ফাইল ছবি
জামালপুরের সদর উপজেলার তিতপল্লা ইউনিয়নের চরশী খলিফা পাড়ায় অবস্থিত চরশী হাবিরুন্নেসা হাফিজিয়া মাদ্রাসাটি একসময় দেশের আলোচিত জঙ্গি সংগঠন জামাআ’তুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আব্দুর রহমানের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে ব্যাপক পরিচিতি পায়। প্রায় দুই দশক বন্ধ থাকার পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আবার চালু হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বিষয়টি সামনে আসার পর উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদবিরোধী বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
তাদের মতে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত অভিযোগ না থাকলে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় বাধা দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে অতীতের ইতিহাস বিবেচনায় রাষ্ট্রীয় নজরদারি ও সামাজিক সতর্কতা জরুরি।
স্থানীয় সূত্র ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরুতে পুনরায় চালু হয় মাদ্রাসাটি। বর্তমানে এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শায়খ আব্দুর রহমানের ভাই ওবায়দুর রহমান। তিনি নিজেও জেএমবি-সংশ্লিষ্ট মামলায় দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন বলে স্থানীয়রা জানান।
জামালপুর শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই মাদ্রাসার সঙ্গে শায়খ আব্দুর রহমানের সম্পর্ক নতুন নয়। তিনি এখানে শিক্ষকতা করতেন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন তদন্ত ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে অতীতে অভিযোগ ওঠে যে, মাদ্রাসাটিকে জঙ্গি তৎপরতার একটি কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো। মাদ্রাসাটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তার বাবা আব্দুল্লাহ ইবনে ফজল, যিনি ফজল মুন্সী নামেও পরিচিত।
জেএমবির উত্থানের ইতিহাস দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত সংগঠনটি প্রথমদিকে আড়ালে থাকলেও ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে প্রায় ৫০০ বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসে। ওই হামলার মাধ্যমে সংগঠনটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিরুদ্ধে নিজেদের শক্তির প্রকাশ ঘটায়। পরে বিচারক হত্যা, আত্মঘাতী হামলা এবং বিভিন্ন স্থানে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় জেএমবির সম্পৃক্ততা উঠে আসে।
জেএমবির প্রতিষ্ঠাতা ও শীর্ষ নেতা শায়খ আব্দুর রহমান ২০০৬ সালের ২ মার্চ সিলেটে র্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার হন। তার সঙ্গে সংগঠনের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা সিদ্দিকুর রহমান ওরফে বাংলা ভাইসহ অন্য নেতারাও ধরা পড়েন। বিচার শেষে ঝালকাঠির দুই বিচারক হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় জেএমবি নেতার সঙ্গে ২০০৭ সালের ৩০ মার্চ তাঁর ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ফাঁসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া অন্য নেতাদের মধ্যে ছিলেন বাংলা ভাই, আতাউর রহমান সানি, খালেদ সাইফুল্লাহ, আবদুল আউয়াল ও ইফতেখার হাসান আল মামুন।
ফাঁসির পর দীর্ঘ সময় কার্যত অচল হয়ে পড়ে চরশী হাবিরুন্নেসা হাফিজিয়া মাদ্রাসা। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বহু বছর সেখানে কোনো নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম ছিল না। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের কয়েক মাস পর নতুন উদ্যোগে আবার চালু করা হয় প্রতিষ্ঠানটি।
বর্তমানে মাদ্রাসাটির ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন টাঙ্গাইলের একটি মাদ্রাসার ভাইস-প্রিন্সিপাল মো. আমিনুল ইসলাম। প্রধান শিক্ষক মো. জাকারিয়া হোসেন এবং পরিচালক ওবায়দুর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় এক একর জমির ওপর গড়ে ওঠা মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে রয়েছে একটি পুরোনো মসজিদ ও তিনটি আধাপাকা ভবন। একটি ভবনে প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং অন্য দুটি ভবনে পাঠদান চলছে। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দাবি, বর্তমানে সেখানে শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা ও নূরানি পদ্ধতিতে শিক্ষা দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাসিক ২০০ থেকে ৫০০ টাকা বেতন নেওয়া হয়।
