মঙ্গলবার, ১৩ই অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৭শে আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** নিজেকে সর্বকালের সেরা ও পরিপূর্ণ ফুটবলার দাবি রোনালদোর *** অপমানিত ড. ইউনূস, বার্লিন সফর বাতিল, বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনের ওয়েবসাইট থেকে নাম বাদ *** সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগে মামলা দিল পুলিশ *** ইয়েমেনের হুতিদের লক্ষ্য কেন সৌদি আরবের বিমানবন্দর *** এবার এয়ারলাইনসগুলোকে সৌদি আকাশসীমা এড়িয়ে চলার হুঁশিয়ারি হুতিদের *** চকবাজারে আগুন, সরু গলি ও পানি স্বল্পতায় বেগ পেতে হচ্ছে ফায়ার সার্ভিসকে *** নিরাপত্তার কারণে ঢাকা-দাম্মাম রুটে বিমানের ফ্লাইট স্থগিত *** দুর্গাপূজায় টানা ৫ দিন বন্ধ থাকবে ব্যাংক *** রবীন্দ্রসংগীতকে ব্যঙ্গ করে আম্মারের ‘রঠা সংগীত’ *** রাহুল, প্রিয়াঙ্কা ও নেহা বোরার নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে পদযাত্রা, আটকে দিল পুলিশ

সুখবর এক্সপ্লেইনার

অপমানিত ড. ইউনূস, বার্লিন সফর বাতিল, বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনের ওয়েবসাইট থেকে নাম বাদ

শুভ্র বড়ুয়া

🕒 প্রকাশ: ১১:৩৬ অপরাহ্ন, ১২ই অক্টোবর ২০২৬

#

ফাইল ছবি

জার্মানির রাজধানী বার্লিনে তিন দিনের বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে সফর বাতিল হয়েছে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের। আয়োজকদের ভাষ্য, স্বাস্থ্যগত কারণে তিনি সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন না। তবে তার অংশগ্রহণ নিয়ে ইউরোপের পাঁচটি সংগঠনের আপত্তি, বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্নের মধ্যে এই সিদ্ধান্তের কথা জানা গেল।

গতকাল রোববার, ১১ অক্টোবর শুরু হওয়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলন চলবে আগামীকাল মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত। এবারের প্রতিপাদ্য ‘সংকট থেকে স্থিতিস্থাপকতা: স্বাস্থ্যের জন্য উদ্ভাবন’। সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, সরকারি কর্মকর্তা ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্ত্রী ও চিকিৎসক জোবাইদা রহমানও সম্মেলনের একটি অধিবেশনে অংশ নিচ্ছেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্মেলনের যোগাযোগ দলের পক্ষে আনা স্টোরমার ইমেইলে জানিয়েছেন, স্বাস্থ্যগত কারণে মুহাম্মদ ইউনূস তার অংশগ্রহণ বাতিল করেছেন। সম্মেলনের ওয়েবসাইটে আগে বক্তা হিসেবে তার নাম থাকলেও পরে তা সরিয়ে নেওয়া হয়। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে ঢাকার ইউনূস সেন্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে সাড়া পাওয়া যায়নি।

বাংলা ট্রিবিউন ও সমকাল ইউনূসের সম্মেলনে যোগ না দেওয়ার খবর প্রকাশ করেছে। এসব প্রতিবেদনে আয়োজকদের বক্তব্যের পাশাপাশি ইউরোপভিত্তিক পাঁচটি সংগঠনের আপত্তির বিষয়টি উঠে এসেছে।

ইউনূসের অংশগ্রহণ পুনর্বিবেচনার দাবিতে গত সেপ্টেম্বরে সম্মেলন আয়োজকদের কাছে পিটিশন দিয়েছিল সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরাম, ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ ফোরাম, ওয়ার্কিং গ্রুপ বাংলাদেশ ইন জার্মানি, আর্থ সিভিলাইজেশন নেটওয়ার্ক এবং ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস অ্যালায়েন্স। সংগঠনগুলোর দাবি ছিল, বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি এবং টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলো স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

পিটিশনে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন, টিকার সরবরাহ এবং জরুরি টিকাদান কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়। সংগঠনগুলো সম্মেলনে ইউনূসের বিশেষ বক্তা হিসেবে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে বলে। তার আমন্ত্রণ বহাল থাকলে বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানানোর দাবিও ছিল তাদের। পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুদের পরিবার, শিশু চিকিৎসক ও স্বাধীন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

