ছবি: সংগৃহীত
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফার ফল দেশটির রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। জনমত জরিপে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাকে সামান্য এগিয়ে রাখা হলেও ভোটের ফলে উল্টো চিত্র দেখা গেছে। ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো প্রায় ৪৭ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রথম হয়েছেন। লুলা পেয়েছেন প্রায় ৪৫ শতাংশ। ফলে কোনো প্রার্থীই সরাসরি জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ৫০ শতাংশ ভোট পাননি। আগামী ২৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফার ভোটে মুখোমুখি হচ্ছেন দুজন।
প্রথম দফায় ফ্লাভিওর এগিয়ে যাওয়াকে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, এর মধ্য দিয়ে ব্রাজিলের ভোটারদের মধ্যে ডানপন্থী রাজনীতির শক্তি, লুলাবিরোধী মনোভাব এবং বলসোনারো পরিবারের রাজনৈতিক প্রভাব—তিনটি বিষয়ই স্পষ্ট হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালও বলেছে, সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারো নিজে ব্যালটে না থাকলেও নির্বাচনে তার রাজনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট হয়েছে।
প্রথম দফার ফলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ফ্লাভিও প্রত্যাশার চেয়ে ভালো করেছেন। ভোটের আগে একাধিক জরিপে লুলাকে সামান্য এগিয়ে রাখা হয়েছিল। কিন্তু ভোট গণনার পর দেখা যায়, ফ্লাভিও শুধু লুলাকে টপকাননি, তার দল লিবারেল পার্টিও কংগ্রেসে বড় সাফল্য পেয়েছে। রয়টার্সের হিসাবে, দলটি নিম্নকক্ষে ৫১৩ আসনের মধ্যে ১২১টি পেতে যাচ্ছে এবং সিনেটে তাদের আসন ১৫ থেকে বেড়ে ২৮টিতে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে দ্বিতীয় দফার ভোটে ফ্লাভিও শুধু একজন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে নয়, একটি শক্তিশালী রক্ষণশীল রাজনৈতিক জোটের মুখ হিসেবেও লড়বেন।
এই ফল আরও তাৎপর্যপূর্ণ কারণ ফ্লাভিওর পরিবারও একই নির্বাচনে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। তার সৎমা মিশেল বলসোনারো এবং ভাই কার্লোস বলসোনারো সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। আরেক ভাই জইর রেনান বলসোনারো নিম্নকক্ষে গেছেন। ফলে জইর বলসোনারো কারাগারে থাকলেও তার পরিবারের একাধিক সদস্য এখন ব্রাজিলের আইনসভায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকছেন। গার্ডিয়ান বলছে, এই ফল বলসোনারো পরিবারকে একটি রাজনৈতিক ‘রাজবংশে’ পরিণত করার সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করেছে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে ‘অ্যান্টিপেতিসমো’—অর্থাৎ লুলা ও তার ওয়ার্কার্স পার্টির প্রতি বিরূপ মনোভাব। গেতুলিও ভারগাস ফাউন্ডেশনের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক অলিভার স্টুয়েনকেল মনে করেন, ব্রাজিলের এবারের নির্বাচনে অনেক ভোটার নির্দিষ্ট কোনো নীতির পক্ষে নয়, বরং অন্য পক্ষকে ঠেকানোর জন্য ভোট দিয়েছেন। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসকে তিনি বলেন, দুর্বল দলীয় কাঠামোর কারণে ব্রাজিলের রাজনীতি ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে; ফলে এবারের নির্বাচন অনেকটা লুলার পক্ষে বা বিপক্ষে এবং বলসোনারো পরিবারের পক্ষে বা বিপক্ষে ভোটে পরিণত হয়েছে।
দ্বিতীয় দফায় তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—প্রথম দফায় অন্য প্রার্থীদের পাওয়া ভোট কোথায় যাবে? লুলা ও ফ্লাভিও ছাড়া অন্য প্রার্থীরা সম্মিলিতভাবে প্রায় ৮ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। তাদের বড় অংশই মধ্য-ডানপন্থী। আল-জাজিরার বিশ্লেষণে অধ্যাপক স্টুয়েনকেল বলেছেন, এসব ভোটারের বড় অংশ লুলার দিকে চলে যাবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং তাদের মধ্যে ফ্লাভিওকে বেছে নেওয়ার প্রবণতা বেশি হতে পারে।
তবে ফ্লাভিওর জয় নিশ্চিত—এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানোও ঠিক হবে না। দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে প্রার্থীদের ৫০ শতাংশের বেশি বৈধ ভোট প্রয়োজন। ফলে লুলার সামনে এখনও ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ আছে। বিশেষ করে যারা প্রথম দফায় ভোট দেননি, তাদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারলে লুলা ব্যবধান কমাতে পারেন। এ নির্বাচনে প্রায় ২১ শতাংশ ভোটার ভোট দেননি, যা ১৯৯৮ সালের পর সর্বোচ্চ অনুপস্থিতির হার বলে জানিয়েছে আমেরিকাস সোসাইটি/কাউন্সিল অব দ্য আমেরিকাস। তাদের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় দফায় তৃতীয় ও পরবর্তী প্রার্থীদের ভোট এবং বিপুলসংখ্যক অনুপস্থিত ভোটার—দুই পক্ষের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