সহকারী শিক্ষক মো. রাকিব বলেন, এটি এখন একটি সাধারণ ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। সহকারী পরিচালক মো. শাহজামাল জানান, মাদ্রাসাটিতে মোট ১১ জন কর্মী কাজ করছেন। তাদের মধ্যে শিক্ষক ও কর্মচারী উভয়ই রয়েছেন এবং প্রায় সবাই স্থানীয় এলাকার বাসিন্দা।
প্রধান শিক্ষক মো. জাকারিয়া হোসেনের বক্তব্যে উঠে এসেছে অতীত ও বর্তমানের পার্থক্য। তিনি বলেন, ২০০০ সালের দিকে মাদ্রাসাটি খুব সক্রিয় ছিল, তবে তখন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই বাইরের এলাকার মানুষ ছিলেন। স্থানীয়রা সহজে সেখানে প্রবেশ করতে পারতেন না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পরিস্থিতি ভিন্ন এবং মাদ্রাসার দরজা সবার জন্য খোলা।
মাদ্রাসার পরিচালক ওবায়দুর রহমানের পরিবারের পক্ষ থেকেও অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। তার স্ত্রী সাবিনা খাতুন বলেন, জমি-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে কিছু ব্যক্তি পুরোনো ইতিহাস টেনে এনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছেন। পরে ওবায়দুর রহমান নিজেও বলেন, মাদ্রাসাটি কোনো সরকারি আদেশে বন্ধ করা হয়নি। তাই পুনরায় চালুর ক্ষেত্রেও আলাদা অনুমতির প্রয়োজন হয়নি। তিনি দাবি করেন, স্থানীয় মানুষের অনুদান ও কিছু সরকারি সহায়তায় প্রতিষ্ঠানটি চলছে।
তবে বিষয়টি শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, দেশের জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযানের ইতিহাসে জেএমবি একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি প্রতিষ্ঠান পুনরায় সক্রিয় হওয়া স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন তৈরি করবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ধারাবাহিক সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অতীতে উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকলে সেগুলোর ওপর রাষ্ট্রের পর্যবেক্ষণ থাকা প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও সন্ত্রাসবাদ গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, জঙ্গিবাদ কেবল সংগঠনভিত্তিক সমস্যা নয়; এটি একটি মতাদর্শগত চ্যালেঞ্জ। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠান বৈধভাবে পরিচালিত হলেও সেখানে কী ধরনের শিক্ষা, বক্তব্য বা মতাদর্শ প্রচার করা হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
জেএমবির সাংগঠনিক শক্তি আগের তুলনায় অনেক দুর্বল হলেও বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সংগঠনটির পুনর্গঠনের চেষ্টা নিয়ে সতর্ক করেছে। অতীতে জেএমবির শীর্ষ নেতৃত্বের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পরও সংগঠনের বিভিন্ন অংশ নতুন নেতৃত্বে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করেছে বলে একাধিক তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
জামালপুরের এই মাদ্রাসাটি আবার চালু হওয়ার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ এটিকে একটি ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ অতীতের ইতিহাসের কারণে সতর্ক দৃষ্টিতে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো প্রতিষ্ঠানকে শুধু অতীত পরিচয়ের ভিত্তিতে নিষিদ্ধ বা বাধাগ্রস্ত করার সুযোগ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, দেশের ইতিহাসে জেএমবির মতো সংগঠন ভয়াবহ সহিংসতা, বোমা হামলা ও বিচারক হত্যার মতো ঘটনায় জড়িত ছিল। ফলে তাদের প্রতিষ্ঠাতা বা নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো প্রতিষ্ঠান পুনরায় সক্রিয় হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন এবং সমাজের দায়িত্বশীল অংশের সতর্ক দৃষ্টি থাকা প্রয়োজন।
দুই দশক আগে যে মাদ্রাসার নাম উচ্চারিত হতো জঙ্গিবাদবিষয়ক আলোচনায়, সেটি এখন নতুন পরিচয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালানোর দাবি করছে। সেই দাবি কতটা বাস্তব, আর অতীতের ছায়া কতটা দূর হয়েছে—সেই প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে। তবে উগ্রবাদবিরোধী লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা বলছে, ইতিহাসকে ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই।
খবরটি শেয়ার করুন