ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর ব্যস্ত নগরজীবনে মানুষ প্রতিদিন অসংখ্য মৃত্যুর খবর শোনে। কিন্তু কিছু মৃত্যু শুধু একজন মানুষের জীবনাবসানের খবর নয়, বরং সমাজের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করে। মিরপুরের একটি ফ্ল্যাট থেকে ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগমের পচাগলা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাটি তেমনই এক বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে উঠেছে।
গত রোববার (৩১ মে) রাতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে মিরপুর-৬-এর সি ব্লকের ১৩ নম্বর সড়কের ৮ নম্বর বাড়ির চতুর্থ তলার একটি ফ্ল্যাটে যায় পুলিশ। সেখানে গিয়ে তারা নূরজাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মৃত্যুর অন্তত সাত থেকে আট দিন পর তার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, ফ্ল্যাটের যে কক্ষে তিনি থাকতেন, সেটি ছিল অত্যন্ত অপরিচ্ছন্ন ও অগোছালো। চারদিকে আবর্জনা ছড়িয়ে ছিল। ঘরের পরিবেশ দেখে তাদের মনে হয়েছে, বৃদ্ধার জীবনের শেষ সময়গুলো কেটেছে চরম অবহেলা, একাকিত্ব ও অযত্নের মধ্যে।
পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাসান বাসির মঙ্গলবার সুখবর ডটকমকে জানান, নূরজাহান বেগম তার মেয়ের সঙ্গে একই বাসায় থাকলেও আলাদা একটি কক্ষে বসবাস করতেন। কয়েক দিন ধরে কোনো সাড়া না পেয়ে তার মেয়ে একজন নার্সকে ডেকে আনেন। পরে ওই কক্ষে গিয়ে নূরজাহান বেগমকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
মৃত্যুর সময় ও পরিস্থিতি সম্পর্কে পরিবারের কাছ থেকে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। এমনকি তার মেয়ে মায়ের মৃত্যুর সঠিক সময়ও বলতে পারেননি। এ কারণে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানার জন্য ময়নাতদন্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নূরজাহান বেগমের মৃত্যুর ঘটনা সামনে আসার পর মানুষের মনে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে তার সন্তানদের পরিচয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি এমন একজন মা, যার সন্তানরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত এবং উচ্চশিক্ষিত।
তার বড় ছেলে আনিসুর রহমান খুলনা সমুদ্র বন্দরের যুগ্মসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মেজো ছেলে আশিকুর রহমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক। ছোট ছেলে আতিকুর রহমান কানাডাপ্রবাসী। একমাত্র মেয়ে ফাতিমা নাসরিন সুলতানা। তার স্বামী গোলাম সাকলাইন সাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। প্রায় পাঁচ বছর আগে স্বামীর মৃত্যু হওয়ার পর ফাতিমা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন বলে পরিবারের সূত্র জানিয়েছে। তাদের কোনো সন্তান নেই।
মঙ্গলবার (২ জুন) সরেজমিনে ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটক ভেতর থেকে বন্ধ। চারপাশে নীরবতা। গেট খুলে কথা বলেন জহির নামে এক ভাড়াটিয়া। তিনি জানান, প্রায় চার বছর ধরে তিনি ওই বাড়িতে থাকেন। তার ভাষ্য, প্রায় দেড় বছর আগে নূরজাহান বেগম মেয়ের বাসায় এসে ওঠেন। তারপর থেকে মা ও মেয়ে একসঙ্গেই ছিলেন।
জহিরের দাবি, নূরজাহান বেগমের তিন ছেলে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হলেও তাদের কাউকে খুব একটা আসতে দেখা যেত না। তিনি বলেন, মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে বুয়েটে কর্মরত ছেলে এসেছিলেন, তবে যুগ্ম সচিব ছেলে আসেননি।
স্থানীয় সূত্রগুলো আরও জানায়, এর আগে নূরজাহান বেগম তার মেজো ছেলে আশিকুর রহমানের আজিমপুরের পলাশী এলাকার বাসায় থাকতেন। সেখানে বিভিন্ন কারণে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পেরে পরে মিরপুরে মেয়ের বাসায় চলে আসেন।
ঘটনার পর সোমবার (১ জুন) পল্লবী থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করেন ফাতিমা নাসরিন সুলতানা। মামলায় তিনি উল্লেখ করেন, তার মা বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে মারা গেছেন। পরিবারের কারও বিরুদ্ধে তার কোনো অভিযোগ বা সন্দেহ নেই বলেও সেখানে উল্লেখ করা হয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই শামছুর রহমান সুখবর ডটকমকে বলেন, নূরজাহান বেগমের তিন ছেলে সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত। একজন যুগ্ম সচিব, একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং একজন বিদেশে থাকেন। এমন একজন মায়ের শেষ জীবনে এত অবহেলা পাওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক।
এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, প্রতিষ্ঠিত সন্তান থাকা সত্ত্বেও কেন একজন বৃদ্ধা মাকে এমন পরিবেশে জীবন কাটাতে হলো? কেন তার মৃত্যুর কয়েক দিন পর বিষয়টি সামনে এলো? এসব প্রশ্নের উত্তর হয়তো তদন্তে মিলবে, আবার কিছু প্রশ্ন হয়তো উত্তরহীনই থেকে যাবে।
বাবা-মায়ের ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে ২০১৩ সালে ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন’ প্রণয়ন করা হয়। আইন অনুযায়ী, প্রত্যেক সক্ষম সন্তান তার বাবা-মায়ের খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান ও প্রয়োজনীয় সঙ্গ নিশ্চিত করতে বাধ্য। আইনটি ভঙ্গ করলে এক লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা কিংবা কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
তবে আইন থাকলেও বাস্তবে অনেক প্রবীণ বাবা-মা অবহেলা, একাকিত্ব ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আইনটি কার্যকর হওয়ার এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এ-সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা খুবই কম। অনেক প্রবীণ বাবা-মা সামাজিক সংকোচ, পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয় কিংবা সন্তানদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে না চাওয়ার কারণে অভিযোগ করেন না।
নূরজাহান বেগমের মৃত্যু তাই শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়। এটি এমন এক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে অনেক সময় বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ববোধকে ছাপিয়ে যায় ব্যস্ততা, দূরত্ব কিংবা সম্পর্কের ভাঙন। জীবনের শুরুতে যারা সন্তানের জন্য নির্ঘুম রাত কাটান, বার্ধক্যে এসে তাদের অনেকেরই সঙ্গী হয় নিঃসঙ্গতা।
একটি সমাজের মানবিকতা পরিমাপ করা যায় তার শিশু ও প্রবীণদের অবস্থান দেখে। মিরপুরের ওই ফ্ল্যাটে নূরজাহান বেগমের নিঃসঙ্গ মৃত্যু তাই শুধু একটি মৃত্যুর খবর নয়; এটি বর্তমান সময়ের এক নির্মম আয়না, যেখানে প্রশ্নটি বারবার ফিরে আসে—প্রতিষ্ঠা, পদমর্যাদা কিংবা সাফল্যের সব হিসাবের শেষে একজন মায়ের প্রাপ্য কি শুধু একটি বন্ধ দরজার ওপাশে নীরব মৃত্যু?
খবরটি শেয়ার করুন