দয়াল চন্দ্র পাল। ছবি: সংগৃহীত
ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজে এক শিক্ষককে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাটি এখন শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি রূপ নিয়েছে ক্ষমতার প্রভাব, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক, এবং সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনায়।
ঘটনাটি ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক কিছু গণমাধ্যমেও বিষয়টি ‘সংখ্যালঘু শিক্ষক নির্যাতন’ হিসেবে উঠে এসেছে, যা নিয়ে উদ্বেগ ও নিন্দা বাড়ছে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের সঙ্গে এক শিক্ষার্থীর একটি ‘অপ্রীতিকর’ ঘটনা ও তার পরবর্তী ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১৬ এপ্রিল। বিদ্যালয়ের বাংলা মাধ্যমের দিবা শাখার দশম শ্রেণির একটি ক্লাসে সহকারী শিক্ষক দয়াল চন্দ্র পালের সঙ্গে এক শিক্ষার্থীর ‘অপ্রীতিকর’ পরিস্থিতি তৈরি হয়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্লাস চলাকালে ওই শিক্ষার্থী বাংলা বিষয়ের একটি প্রশ্ন পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষকের কাছে জানতে চায়। শিক্ষক তাকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু শিক্ষার্থী পুনরায় একই প্রশ্ন করতে এলে একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শ্রেণিকক্ষের গত ১৬ এপ্রিলের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের বাংলা মাধ্যমের দিবা শাখার সহকারী শিক্ষক দয়াল চন্দ্র পালকে বাসায় ডেকে নিয়ে যান সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. আলী রেজা। সেখানে তাকে ‘অপমান ও হেনস্তা’ করেন ওই বিচারপতি ও তার স্ত্রী।
দয়াল চন্দ্র পালের দাবি, ওই শিক্ষার্থী তার সঙ্গে অশোভন আচরণ করে এবং শারীরিকভাবে স্পর্শকাতর স্থানে আঘাত করে। তার ভাষায়, “শিক্ষার্থী আমার পুরুষাঙ্গ ও অণ্ডকোষ চেপে ধরে, যা অত্যন্ত অপমানজনক ও অস্বস্তিকর ছিল।” এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে শিক্ষক ওই শিক্ষার্থীকে থাপ্পড় দেন বলে জানা যায়।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরবর্তী যে পরিস্থিতি তৈরি হয়, সেটিই মূলত বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। শিক্ষকের অভিযোগ, তিনি বিষয়টি সমাধানের জন্য শিক্ষার্থীর অভিভাবককে ফোন করেন এবং স্কুলে এসে আলোচনার অনুরোধ জানান। তবে ১৮ এপ্রিল প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তাকে ওই অভিভাবকের বাসায় যেতে বলা হয়। সেখানে গিয়ে তিনি প্রত্যাশিত সমাধানের পরিবর্তে ‘মানসিক নির্যাতন ও অপমানের’ শিকার হন বলে অভিযোগ করেন।
শিক্ষকের অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ১৮ এপ্রিল তাকে ওই অভিভাবকের বাসায় আমন্ত্রণ জানানো হয়। তিনি বলেন, তিনি আশা করেছিলেন, সেখানেই বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা হবে। তবে সেখানে গিয়ে তিনি মানসিক নির্যাতনের মুখে পড়েন। তার সঙ্গে তখন আরেকজন শিক্ষকও ছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, ওই অভিভাবক একজন উচ্চ আদালতের বিচারপতি। শিক্ষক দাবি করেন, বিচারপতি ও তার স্ত্রী তাকে হেনস্তা করেন। এই অভিযোগ সামনে আসার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং ২৩ এপ্রিল তারা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের মাধ্যমে প্রধান বিচারপতির কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
অন্যদিকে বিচারপতির পক্ষ থেকে রমনা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, কোচিংয়ে না যাওয়ার কারণে শিক্ষক ওই শিক্ষার্থীকে মারধর করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমকির অভিযোগও জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে শিক্ষক এই অভিযোগ অস্বীকার করে সুখবর ডটকমকে বলেন, তিনি নিয়মিত কোচিং করান না এবং বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা।
তিনি বলেন, কোচিং-সংক্রান্ত কোনো কারণে শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ সঠিক নয়। তিনি নিয়মিত কোনো কোচিং বা প্রাইভেট পড়ানও না। সহকর্মীদের সন্তান থাকায় তাদের অনুরোধে একটি বাসায় তিনজন শিক্ষার্থী ও তার নিজের উচ্চমাধ্যমিকে পড়া সন্তানকে নিয়ে পড়াতেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ওই শিক্ষার্থীও সেখানে পড়তে আসে। তবে ওই মাসের পর সে আর এখানে পড়তে আসেনি।