লুলার আরেকটি বড় সমস্যা হলো, প্রথম দফার ফল তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের জন্যও একটি সতর্কবার্তা। ১৯৯৮ সালের পর এবারই প্রথম তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফায় শীর্ষস্থান হারালেন। তবে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ব্রাজিলে তার শক্ত ভিত্তি এখনও রয়েছে। ফলে লুলাকে এখন ওই অঞ্চলের সমর্থন ধরে রাখার পাশাপাশি মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণের ভোটারদের একটি অংশকে নিজের দিকে টানতে হবে।
অন্যদিকে ফ্লাভিওর প্রচারের মূল শক্তি হচ্ছে নিরাপত্তা, রক্ষণশীল মূল্যবোধ এবং তার বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। অপরাধ ও মাদকপাচার ব্রাজিলের ভোটারদের বড় উদ্বেগ। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের উদ্ধৃত সেপ্টেম্বরের এক জরিপে ২৮ শতাংশ ভোটার সহিংসতাকে দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা বলেছেন। ফ্লাভিও অপরাধী গোষ্ঠীগুলোকে কঠোরভাবে দমন, সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কারাগার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
অর্থনীতিও দ্বিতীয় দফায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ফ্লাভিও সরকারি ব্যয় কমানো, ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং কর কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রথম দফায় তার এগিয়ে যাওয়ার পর ব্রাজিলের শেয়ারবাজারে বড় উত্থান দেখা গেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, সোমবার দেশটির প্রধান শেয়ারবাজার সূচক রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে এবং মুদ্রার দামও বেড়েছে। বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ ফ্লাভিওর সম্ভাব্য সরকারকে ব্যবসাবান্ধব হিসেবে দেখছেন। তবে রয়টার্সের বিশ্লেষণে সতর্ক করা হয়েছে, তার আর্থিক প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না; কারণ সরকারের ব্যয়ের বড় অংশ বাধ্যতামূলক খাতে নির্ধারিত।
ফ্লাভিও জিতলে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন হতে পারে তার বাবা জইর বলসোনারোর ভবিষ্যৎ নিয়ে। অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে জইর ২৭ বছরের কারাদণ্ডে রয়েছেন। ফ্লাভিও তার বাবার জন্য সাধারণ ক্ষমার উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কংগ্রেসে রক্ষণশীলদের শক্ত অবস্থান থাকায় এমন উদ্যোগ রাজনৈতিকভাবে একেবারে অসম্ভব নয়। তবে এ ধরনের পদক্ষেপে বিচার বিভাগ ও প্রেসিডেন্টের মধ্যে নতুন সংঘাত তৈরি হতে পারে।
নির্বাচনের ফল ব্রাজিলের পররাষ্ট্রনীতিতেও পরিবর্তন আনতে পারে। লুলা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির কঠোর সমালোচক। বিপরীতে ফ্লাভিও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছেন। ফলে ফ্লাভিও ক্ষমতায় এলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ব্রাসিলিয়ার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের সঙ্গে সম্পর্কও নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নতুন সরকারকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন—দুই শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
ফ্রান্সের ল্য মোঁদ মনে করছে, ফ্লাভিও জয়ী হলে ব্রাজিলও লাতিন আমেরিকার সাম্প্রতিক ডানমুখী রাজনৈতিক প্রবণতার অংশ হয়ে উঠবে। তবে এখনই তাকে নিশ্চিত বিজয়ী বলা যাচ্ছে না। দ্বিতীয় দফার আগে প্রায় তিন সপ্তাহে রাজনৈতিক জোট, ভোটার উপস্থিতি, প্রচারণা, অর্থনীতি এবং লুলার প্রচারের কৌশল—সবই ফল বদলে দিতে পারে।
তারপরও প্রথম দফার ফল থেকে যে বার্তাটি সবচেয়ে স্পষ্ট, তা হলো—ব্রাজিলের রাজনীতিতে লুলার বামপন্থী শিবির আর একচ্ছত্র প্রভাবশালী অবস্থানে নেই। বলসোনারো পরিবারের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন ঘটেছে এবং তা শুধু প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলেই নয়, কংগ্রেসের ফলেও প্রতিফলিত হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় লুলার সামনে তাই শুধু ফ্লাভিওকে হারানোর লড়াই নয়; তাকে মোকাবিলা করতে হবে একটি শক্তিশালী রক্ষণশীল রাজনৈতিক ঢেউকে।
এই বাস্তবতায় ফ্লাভিও এখন কিছুটা এগিয়ে থাকা প্রার্থী। প্রথম দফায় তার ভোটের ব্যবধান সামান্য হলেও দ্বিতীয় দফার সম্ভাব্য ভোটের হিসাব, কংগ্রেসে ডানপন্থীদের শক্তি এবং বলসোনারো পরিবারের সাংগঠনিক প্রভাব তাকে সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছে। তবে ২৫ অক্টোবরের আগে লুলাকে রাজনৈতিকভাবে মৃত ঘোষণা করা যাবে না। বরং দ্বিতীয় দফার লড়াই নির্ধারণ করবে—ব্রাজিল আবার লুলার বামপন্থী শিবিরে থাকবে, নাকি জইর বলসোনারোর উত্তরাধিকার বহন করে তার ছেলে ফ্লাভিওর নেতৃত্বে ডানদিকে আরও বড় মোড় নেবে।
খবরটি শেয়ার করুন