রবিবার, ২৫শে অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১০ই কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ

*** আজই ইরানে ফের হামলার ইঙ্গিত দিলেন ট্রাম্প *** সচিবালয়ে দর্শনার্থী প্রবেশের নিয়ম-কানুন পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর *** এইচএসসি-সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ ২৯ অক্টোবর *** টঙ্গীতে মাদ্রাসাছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে পুলিশ *** তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে উচ্চকক্ষ থেকে নিয়োগের প্রস্তাব *** সাঈদীর মামলার বাদী মুক্তিযোদ্ধা মানিকের লাশ দাফনে বাধা, গোপনে গার্ড অব অনার *** মৃত্যুর জন্য ইউএনওকে দায়ী করে এসি ল্যান্ডের ফেসবুক পোস্ট, পরিবারের দাবি মানসিক সমস্যা *** সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডে কূটনৈতিক যোগাযোগের ফাঁক উন্মোচিত, ঢাকার অজান্তেই আরও ২০ জনের পরিণতি অনিশ্চিত *** আসিফ আকবরের চালকের পেছনের আসন বরাবর গুলি করা হয় *** এমপির বক্তব্যে ইউএনওর হাততালি, সমালোচনার মুখে বললেন ‘ভাইরাল হতে চাই’

ইরানের জনগণ প্রশংসার দাবিদার

জেবিন শান্তনু

🕒 প্রকাশ: ০৬:১৯ অপরাহ্ন, ১০ই এপ্রিল ২০২৬

#

ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক রাজনীতির সাম্প্রতিক এক ভয়াবহ অধ্যায় আমাদের সামনে এমন এক বাস্তবতা উন্মোচন করেছে, যা কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়—পুরো বিশ্বকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। যুদ্ধ, কূটনীতি ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের এই জটিল সমীকরণে প্রশ্ন উঠেছে—আমরা কি সত্যিই একটি পারমাণবিক বিপর্যয়ের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম?

ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম তার বিশ্লেষণে এই আশঙ্কাকেই সামনে এনেছেন। তিনি লিখেছেন, “সম্প্রতি দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে যেটি থামানো হয়েছে, সেখানে যুদ্ধের চেয়ে বেশি ছিল উন্মাদনা। এমন এক উন্মাদনা, যা বিশ্বকে পারমাণবিক বিপর্যয়ের কিনারায় নিয়ে গিয়েছিল, যা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকেও নিয়ে যেতে পারত।”

ঘটনার সূত্রপাত ২৮ ফেব্রুয়ারির সেই আকস্মিক হামলা, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে টার্গেট করা হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মনে করেছিলেন, এই ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’ ইরান রাষ্ট্রকে ভেঙে ফেলবে।

আজ শুক্রবার, ১০ এপ্রিল "ওয়ার উই ক্লোজ টু আ নিউক্লিয়ার ক্যাটাস্ট্রফি" শিরোনামে ডেইলি স্টারের ছাপা সংস্করণে প্রবীণ সম্পাদক মাহফুজ আনামের লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে। তিনি লিখেছেন, “ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বলেছিলেন, ইরানের ওই নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করে দিলে দেশটি ভেঙে পড়বে এবং যুক্তরাষ্ট্রবান্ধব ও ইসরায়েলের অনুগত একটি সরকার সেখানে ক্ষমতায় আসবে।”

কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাষ্ট্র হিসেবে ইরান ভেঙে পড়েনি; বরং প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। এই প্রতিরোধ শুধু সামরিক নয়, রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবেও দৃশ্যমান হয়েছে।

ইরান পাল্টা হামলা চালিয়েছে, তবে তা ছিল কৌশলগতভাবে সীমিত। উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এই প্রসঙ্গে আনাম বলেন, “তারা কয়েকটি উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশে হামলা চালিয়েছে... যখন সংশ্লিষ্ট দেশগুলো তাদের ভূখণ্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলকে হামলা চালানোর অনুমতি দিচ্ছিল।”

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ইরান তার প্রতিরোধকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। সরাসরি বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত না করে তারা আন্তর্জাতিক জনমতকেও বিবেচনায় রেখেছে। এই সংঘাতের প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার ধাক্কা লেগেছে বাংলাদেশেও।

মাহফুজ আনাম উল্লেখ করেন, “বাংলাদেশে আমরা আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মারাত্মক বিঘ্নের সম্মুখীন হয়েছি।” বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী—জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমবে, লাখ লাখ মানুষ দারিদ্র্যে আটকে থাকবে, কর্মসংস্থান কমে যাবে এবং ঋণের বোঝা বাড়বে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠে—একটি আঞ্চলিক সংঘাত কীভাবে এত দ্রুত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নেয়? উত্তরটি স্পষ্ট: জ্বালানি, বাণিজ্য ও আর্থিক প্রবাহ—সবকিছুই এখন আন্তঃনির্ভরশীল।