ঘটনার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন জানা যায়, সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীকে অন্য একটি বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়েছে। এতে করে অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে কি না।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। নেটিজেন রাশেদ মাহমুদ লিখেছেন, “একজন শিক্ষককে যদি বিচারপতির বাসায় ডেকে অপমান করা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?” মৌসুমী দত্ত’ মন্তব্য করেন, “এটা শুধু শিক্ষক অপমান নয়, সংখ্যালঘু হওয়ার কারণেও তাকে টার্গেট করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের মধ্যে একটি নৈতিক কাঠামো রয়েছে। কিন্তু যখন ক্ষমতার অসমতা যুক্ত হয়, তখন সেই কাঠামো ভেঙে পড়ে। এখানে বিচারপতির অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর।
আইন বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট নুসরাত জাহান বলেন, “যদি সত্যিই কোনো বিচারপতি তার ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে একজন শিক্ষককে হেনস্তা করে থাকেন, তাহলে তা বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বিষয়টি স্বাধীন তদন্তের দাবি রাখে।”
এই ঘটনাটি নতুন নয়—এর আগে ২০২৩ সালের মার্চে বগুড়ার একটি বিদ্যালয়ে একই ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল। বগুড়া সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষ ঝাড়ু দেওয়া নিয়ে অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীর সঙ্গে সহপাঠীদের বিরোধ হয়। পরে ওই ছাত্রীর মা, যিনি একজন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ, বিষয়টি আদালতে না নিয়ে সরাসরি বিদ্যালয়ে গিয়ে অভিভাবকদের ডেকে অপমান করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
শিক্ষার্থীদের দাবি, বিচারকের মেয়েকে কেন্দ্র করে ফেসবুকে পাল্টাপাল্টি মন্তব্যের জেরে দুই অভিভাবককে অপদস্থ করা হয়। এর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা তখন সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে। এই ঘটনাও তখন ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল এবং প্রশ্ন উঠেছিল—বিচারকদের সন্তান কি বিদ্যালয়ের নিয়মের ঊর্ধ্বে?
বর্তমান ঘটনাটির সঙ্গে বগুড়ার ঘটনার মিল খুঁজে পাচ্ছেন অনেকে। উভয় ক্ষেত্রেই অভিযোগ উঠেছে, বিচার বিভাগের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা নিজেদের অবস্থান ব্যবহার করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব ঘটনা সমাজে একটি বিপজ্জনক বার্তা দেয়। এতে করে শিক্ষকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। একজন শিক্ষক যদি নিজের ক্লাসে স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারেন, তাহলে শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দয়াল চন্দ্র পাল নিজেও এখন আতঙ্কে রয়েছেন। তিনি সুখবর ডটকমকে জানিয়েছেন, “আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। যেকোনো সময় আমাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে—এই ভয় কাজ করছে।” একজন শিক্ষক হিসেবে তার এই অবস্থান নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।
এই পুরো ঘটনাকে ঘিরে এখন মূল প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—আইনের শাসন কি সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য? বিচার বিভাগের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সন্তানদের কি বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজন শিক্ষক যদি ন্যায়বিচার না পান, তাহলে তা দেশের সামগ্রিক বিচারব্যবস্থার ওপর কী প্রভাব ফেলবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ তদন্ত জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
ঘটনাটি এখন যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে এটি শুধু একটি স্কুলের ভেতরের বিষয় নয়; বরং এটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা এবং সামাজিক ন্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
খবরটি শেয়ার করুন