে জামায়াত-এনসিপির শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হবে। ক্ষমতার শরিক করবে তাদের। দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে বিএনপি, তবে ক্ষমতার মাঝখানে অবস্থান করবে জামায়াত-এনসিপি, এটাই হতে পারে তাদের প্রথম কৌশল এবং লক্ষ্য-উদ্দেশ্য।
জামায়াত-এনসিপি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের দ্বিতীয় লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো পরবর্তী অভ্যুত্থান। এ ব্যাপারটা খোলাখুলি বলি।
বিএনপি সরকার গঠন করলেও সামনে দাঁড়াবে অসংখ্য সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের চাপ, সংবিধান পরিবর্তনের দাবি, সারা দেশে ব্যাপক বেকারত্ব, বিপুল বৈদেশিক ঋণ, ইউনূস সরকারের সময়ে করা বিভিন্ন গোপন চুক্তি বাস্তবায়নে বিদেশি চাপ, দেশের অর্থনৈতিক বাজে অবস্থা ইত্যাদি। বিএনপির জন্য সরকার পরিচালনা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
জামায়াত-এনসিপির রাজনৈতিক কৌশলের কারণে বিএনপি সরকার কার্যকরভাবে দেশ পরিচালনায় ব্যর্থ হতে পারে। একপর্যায়ে সমর্থন প্রত্যাহার করলে সংসদ ভেঙে পড়বে।
সবশেষে দেশে পরবর্তী অভ্যুত্থানের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। আর ওই অভ্যুত্থান হলে সরাসরি ইসলামের নামে বিপ্লবী সরকার গঠনের পথ খুলে যেতে পারে, এটাই জামায়াত-শিবির ও এনসিপির গোপন পরিকল্পনা বলে মনে হয়।
শুনুন, জামায়াত-শিবির ও এনসিপি কোনোদিন যদি পুরোপুরিভাবে ক্ষমতাসীন হয়, তবে দেশে ইসলামের নামে স্বৈরতন্ত্র শুরু হবে। তখন ফ্যাসিবাদ কাকে বলে এবং কত প্রকার ও কি কি, হাড়ে-হাড়ে টের পাবেন। দিনশেষে ইসলামের মোড়কে স্বৈরতন্ত্র দেশের জন্য ক্ষতিকর হবে, জাতির জন্য চরম বিভক্তিকর হবে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জন্যও মরণফাঁদ হবে। ব্যবসাবাণিজ্য, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি চরম হুমকিতে পড়বে। দেশের নারী সমাজের অবস্থা কী হবে, তা সহজেই অনুমেয়।
আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করা জামায়াত-শিবিরের জন্য যতটা কঠিন ছিল, বিএনপিকে প্রতিহত করা ততটা কঠিন হবে না। কারণ, বিএনপির রাজনীতির পথ ও মতাদর্শ জামায়াত-শিবিরের কাছে চেনাজানা। এজন্য দেশবিরোধী জামায়াত-শিবিরকে পরাজিত করতে হলে আওয়ামী লীগের প্রয়োজন হবে, হবেই। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে আওয়ামী লীগের প্রয়োজন হবে, হবেই। এ সত্য যারা এখনও বুঝতে পারছেন না, তাদের জন্য কী আর বলব!
লেখক: কবি, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক।
খবরটি শেয়ার করুন