দেশে ২০২৬ সালে হামের প্রাদুর্ভাব জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। রয়টার্সের ৬ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে ডেঙ্গুর পাশাপাশি হাম পরিস্থিতিও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। প্রতিবেদনে হামে এক হাজার এক শয়ের বেশি শিশুর মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়।

এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ কার্যালয় ৪ অক্টোবর জানায়, সরকারের অনুরোধে দেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি এবং টিকাপ্রতিরোধী রোগ শনাক্ত করার ব্যবস্থা পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৪ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত এই পর্যালোচনা চালানোর কথা। এতে দেশের আটটি বিভাগের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের হাম পরিস্থিতি টিকাদানের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ঘাটতি ও দুর্বলতা সামনে এনেছে।

হাম পরিস্থিতি নিয়ে ইউনূসের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে মামলা করার একটি আবেদনও আদালতে গিয়েছিল।বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ৮ জুনের প্রতিবেদনে বলা হয়, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা, সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা নেওয়ার আবেদন আদালত খারিজ করেন। আবেদনে টিকা আমদানি ও সরবরাহ নিয়ে অভিযোগ তোলা হয়েছিল।

বার্লিনের সম্মেলনে ইউনূসের অনুপস্থিতির খবর এমন সময়ে এল, যখন তার নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার রাজনৈতিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। এর মধ্যে ছিল জনতার সহিংসতা, ধর্মীয় উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর তৎপরতা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা এবং আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত করা। এসব বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের চলতি বছরের বিশ্ব প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং মানবাধিকার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সমস্যার মুখে পড়ে। প্রতিবেদনে রাজনৈতিক দল ও অন্যান্য গোষ্ঠীর জনতার সহিংসতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়। এতে দেশের মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ২০২৫ সালের জুন থেকে আগস্টের মধ্যে জনতার হামলায় অন্তত ১২৪ জন নিহত হন।

প্রতিবেদনে ধর্মীয় কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতার কথাও উল্লেখ করা হয়। নারীর অধিকার এবং যৌন সংখ্যালঘুদের অধিকারের বিরোধিতাকারী গোষ্ঠীগুলোর সহিংসতা ও হয়রানির বিষয়টি তুলে ধরে সংস্থাটি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ভাষ্য, অন্তর্বর্তী সরকার এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিশোধমূলক হামলা, সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে আক্রমণ এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ব্যক্তিদের ওপর হামলার খবর প্রকাশিত হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৫ সালের বিশ্ব প্রতিবেদনে এসব ঘটনার বিবরণ রয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তি এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুরাও হামলার শিকার হন।

আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের অন্যতম বিতর্কিত পদক্ষেপ। ২০২৫ সালের ১০ মে সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। পরদিন রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় নিরাপত্তা এবং জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে নিহত ব্যক্তিদের ঘটনায় বিচারপ্রক্রিয়ার যুক্তি দেখিয়ে সরকার এ সিদ্ধান্ত নেয়। দলটির নেতারা সিদ্ধান্তকে অবৈধ বলে প্রত্যাখ্যান করেন।

২০২৫ সালের জুনে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইউনূস বলেছিলেন, আওয়ামী লীগকে তখন আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়নি; দলটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে। নির্বাচনে দলটি অংশ নিতে পারবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের বলে মন্তব্য করেছিলেন তিনি। তবে কার্যক্রম স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক সংগঠনের স্বাধীনতা ও নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার নিয়ে বিতর্ক তৈরি করে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও তাদের বাংলাদেশবিষয়ক প্রতিবেদনে এ সিদ্ধান্তের ফলে সংগঠন করার স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার কথা উল্লেখ করেছে।

জঙ্গি মামলার আসামিদের জামিনে মুক্তি নিয়েও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রশ্ন ওঠে। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ইউনূস সরকারের প্রথম চার মাসে ১৭৪ জন জঙ্গিকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়ার দাবি করে। জামিনে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সদস্য থাকার অভিযোগও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের একটি অংশ ছিল এ ধরনের মুক্তি এবং জঙ্গিবাদ মোকাবিলার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি পর্যালোচনা এবং হাম পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি এখন জনস্বাস্থ্য আলোচনার অংশ। একই সময়ে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের আইনশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক অধিকার, জনতার সহিংসতা ও জঙ্গিবাদ মোকাবিলার রেকর্ডও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

মুহাম্মদ ইউনূস

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250