ছবি: সংগৃহীত
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে—এমনটাই মনে করছেন লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ। তার একটি বিশ্লেষণধর্মী কলামে তিনি এই নির্বাচনের চরিত্র, ফলাফল এবং তার বহুমাত্রিক প্রভাব তুলে ধরেছেন।
কলামটি আজ ৫ মে, দৈনিক প্রথম আলোর ছাপা সংস্করণে প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ফলাফলকে শুধু একটি রাজ্যের ক্ষমতার পালাবদল হিসেবে দেখেননি; বরং এটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রবণতা, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক এবং বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী অঞ্চলের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের আলোকে বিশ্লেষণ করেছেন।
আলতাফ পারভেজের মতে, এবারের পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন ছিল প্রচলিত অর্থে একটি সাধারণ গণতান্ত্রিক নির্বাচন নয়। তার ভাষ্যে, এটি একধরনের ‘অসম যুদ্ধ’, যেখানে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার দল তৃণমূল কংগ্রেসকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রভাববলয়ের মধ্যে থাকা বিভিন্ন সংস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, এই নির্বাচন এমন এক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়িয়ে প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির প্রভাব দৃশ্যমান ছিল। ফলে তৃণমূলের পরাজয়কে তিনি এককভাবে দলীয় ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে বৃহত্তর ক্ষমতার কাঠামোর প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন।
এই নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) উত্থানকে। ২০১১ সালের নির্বাচনে যেখানে বিজেপির উপস্থিতি প্রায় শূন্য ছিল, সেখানে ২০২৬ সালে দেড়শ আসনের বেশি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়াকে তিনি একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন।
তার মতে, এটি শুধু পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় দক্ষিণপন্থী রাজনীতির প্রসারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই প্রেক্ষাপটে তিনি ৪ মে (নির্বাচনের ফল প্রকাশ) দিনটিকে একটি প্রতীকী দিন হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্ব বহন করতে পারে।
আলতাফ পারভেজ তার লেখায় বাঙালি পরিচয়ের প্রশ্নটিও সামনে এনেছেন। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে উত্তর ভারতকেন্দ্রিক রাজনৈতিক প্রভাব কীভাবে ক্রমশ শক্তিশালী হয়েছে এবং তার ফলে স্থানীয় সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত পরিচয় কতটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, কেন তৃণমূল কংগ্রেস এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পর্যাপ্ত জনসমর্থন ধরে রাখতে পারেনি। তিনি দুটি দিক তুলে ধরেছেন—প্রথমত, তৃণমূল সরকারের দীর্ঘদিনের শাসনে সৃষ্ট অসন্তোষ; দ্বিতীয়ত, বিজেপির সংগঠিত ও কৌশলগত ভোটব্যবস্থা।
নির্বাচনী প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে তিনি ‘এসআইআর’ বা ভোটার তালিকা হালনাগাদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন। তার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যা নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে।
বিশেষ করে যেসব এলাকায় তৃণমূলের প্রভাব বেশি ছিল, সেসব জায়গায় এই প্রভাব তুলনামূলক বেশি পড়েছে বলে তিনি ধারণা দিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, নির্বাচনের ফলাফল শুধু ভোটগ্রহণের দিনে নির্ধারিত হয়নি; বরং তার আগে থেকেই কিছু কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে ফলাফলের ভিত্তি তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
তবে তিনি একপাক্ষিক বিশ্লেষণ করেননি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের দুর্বলতার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনে সুশাসনের ঘাটতি, স্থানীয় পর্যায়ে সন্ত্রাস বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্য এবং উন্নয়নসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা তৃণমূলের জনপ্রিয়তা কমিয়েছে বলে তিনি মনে করেন। অর্থাৎ, তৃণমূলের পরাজয় কেবল বাহ্যিক চাপের ফল নয়, বরং অভ্যন্তরীণ কারণও এতে ভূমিকা রেখেছে।
আলতাফ পারভেজের বিশ্লেষণে ভারতের আঞ্চলিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত রয়েছে। তিনি মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গের এই ফলাফল অন্যান্য আঞ্চলিক দলগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা। কেন্দ্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তাদের জন্য ভবিষ্যতে আরও কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেছেন, বামপন্থী রাজনীতির কিছুটা পুনরুত্থানের লক্ষণও দেখা যাচ্ছে, যদিও তা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তার মতে, ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এছাড়া তিনি পশ্চিমবঙ্গের সম্ভাব্য ভৌগোলিক পুনর্গঠন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিজেপির কিছু রাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে তিনি ধারণা দিয়েছেন, রাজ্য ভেঙে নতুন প্রশাসনিক কাঠামো গঠনের চেষ্টা হতে পারে, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গকে কেন্দ্র করে। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক গুরুত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। দ
চা শিল্প ও পর্যটনের মতো খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে রাজ্যের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমে যেতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচনের প্রভাব নিয়ে আলতাফ পারভেজের বিশ্লেষণে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য নতুন ধরনের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ‘বাংলাদেশি’ পরিচয়কে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর জন্য উদ্বেগজনক হতে পারে। সম্ভাব্য ‘পুশ ইন’ বা জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর মতো ইস্যু সামনে এলে বাংলাদেশ সরকারের জন্য তা একটি জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।
তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির উত্থান সীমান্তের দুই পাশেই প্রভাব ফেলতে পারে। এই ধরনের রাজনীতি একদিকে যেমন ভারতের অভ্যন্তরে সংখ্যালঘুদের অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে, তেমনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও এর প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে। ফলে দুই দেশের মধ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সবশেষে আলতাফ পারভেজ তার লেখার মাধ্যমে একটি বৃহত্তর বার্তা দিতে চেয়েছেন—দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে যে পরিবর্তনগুলো ঘটছে, তা শুধু একটি দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়। বরং তা আন্তঃসীমান্ত বাস্তবতায় প্রভাব ফেলছে এবং ভবিষ্যতে এই প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত, যা বাংলাদেশসহ পুরো অঞ্চলের জন্য নতুন করে ভাবনার অবকাশ তৈরি করেছে।
খবরটি শেয়ার করুন