মাহফুজ আনামের ভাষায়, এই সংঘাতে যুক্ত পরাশক্তিগুলোর আচরণ ছিল উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, “এই যুদ্ধে আমরা এমন পরাশক্তি দেখছি, যারা অন্ধভাবে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও সম্প্রসারণবাদী শক্তির দ্বারা অযৌক্তিকভাবে প্রভাবিত।” তিনি বলেন, ইরানের জনগণ প্রশংসার দাবিদার।

এখানে তিনি মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার সমালোচনা করেছেন। যুক্তির বদলে প্রবৃত্তি এবং কৌশলের বদলে আবেগ—এমন অভিযোগ তোলা হয়েছে।

বিশেষ করে ট্রাম্পের কিছু বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। মাহফুজ আনাম লিখেছেন, “‘আজ রাতে পুরো একটি সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে’—এমন ঘোষণা দেন ট্রাম্প।” এই ধরনের বক্তব্য কেবল রাজনৈতিক নয়, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও প্রশ্নবিদ্ধ।

সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি ছিল পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা। মাহফুজ আনাম সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, “কোনো সভ্যতার সব মানুষকে হত্যা না করে কীভাবে এটিকে ধ্বংস করা যায়?... এটি কেবল পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করেই সম্ভব।”

এই মন্তব্যে একটি গভীর উদ্বেগ প্রতিফলিত হয়—যদি সংঘাত আরও বিস্তৃত হতো, তাহলে কি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি হতো?

২র জেসিপিওএ চুক্তিকে কেন্দ্র করেও গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ দিয়েছেন মাহফুজ আনাম। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, এই চুক্তির মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল।

কিন্তু ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ায়। মাহফুজ আনামের মতে, “শান্তিপূর্ণ সমাধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হারিয়ে যায়।” এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই পরিস্থিতি ধীরে ধীরে সংঘাতের দিকে গড়াতে থাকে।

মাহফুজ আনাম মনে করেন, পুরো প্রক্রিয়ায় ইসরায়েলের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী। তার ভাষায়, “ইসরায়েল কখনোই চায়নি কোনো শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়া সফল হোক।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, কীভাবে নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপে প্রভাবিত করেন। এমনকি মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সংশয় ছিল।

বর্তমানে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যদিও মাহফুজ আনাম সতর্ক করে দিয়েছেন, “ইসরায়েল এটি ব্যাহত করার চেষ্টা করবে, যার প্রাথমিক লক্ষণ ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান।” এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—যেখানে কূটনীতি ও সামরিক কৌশল একই সঙ্গে কাজ করছে, কিন্তু সব পক্ষের উদ্দেশ্য এক নয়।

এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ আমাদের সামনে কয়েকটি মৌলিক শিক্ষা তুলে ধরে—প্রথমত, সামরিক শক্তি দিয়ে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান সবসময় সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, কূটনৈতিক চুক্তি ভেঙে দিলে তার দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। তৃতীয়ত, আঞ্চলিক সংঘাত খুব দ্রুত বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে। সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—পারমাণবিক যুগে যুদ্ধের ঝুঁকি বহুগুণ বেশি।

মাহফুজ আনামের বিশ্লেষণের শেষ কথাটি গভীর তাৎপর্য বহন করে: “আমরা একটি সম্ভাব্য পারমাণবিক সংঘাতের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম। আমাদেরকে ভবিষ্যতে যেকোনো মূল্যে এটি প্রতিহত করতে হবে।”

এই সতর্কবার্তা শুধু নীতিনির্ধারকদের জন্য নয়, বিশ্ববাসীর জন্যও প্রযোজ্য। কারণ, একটি ভুল সিদ্ধান্ত, একটি উগ্র বক্তব্য বা একটি ভুল হিসাব—মানবসভ্যতাকে এমন এক পথে ঠেলে দিতে পারে, যেখান থেকে ফিরে আসার আর কোনো সুযোগ থাকবে না। এখন প্রশ্ন একটাই—বিশ্ব কি এই সংকট থেকে শিক্ষা নেবে, নাকি আবারও একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটবে?

মাহফুজ আনাম

সুখবর এর নিউজ পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

খবরটি শেয়ার করুন

Footer Up 970x250